বেনাপোলের সীমান্তবর্তী গ্রাম থেকে উঠে এসে নজর কাড়ছেন তরুণ ফুটবলার রাব্বি হোসেন রাহুল। গত বছর প্রিমিয়ার লিগে ধারে ব্রাদার্সের হয়ে স্থানীয়দের মধ্যে সর্বোচ্চ ছয় গোল করে ঠাঁই পেয়েছেন সিনিয়র জাতীয় দলে। গত মাসে অনূর্ধ্ব-২০ সাফে শিরোপা জেতাতে রেখেছেন বড় ভূমিকা। অথচ অনাহূত চোটে ভিয়েতনামে আজ শুরু হওয়া অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে দলের সঙ্গী হতে পারেননি। বসুন্ধরা কিংসের হয়ে সিনিয়র দলের এই ফুটবলার দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দর কাছে বললেন অনেক কথা
অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে খেলার স্বপ্ন ভেস্তে গেল চোটের কারণে। আজ দল সিরিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামবে। মনটা নিশ্চয়ই ভালো নেই?
রাব্বি হোসেন রাহুল : নেপালে শিরোপা জয়ের পর থেকেই গোটা দলের মধ্যে অন্যরকম একটা আত্মবিশ্বাস কাজ করছিল। এই পর্যায়ে আমরা আগে কখনো চূড়ান্তপর্বে খেলিনি। বিশ্বাস ছিল এবার পারব। তবে চোট এবং অন্য কিছুর কারণে আমিসহ বেশ কয়েকজন এখন দলের সঙ্গে নেই। তাই লক্ষ্যপূরণ নিয়ে কিছুটা শঙ্কা তো আছেই। তবে যারা আছেন, তারাও সবাই ভালো। আমি মনেপ্রাণে চাই দল যাতে বাছাই উতরে চূড়ান্তপর্বে যেতে পারে। আর আক্ষেপের কথা কী বলব। নেপালে ব্যথা নিয়ে খেলেছিলাম। জাতীয় দলের হয়ে ভুটানে অভিষেকেও তাই হয়েছে। সব ম্যাচেই হাঁটুতে ট্যাপ পেঁচিয়ে খেলেছি। তবে ভুটান থেকে ফেরার পর ব্যথাটা অনেক বেড়েছে। ফিজিও ও ডাক্তার বলেছেন, এই ব্যথা নিয়ে খেলতে গেলে ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই এবার দলের সঙ্গী হওয়া হয়নি।
অথচ বাংলাদেশের আক্রমণভাগে আপনার আর মিরাজুলের রসায়নটা দারুণ জমেছিল।
রাহুল : ঠিক বলেছেন। ওর সঙ্গে আমার দারুণ সমঝোতা হয়েছিল। দুজন দুজনকে পড়তে পারতাম। আমার একটা বৈশিষ্ট্য হলো, উইথ-আউট বল পজিশন নিতে পারি। যেটা মিরাজ বুঝত। তাই দেখবেন দুজন দুজনকে দিয়ে গোলগুলো করিয়েছি। তাছাড়া আমি দুই পায়েই খেলতে পারি। ফলে দলের সেট-পিস নেওয়ার দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। তাই দলের সঙ্গে থাকতে না পারাটা বেশি পোড়াচ্ছে। আমার কি মনে হয় জানেন, হয়তো আমার পজিশনে (রাইট উইং) আমার চেয়েও হয়তো কেউ অনেক ভালো খেলবে দলের। তবে নেপালে শিরোপা জিতে আমার যে আত্মবিশ্বাস জন্মেছিল, সেটা অন্যদের মধ্যে থাকবে না। তারপরও দলের সাফল্য প্রার্থনা করছি প্রতিটা সময়।
তাহলে এখন আপনার রিহ্যাব চলছে?
রাহুল : অনেকটা সে রকমই। দুদিন বিরতি দেওয়া হয়েছে ক্যাম্পে (বসুন্ধরা কিংসের প্রি-সিজন ক্যাম্প)। ইচ্ছে ছিল বাড়িতে যাব। তবে ফিজিও বারণ করলেন। বললেন জার্নিটা করলে খারাপ হবে। তাই ক্যাম্পেই রিহ্যাব করছি।
বাড়ি বলতে আপনি তো বেনাপোল থেকে উঠে এসেছেন?
রাহুল : বেনাপোলের সীমান্তবর্তী গ্রামে আমার জন্ম। আমাদের গ্রামে মাদক, চোরাচালানের মতো ঘটনা ঘটে অহরহ। কম কষ্টে কাঁচা টাকা কামানো কোনো ব্যাপারই না। ঘরে ঘরে ছেলেপুলেরা এসবের সঙ্গে জড়িয়ে যায় ছোট থেকেই। অনেকেই এভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে আমার ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। কারণ আমার বাসার কিংবা পরিবারের কেউই এসবের সঙ্গে জড়িত হয়নি কখনো। বরং ছোটবেলায় সময় কেটেছে পড়ালেখা, কাঁচাবাজারে মজুরের কাজ ও ফুটবল নিয়ে।
ফুটবলে আসার গল্পটা তাহলে শুনি?
