পোকা দমনে পার্চিং পদ্ধতি

ধানক্ষেতে গাছের ডাল, খুঁটি, বাঁশের কঞ্চি ও ধনিচার ডাল পুঁতে রাখা হয়। পাখিরা এসবের ওপর বসে ফসলের ক্ষতিকারক পোকামাকড় খেয়ে ফেলে। এই পদ্ধতিকেই বলা হয় পার্চিং পদ্ধতি। এ পদ্ধতি ব্যবহারের কম খরচে   পোকামাকড় যেমন দমন করা যায়, তেমনি ফসলের উৎপাদনও বাড়ে। পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করছেন জয়পুরহাটের কৃষকরা। তাদের কাছে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এই পদ্ধতি। উপজেলার বম্বু ইউনিয়নের বানিয়াপাড়া, বটতলী, ধারকী; ক্ষেতলাল উপজেলার মুনঝার, তালশনসহ কয়েকটি গ্রামের ফসলের মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, আমন ধানের জমিতে স্থানীয় কৃষকরা বাঁশের আগা ও গাছের ডাল প্রভৃতি পুঁতে দিয়েছেন। অনেকে ডাল পুঁতছেন, কেউ আবার খড়ির গাছ লাগিয়েছেন। আর এসব ডালে ফিঙে, শালিক, বুলবুলি, শ্যামা, দোয়েল, সাত ভায়রা পাখি পার্চিংয়ে বসে পোকা খাচ্ছে। ফসলও ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি ফিঙে পাখি সারা দিনে কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫টি করে মাজরা পোকার মথ, ডিম ও পুত্তলি খেয়ে থাকে। একটি পাখি দিয়ে প্রতি মাসে হাজার হাজার পোকা ধ্বংস করা সম্ভব হয়। পার্চিং স্থাপন মূলত ফসল রোপণের পরপরই করতে হয়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ মৌসুমে জয়পুরহাট জেলার ৫টি উপজেলায় ৬৯ হাজার ৭০৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। জেলায় গড়ে ৮০ ভাগ জমিতে পার্চিং পদ্ধতিতে চাষ হয়েছে। এ পদ্ধতি

কৃষকদের খুবই উপকারে আসছে, আগের তুলনায় ফলনও বাড়ছে।

বটতলী গ্রামের কৃষক মোসলেম বয়াতি জানান, ‘ তিনি সাত বিঘা জমিতে আমন ধানের চাষ করেছেন। জমির মধ্যে বাঁশ ও গাছের ডাল পুঁতে রেখেছেন। সেখানে পাখি এসে ধানগাছের পোকামাকড় ধরে খাচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে তিনি এ পদ্ধতিতে ধান চাষ করছেন।ফলে পোকা দমনে কম কীটনাশক ব্যবহার করলেই চলছে। এ পদ্ধতিতে ধান চাষ করায় তুলনামূলক খরচ কমেছে সেই সঙ্গে ফলনও বৃদ্ধি পেয়েছে।’ক্ষেতলাল উপজেলার মুনঝার গ্রামের আব্দুল ফজল জানান, ‘আগেও মাঠের সব জমির ধানেই পোকায় আক্রমণ করত। পোকা দমনে জমিতে কীটনাশক দিলে তেমন কাজ হতো না। অন্যদিকে খরচ অনেক হতো। কৃষি অফিসের কর্মকর্তারা পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করতে বলেন। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে খরচ ছাড়াই সুফল পাচ্ছি। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ মজিবুর রহমান জানান, ‘সাধারণত ধানগাছে মাজরা পোকা, পাতা মোড়ানো পোকা, খাটসুর, ঘাসফড়িং ও পাতাফড়িং আক্রমণ করে। পোকাখাদক পাখি জমিতে পুঁতে রাখা পার্চিংয়ে বসে এসব ক্ষতিকর পোকা খেয়ে ফেলে। তাই ধানের চারা রোপণের পর পর বাঁশের আগা, ও গাছের ডাল প্রভৃতি পুঁতে রাখলে জমিতে ক্ষতিকর পোকা দমন করা যায়। কীটনাশক কম লাগার ফলে ফলনও ভালো হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘ পৃথিবীর অনেক দেশেই এই পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে ধান চাষ করছেন। এর ফলে কীটনাশকের ব্যবহার কমে যায়। সে সঙ্গে কৃষকের উৎপাদন খরচও কম হয়। বালাইনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখা যায়। এ বছর জয়পুরহাটের প্রায় ৮০ ভাগ জমি পার্চিংয়ের আওতায় এসেছে। পার্চিং পদ্ধতির আরেকটি সুবিধা হলো পাখির বিষ্ঠা জমিতে জৈব পদার্থ যোগ করে উর্বরতা বাড়ায়। এ পদ্ধতিতে ফসলি জমিতে পোতা ডালগুলোর ওপর পাখি বসে ফসলি জমির ক্ষতিকারক পোকা ও পোকার ডিম খেয়ে ফেলায় কম কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়। ফলে বেশি ফলন পাওয়া যায়।’