লম্বা সময় অপেক্ষা করিয়ে রাখার পর রবিচন্দ্রন অশ্বিন এলেন। ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতেছেন বাংলাদেশের বিপক্ষে সেঞ্চুরি আর ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়ে। সংবাদ সম্মেলনটাও হলো যেন কোনো অধ্যাপকের ক্লাস, তাতে দাবা থেকে শুরু করে যোগ ব্যায়াম, বায়োমেকানিকস...কী নেই! শেষ করে বেরিয়ে প্রেসবক্সে যাওয়ার লিফটে এক ভারতীয় সাংবাদিকের কণ্ঠে শোনা গেল, ‘তিন দিনের ভেতর এ রকম দুটো ক্লাস...ভাবা যাচ্ছে না’!
আধুনিক যুগের ক্রিকেটারদের চেয়ে অশ্বিন একটু আলাদা নাকি অশ্বিন তার স্কুলের অন্য সবার মতোইে, ক্রিকেটাররাই আলাদা? চেন্নাইয়ের সেইন্ট বিডস স্কুলের ছাত্র ছিলেন অশ্বিন, এরপর বি-টেক করেছেন এসএসএন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ চেন্নাই থেকে। ক্রিকেটের বাইরেও অশ্বিনের আগ্রহ দাবা নিয়ে, এক সময় নিজেও খেলতেন। তার ইউটিউব চ্যানেলে প্রায়ই খেলার বাইরে বই, সিনেমা অনেক কিছু নিয়েও আলাপ করেন অশ্বিন। এ রকম একজন মানুষ যখন একটা ক্রিকেট অ্যাকাডেমি চালান, সেটা নিয়ে বাড়তি আগ্রহ জাগে। তাই চেন্নাই টেস্টের অকেজো হয়ে যাওয়া পঞ্চম দিনটা পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনার মতো সেই সুযোগ এনে দিলে হাতছাড়া করা গেল না। অ্যাপের কল্যাণে তামিল ভাষাটা না জেনেও অটোতে চড়ে সঠিক গন্তব্যে যাওয়া যায়, সোমবার দুপুরে প্রথম গন্তব্য তাই লয়ালা কলেজ মাঠে, যার একপ্রান্তে চলে অশ্বিনের জেন নেক্সট ক্রিকেট ইনস্টিটিউটের প্রশিক্ষণ পর্ব। সেখানকার কোচ ভিভেক বিকেলে এক খুদে ব্যাটসম্যানের স্ট্রেট-ড্রাইভ শুধরে দিতে ব্যস্ত। তার সঙ্গে আলাপেই জানা গেল লেভেল-১ কোচিং কোর্স শেষ করেছেন। এখানে উঠতি ক্রিকেটাররাই বেশি আসে। বাচ্চাদের আগ্রহ তো আছেই, বাবা-মায়েরও আগ্রহ আছে। সকালে এবং বিকেলে দুই সেশনে আসেন প্রশিক্ষণার্থীরা।
লয়াল কলেজে অশ্বিনের ক্রিকেট পাঠশালা দেখার পর গন্তব্য সেইন্ট বিডস অ্যাংলো ইন্ডিয়ান হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল, যে স্কুলে পড়েছেন অশ্বিন। ১৯০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত চেন্নাইয়ের এই বিখ্যাত স্কুলের বিখ্যাত সাবেক ছাত্রদের তালিকাটা বিশাল। অশ্বিন ছাড়াও কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্ত, দীনেশ কার্তিক, ওয়াশিংটন সুন্দর, অভিনব মুকুন্দ...ভারতীয় দলের হয়ে খেলা বেশ ক’জন ক্রিকেটার এই স্কুলের সাবেক ছাত্র। তবে সবচেয়ে বিখ্যাত প্রাক্তনী নিঃসন্দেহে দক্ষিণি সিনেমার রাজপুত্র মহেশ বাবু। ফোর্বস সাময়িকী এশিয়ার সেরা ১০০ সেলিব্রিটিদের তালিকায় তাকে রেখে আসছে ২০১২ সাল থেকে। এছাড়া সুরিয়া শিভকুমার, কার্থিক শিভকুমারসহ অনেক দক্ষিণি তারকাই পড়ালেখা করেছেন এই বিখ্যাত স্কুলে।
ঐতিহ্যবাহী এই স্কুলের একটা বড় আকর্ষণ স্কুলের নিজস্ব খেলার মাঠ। স্কুল থেকে একটু দূরেই এই স্কুলের নিজস্ব খেলার মাঠ আছে, যে মাঠটাকে বলা যায় চেন্নাই তৃণমূলের ক্রিকেটের প্রাণকেন্দ্র। অশ্বিন, দীনেশ কার্তিক, মুরালি বিজয়, বিজয় শংকর, সাই সুদর্শনসহ তামিলনাড়–র যেসব ক্রিকেটার জাতীয় দলে বা আইপিএলে সুযোগ পেয়েছেন, তাদের বেশিরভাগই ক্রিকেটের পাঠ নিয়েছেন এই মাঠেই। একসারিতে ১০-১২টা নেট, খোলা সবুজ ঘাসের মাঠ আর তার পাশে ভলিবল কোর্ট, টেনিস কোর্ট। নানা রকম খেলাধুলায় শৈশবে মেতে থাকতে এই স্কুলে আছে পর্যাপ্ত অবকাঠামো। তাই তো এই স্কুল শুধু ক্রিকেট নয়, ফেন্সিং, বাস্কেটবল, অ্যাথলেটিকসসহ অন্য অনেক খেলাধুলাতেই রাজ্য পর্যায়ে দেখিয়েছে শ্রেষ্ঠত্ব।
এ রকম একটা স্কুলে যার শৈশব কেটেছে, এরপর নিয়েছেন প্রকৌশলের ডিগ্রি, তার ক্রিকেটকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি যে অন্য অনেকের চেয়ে আলাদা হবে সেটা তো জানা কথাই। আপাতত অশ্বিনের ক্রিকেট অ্যাকাডেমিটা চালাচ্ছেন তার বাবা, এন রবিচন্দ্রন। অশ্বিন আছেন মেন্টরের ভূমিকায়। এখানকার শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তার প্রথম কথা, ‘স্পিন বোলিং হচ্ছে সফটওয়্যারের মতো। নিজেকে আপগ্রেড করতে হবে, নইলে পিছিয়ে পড়তে হবে’।