ডেঙ্গু মশার যন্ত্রণা থেকে রেহাই পাওয়ার উপায়

বর্ষার শেষ সময়। বৃষ্টির পাশাপাশি গরমও কমছে না। অসহ্য গরমে স্বস্তি নেই কারোরই আর এর মাঝে শুরু হয়েছে ডেঙ্গুর উপদ্রব। মশাবাহিত রোগবালাই থেকে রেহাই পেতে আমাদের সচেতন হতে হবে। কেননা মশাবাহিত ভয়াবহ রোগ ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়ার এখনো কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়নি। তাই জেনে নিন মশার যন্ত্রণা থেকে রেহাই পাওয়ার নানা উপায়। লিখেছেন নাহার সুলতানা

অনেকে বাড়ি থেকে মশা তাড়াতে স্প্রে, কয়েল, অ্যারোসল ব্যবহার করেন। কিন্তু এসব মশা তাড়ানোর উপকরণ আমাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। মশা তাড়াতে সব থেকে বেশি কার্যকর হলো প্রাকৃতিক উপায়। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও কোনো প্রকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে না।

কীভাবে মশা তাড়াবেন

 মশা সব সময় হলুদ আলো থেকে দূরে থাকে। তাই ঘরের বাইরে বা প্রবেশপথে হলুদ বৈদ্যুতিক বাল্ব লাগিয়ে দিন। এছাড়া সোডিয়াম লাইটও লাগাতে পারেন। এতে ঘরে মশা কম প্রবেশ করবে।

 নিমপাতা মশা তাড়াতে বেশ কার্যকর। পাত্রে অল্প একটু কাগজ জ্বালিয়ে তাতে বেশি করে নিমপাতা দিন। এতে নিমপাতা পুড়ে যে ধোঁয়া হবে তা পুরো বাড়িতে ছড়িয়ে দিন। ঘরে মশা  দ্রুত চলে যাবে।

 মশা গাঢ় রঙে বেশ আকৃষ্ট হয়। তাই গাঢ় রঙের পোশাক এড়িয়ে চলুন। বিশেষ করে কালো রঙের পোশাকে মশা বেশি আক্রমণ করে। হালকা রঙের ও আরামদায়ক পোশাক বেছে নিন।

 মশা তাড়াতে কর্পূরের কার্যকারিতা বেশ। ছোট ছোট বাটিতে পানি সঙ্গে দুই থেকে তিনটি কর্পূর মিশিয়ে ঘরের কোণে রেখে দিন। অথবা বোতলে রেখে ঘরের বিভিন্ন স্থানে স্প্রে করে দিন। এতে ঘর থেকে মশা খুব দ্রুত বেরিয়ে যাবে।

 কয়েকটি রসুন ঘরের কোণায়, বিছানার পাশে বা জানালার কাছে রেখে দিন। এতে মশা বাড়িতে প্রবেশ করবে না এবং মশার উপদ্রবও কমে যাবে।

 নিমপাতা না পেলে চা-পাতা পোড়ানো ধোঁয়ায় মশা খুব দ্রুত দূরে সরে যায়। সকাল বা সন্ধ্যায় চা-পাতা পোড়ানো ধোঁয়া ছড়িয়ে দিন পুরো বাড়িতে।

 ঘরে মশা প্রবেশে বাধা দিতে লেবু ও লবঙ্গ বেশ উপকারী। লেবুকে দুভাগ করে তাতে লবঙ্গ গেঁথে দিন। এভাবে কয়েকটি লেবুকে ঘরের জানালায়, পর্দার পেছনে, খাটের নিচে, রান্নাঘরে, সোফা বা টেবিলের নিচে, অর্থাৎ পুরো বাড়ির সমস্ত কোণে রেখে দিন। এতে করে মশা বাড়ির ধারেকাছেও আসবে না।

 এ ছাড়া শরীরে যাতে মশা না কামড়ায় এ জন্য নিমের তেল ব্যবহার করতে পারেন। নিমের তেল ত্বকের জন্য খুব উপকারী। নিমের তেল শরীরে নানা রোগবালাইয়ের পাশাপাশি বিরক্তিকর মশার আক্রমণ থেকেও রক্ষা করবে।

 মশা যাতে ঘরে প্রবেশ করতে না পারে তাই ঘরের জানালায় মশা নিরোধক নেট ব্যবহার করুন। এতে জানালা খোলা থাকলেও মশা প্রবেশ করতে পারবে না।

মশা কামড়ালে কী করবেন

সচেতন থাকার পরও অনেক সময় আমাদের মশা কামড়িয়ে থাকে। এতে অস্থির না হয়ে যা করবেন তাহলো-

 মশার কামড় টের পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই স্থানে মধু লাগিয়ে নিন। চুলকানি ও লাল ছোপ ছোপ দাগ দ্রুত চলে যাবে।

 কামড়ানোর পর যত দ্রুত সম্ভব স্থানটি পানি দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিন। জীবাণুনাশক কোনো ওষুধ থাকলে পানিতে মিশিয়ে কামড়ানো স্থানে লাগিয়ে পরিষ্কার করে নিন। এতে ভেতরের জীবাণুগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে।

  আক্রান্ত স্থানে বরফ দিয়ে ভালোভাবে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করুন। বা ঠা-া পানিও লাগাতে পারেন। এতে চুলকানি ও ফোলাভাব দূর হবে।

 বেশি মশা কামড়ালে দ্রুত পাত্রে গরম পানি করে নিন। এরপর তাতে ২ থেকে ৩ কাপ ভিনেগার মিশিয়ে পুরো শরীর পরিষ্কার করে বা গোসল করে নিতে পারেন। তবে ভিনেগার মিশ্রিত পানি ব্যবহার করা যাবে না।

