ডাক্তারদের কাজ জীবন বাঁচানো। মুমূর্ষু রোগীরাও অনেক সময় ডাক্তারদের বদৌলতে জীবন ফিরে পান। এ ছাড়া শরীর আর মনের ব্যাধি সারানোও এই পেশার মানুষদের নিত্য কাজ। মাঝে মাঝে সিনেমা বা সাহিত্যে দেখা যায় জীবন ফিরে পেয়ে, সুস্থ হয়ে অনেকে কৃতজ্ঞ হয়ে ডাক্তারকে ঈশ্বরের সঙ্গেও তুলনা করে বসে। অথচ বাংলাদেশে ডাক্তারদের অবস্থা সঙ্গিন। যারা মানুষের জীবন বাঁচানোর ব্রত নিয়ে কাজ করছেন পেশাদার জীবনে তারাই সবচেয়ে বড় হুমকির মুখে। দেশের ৬৭ শতাংশ চিকিৎসক কর্মস্থলে নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হন। তাদের মধ্যে ১২-১৩ শতাংশ শারীরিকভাবে নির্যাতন ও বাকি ৩৪ শতাংশ হুমকি-ধমকির শিকার হন। অন্যান্য পেশার তুলনায় চিকিৎসকদের ওপর এই নির্যাতনের হার চার গুণ বেশি। শনিবার বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক গোলটেবিল বৈঠকে এ তথ্য জানান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যানসার রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নাজিরুম মুবিন। ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ) ‘চিকিৎসকদের নিরাপদ কর্মস্থল : সংকট এবং করণীয়’ শীর্ষক এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। বৈঠকে ঢাকা ও কক্সবাজার মেডিকেল কলেজসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসকদের ওপর হামলার ভিডিওচিত্র উপস্থাপন করা হয়।
দেশের হাসপাতালগুলোর শয্যার সীমাবদ্ধতা এবং চিকিৎসকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাব, চিকিৎসকদের মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসকদের নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করা হয়। বিশেষত নারী চিকিৎসকদের নিরাপত্তাহীনতা নিয়েও আলোচনা করা হয়। ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজের রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের অধ্যাপক ডা. হাবিবা চৌধুরী বলেন, ‘এখনো কর্মস্থলে নারী চিকিৎসকদের খাটো করে দেখা হয়। অথচ দেশের মোট চিকিৎসকের ৭০ শতাংশই নারী। মেডিকেল কলেজে যারা ভর্তি হচ্ছেন, তাদের মধ্যেও নারী শিক্ষার্থী বেশি।’ প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এক হাসপাতালে কর্তব্যরত এক নারী চিকিৎসককে পাশবিকভাবে ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে গোটা রাজ্যে তুমুল আন্দোলন চলছে। ডাক্তারদের টানা কর্মবিরতি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রবল প্রতিবাদে রাজ্য সরকার বিপর্যস্ত।
বাংলাদেশে ডাক্তার নিগ্রহ ও ডাক্তারদের নিরাপত্তাহীনতা নতুন কিছু নয়। তিন সপ্তাহ আগে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রাজধানীর খিলগাঁওয়ের সিপাহীবাগ এলাকা থেকে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহতরা চিকিৎসা নিতে এলে পরবর্তী সময়ে একটি গ্রুপের লোকজন চাপাতিসহ জরুরি বিভাগের ভেতরে ঢুকে যায়। আক্রমণকারীদের চারজনকে আটক করে সেনাবাহিনীর হাতে সোপর্দ করলেও এহেন ঘটনায় চিকিৎসকদের নিরাপত্তা মারাত্মক প্রশ্নের মুখে পড়ে। একই দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলে এক চিকিৎসককে মারধরের ঘটনা ঘটে। ওই দুই ঘটনার জেরে চিকিৎসকদের মারধরে জড়িতদের বিচার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে দেশ জুড়ে স্বাস্থ্যসেবায় নজিরবিহীন ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালে সব ধরনের চিকিৎসাসেবা বন্ধ রাখেন চিকিৎসকরা। বন্ধ থাকে ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখা ও হাসপাতালে জরুরি অস্ত্রোপচারও। এমনকি বন্ধ থাকে জরুরি বিভাগও, যা অভূতপূর্ব একটি ঘটনা। হাসপাতালগুলোতে ডাক্তারদের নিরাপত্তাহীনতা নৈমিত্তিক একটি ব্যাপার। পান থেকে চুন খসলেই রোগীদের আত্মীয় বন্ধুদের উগ্রতার শিকার হতে হয়।
এটা সত্য, ডাক্তারদেরও জবাবদিহির ঘাটতি আছে। চিকিৎসকদের অবহেলার অভিযোগ জানানোর যথেষ্ট সুযোগ নেই। তদুপরি চিকিৎসকের বিরুদ্ধে করা অভিযোগের তদন্ত চিকিৎসকরাই করেন বলে অনেকে আস্থাও পান না। চিকিৎসক ও রোগীদের পারস্পরিক জবাবদিহি ও আস্থাহীনতা মারধরের মতো ঘটনার দিকে নিয়ে যায়। হাসপাতালের মতো স্থানে গ-গোল সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন। রোগীর আত্মীয়রা যতই ক্ষুব্ধ হন না কেন, ডাক্তারদের মারধর কিংবা হাসপাতাল ভাঙচুর করতে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জিরো টলারেন্স প্রদর্শন করতে হবে। প্রতিটি হাসপাতালে এই সুরক্ষা বাধ্যতামূলক করা দরকার। এই সেবা যেন উভয়ের কাছেই মানবিক হিসেবে চিহ্নিত হয়।