রাহুল : আলহাজ নুর ইসলাম ফুটবল একাডেমিতে আমার ফুটবলের হাতেখড়ি। বেনাপোলের মেয়র আশরাফুল আলম লিটন স্যার এই একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যুবসমাজকে মাদক, চোরাচালান থেকে রক্ষা করতে। কোচ হিসেবে তিনি দায়িত্ব দেন জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার সাব্বির আহমেদ পলাশ স্যারকে। পলাশ স্যারের প্রচেষ্টাতেই একাডেমিতে যোগ দিয়েছিলাম ২০১৭ সালের দিকে। তবে আবার বুট কেনার টাকা ছিল না। পরিবারে আমি চার বোনের একমাত্র ভাই। সংসারের প্রয়োজনে পড়ালেখার পাশাপাশি আমাকে একটা সময় কাঁচাবাজারে মজুরের কাজও করতে হয়েছে। দৈনিক ৫০ টাকা মজুরির পাশাপাশি কিছু শাক-সবজি পেতাম। কাঁচাবাজারগুলো বাসায় দিতাম আর ওই ৫০ টাকা দিয়ে নিজে চলতাম ও খেলার সরঞ্জামাদি কিনতাম। এভাবেই আমরা ফুটবলে আসা।
তারপর?
রাহুল : ফুটবলার হিসেবে গড়ে ওঠার পেছনে নুর ইসলাম ফুটবল একাডেমি ও পলাশ স্যারের অবদান সবচেয়ে বেশি। একাডেমির হয়ে আমরা ঢাকায় পাইওনিয়ার লিগে খেলেছি। এর আগে সমর্থক গোষ্ঠীর আয়োজনে পল্টন ময়দানে অনূর্ধ্ব-১৪ একাডেমি কাপে এফসি ইউনাইটেড ফেনীর হয়ে খেলে চ্যাম্পিয়ন হই এবং সেরা খেলোয়াড় হই। এরপর তৃতীয় বিভাগে খেলেছি বিক্রমপুর কিংসের হয়ে। ২০২২ সালে বেনাপোল উচ্চ বিদ্যালয়ের হয়ে জাতীয় স্কুল পর্যায়ে খেলেছি। সেখানেও সেরা খেলোয়াড় হই। সেই খেলার পর বাফুফের এলিট একাডেমি ডেকেছিল অনূর্ধ্ব-১৭ দলে নেওয়ার কথা বলে। ২০ দিন থাকার পর বাফুফে পাঁচ বছরের চুক্তি করতে চাইলে আমি রাজি হইনি। কারণ আমার পারিবারিক অবস্থান যে রকম, এ অবস্থায় মাসে ৫ হাজার টাকায় আমি সংসার চালাতে পারতাম না। তাই বাড়ি ফিরে যাচ্ছিলাম। কমলাপুর স্টেশনে ট্রেন ছাড়ার অপেক্ষায় ছিলাম। সে সময় বসুন্ধরা কিংসের ম্যানেজার ওয়াসিম স্যার ফোন দেন। তিনি আমাকে বসুন্ধরার জুনিয়র দলে যোগ দিতে বলেন। সেই থেকেই আমি কিংসের। তবে ধারে বিসিএলে ওয়ারীর হয়ে খেলেছি। আর গত বিপিএলে ব্রাদার্সের হয়ে সর্বোচ্চ ছয় গোল করেছি। ব্রাদার্সেই বলতে গেলে আমার জীবনে বাকবদল ঘটেছে।
আক্রমণভাগে স্থানীয়রা যখন খেলারই সুযোগ সেভাবে পায় না, সেখানে আপনি ব্রাদার্সে নিয়মিত খেলেছেন, গোল করেছেন। আবার অধিনায়কত্বও করেছেন।
রাহুল : ব্রাদার্স আমাকে সবকিছুই দিয়েছে। ভাবিনি এমন একটা দলে নিয়মিত খেলার সুযোগ পাব। তবে ক্লাব আমাকে সে সুযোগ দিয়েছে। প্রথম লেগে মরোক্কান সতীর্থ মোস্তফার সহায়তায় পাঁচ গোল করি। এরপর জাতীয় দলের ক্যাম্পে যোগ দিই সৌদি আরবে। সেবার খেলতে না পারলেও সিনিয়র দলের সঙ্গে থেকে আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে যায় আমার। এরপর স্বপ্ন ছিল ফিরে এসে দ্বিতীয় লেগে আরও গোল করার। কিন্তু দ্বিতীয় লেগে মোস্তফা ব্রাদার্স ছেড়ে দিলে সেভাবে অ্যাসিস্ট করার কেউ ছিল না। তাই সব ম্যাচ খেললেও একটা গোল করতে পারি দ্বিতীয় লেগে। তবে শীর্ষ পর্যায়ে এই খেলার অভিজ্ঞতা পরে অনূর্ধ্ব-২০ দলে অনেক কাজে লেগেছে।
এ মৌসুমে কিংস আপনাকে মূল দলে রেখেছে। গত কয়েক মৌসুমের সেরা দলে নিশ্চয়ই নিজেকে নতুন করে চেনাতে চাইবেন?
রাহুল : দেখুন আমার মূল স্বপ্ন জাতীয় দলে নিজের জায়গা প্রতিষ্ঠিত করা। আর সেটা করতে হলে বসুন্ধরায় আমাকে প্রমাণ দিতে হবে। কারণ জাতীয় দলে যাদের সঙ্গে আমার জায়গা পেতে লড়াই করতে হবে, সেই রাকিব ভাই ও ফাহিম ভাইও এখানেই খেলেন। কিংসের মতো দলে নিজেকে প্রমাণ করতে পারলেই আমি মনে করব জাতীয় দলে আমার জায়গা পাকা হবে। প্রি-সিজনে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। বিশ্বাস আছে কিংসে নিয়মিত খেলার সুযোগ পাব।
আপনার লক্ষ্য পূরণ হোক
রাহুল : দোয়া করবেন যাতে বড় ফুটবলার হতে পারি। বেনাপোলের মানুষের মাদক, চোরাকারবারির দুর্নাম যাতে ফুটবল দিয়ে ঘোচাতে পারি। আর আমার পরিবার আর গ্রামের মানুষের জন্য যাতে কিছু করতে পারি।