 ভিনেগারের মতো বেকিং সোডাকে অল্প গরম পানিতে মিশিয়ে পেস্ট করে নিন। এরপর আক্রান্ত স্থানে লাগিয়ে রাখুন কয়েক মিনিট। এরপর পরিষ্কার পানি দিয়ে জায়গাটি ধুয়ে নিন।

ডেঙ্গুর ঝুঁকি বেশি যাদের

সব বয়সের নারী-পুরুষই ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে আছে। তবে ডায়াবেটিস, কিডনি ফেইলিওর, হার্ট ফেইলিওর ইত্যাদি রোগীদের জন্য ডেঙ্গু বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশে এক কোটির বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে ভুগছে। তাদের কমপক্ষে ৩০ শতাংশ কিডনি রোগে আক্রান্ত। ডায়াবেটিক রোগীদের গ্লুকোজের কারণে রক্তের ঘনত্ব বেড়ে যায়, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, পানিশূন্যতার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে যাদের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নেই (রক্তের গ্লুকোজ কাক্সিক্ষত মাত্রার চেয়ে বেশি), তাদের ডেঙ্গু হলে ক্ষতির তীব্রতা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ডায়াবেটিস আক্রান্তরা

ডায়াবেটিস রোগীরা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে শক সিন্ড্রোম হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। এদের মধ্যে মৃত্যুহারও অনেক বেশি। ডায়াবেটিস রোগীরা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তাদের রক্তের প্লাটিলেট দ্রুতই কমতে থাকে। পাশাপাশি দেহের ভেতর ও বাইরে রক্তক্ষরণের আশঙ্কা বাড়ে। ডেঙ্গুর সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। এই রোগ সাধারণত নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়। ঘরে বসে উপসর্গ অনুযায়ী সাধারণ চিকিৎসাই যথেষ্ট। কিন্তু ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে একটু বেশি সতর্ক থাকতে হবে। ডায়াবেটিস রোগীরা ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে শুরু থেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বা হাসপাতালে ভর্তি করানো উচিত। বিশেষ করে শরীরের যেকোনো অংশে রক্তপাত হলে, প্লাটিলেটের সংখ্যা কমে গেলে, শ্বাসকষ্ট হলে বা পেট ফুলে পানি এলে, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেলে, জন্ডিস দেখা দিলে, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা দুর্বলতা দেখা দিলে, পেট ব্যথা বা বমি হলে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে চিকিৎসা নেওয়া উচিত।

হৃদরোগীরা

যারা হৃদরোগে আক্রান্ত, তাদের রক্ত পাতলা করার ওষুধ খেতে হয়। এই ওষুধগুলো রক্তের অণুচক্রিকার বিরুদ্ধে কাজ করে এর কার্যক্ষমতাকে হ্রাস করে দেয়। হৃদরোগীদের জন্য এটি দরকার হয় রক্তনালির ভেতর অনাকাক্সিক্ষত রক্ত যাতে জমাট বাঁধতে না পারে। কিন্তু ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে এরই মধ্যে কমতে থাকা প্লাটিলেট যেখানে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়, এ জাতীয় রক্ত পাতলা করার ওষুধ রক্তক্ষরণের আশঙ্কাকে অনেক গুণ বৃদ্ধি করে। হৃদরোগীরা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্ত পাতলা করার সব ওষুধ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে হবে। চিকিৎসকের নির্দেশমতো চলতে হবে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর যখনই রক্তের প্লাটিলেট স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসবে, তখন চিকিৎসকই সব দিক বিবেচনা করে আবার রক্ত পাতলা করার ওষুধ খাওয়া শুরু করার পরামর্শ দেবেন।

যে ওষুধ ক্ষতিকর

হৃদরোগীদের অনেকেরই হৃদরোগ ছাড়া উচ্চ রক্তচাপ ও হার্ট ফেইলিওরের ওষুধ খেতে হয়। এসব ওষুধ রক্তচাপকে আরও কমিয়ে দিতে পারে। চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শকরে সাময়িক বন্ধ রাখতে হবে। ডেঙ্গু রোগে অনেক ক্ষেত্রে লিভার আক্রান্ত হয়। এসজিপিটি ও বিলিরুবিন বেড়ে যেতে পারে। যারা কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ খান, তাদের সাময়িকভাবে এসব ওষুধও বন্ধ রাখতে হবে। যাদের ডায়াবেটিস আছে, ডেঙ্গুতে তাদের রক্তের সুগার ওঠানামা করতে পারে। তাই ডায়াবেটিসের ওষুধ বা ইনসুলিন নেওয়ার আগে ঘন ঘন রক্তের সুগার পরীক্ষা করে ওষুধের মাত্রা সমন্বয় করে নিতে হবে।

ডেঙ্গু নিরাময়যোগ্য

আগেই বলা হয়েছে, ডেঙ্গু নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। তা ছাড়া যত ব্যাপকতা নিয়েই ডেঙ্গু আক্রমণ করুক না কেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিরাময়যোগ্য রোগ। রক্তের প্লাটিলেট একবার বাড়তে শুরু করলে আর ভয় নেই। মূল চিকিৎসা হলো সেবা। পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও খাদ্য গ্রহণ করলে এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যেই হৃদরোগীরা সুস্থ হতে পারবে। যাদের হৃদরোগের বিভিন্ন ওষুধ বন্ধ রাখতে হয়েছে, তাদের উচিত যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিৎসক দেখিয়ে আগের ওষুধগুলো আবার শুরু করা।