স্থানীয় সময় সোমবার ভোরে লেবাননে স্মরণকালের ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়ে প্রায় ৫০০ মানুষকে হত্যা করেছে ইসরায়েলের বিমান বাহিনী। এ হামলায় আহত হয়েছে আরও হাজারও মানুষ। তবে হামলার কয়েক ঘণ্টা আগেই লেবাননে ফোনে ফোনে হিজবুল্লাহ থেকে দূরে থাকো এমন সতর্কবার্তা পায় স্থানীয় জনগণ।
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল ও রাজধানী বৈরুতের অনেক এলাকায় সোমবার স্থানীয়দের হিজবুল্লাহর ঘাঁটি ও অবকাঠামো থেকে লোকজনকে সরে যেতে সতর্কবার্তা দেয় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। তাদের ফোনে ফোনে সতর্কবার্তা আসে যে হিজবুল্লাহ থেকে দূরে থাকার।
এতে করে লেবাননে ইসরায়েলের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আশঙ্কায় ছড়িয়ে পড়ে উদ্বেগ। পাশপাশি লেবাননের টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক ইসরায়েল হ্যাক করেছে—এমন শঙ্কাও দেখা দেয়। খবর আল জাজিরা।
এসব সতর্কবার্তা আসার কয়েকঘণ্টা পরই লেবাননে ভয়াবহ হামলা চালায় ইসরায়েল। এতে করে স্থানীয় জনগণের শংকা আরও বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসরায়েল যে পন্থায় লেবাননে হামলার সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে, সেটি প্রযুক্তিগত দিক থেকে দেশটির ওপর ইসরায়েলি আধিপত্যের কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েল তার সম্ভাব্য হামলা সম্পর্ক লোকজনকে সতর্ক করতে যে পদ্ধতি অনুসরণ করে আসছিল, সেটিরই পুনরাবৃত্তি ঘটাল লেবাননেও।
লেবাননে কী ঘটেছে
আল জাজিরা জানায়, মূলত দক্ষিণ লেবাননের গ্রামাঞ্চল এবং রাজধানী বৈরুতের কিছু আশেপাশের বাসিন্দারা সোমবার ভোরে একটি লেবাননের নম্বর থেকে খুদে বার্তা এবং ফোন কল পেয়েছিলেন। যেখানে তাদের হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
বৈরুত থেকে আল–জাজিরার সংবাদদাতা মাজেন ইব্রাহিম জানান, এসব বাসিন্দাদের কেউ কেউ তাঁদের মোবাইল বা ল্যান্ডফোনে রেকর্ডকৃত কল পান। কোন কোন বাসিন্দা পান খুদে বার্তা। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে পাঠানো বার্তায় লেখা ছিল, ‘আপনি যদি হিজবুল্লাহর অস্ত্রশস্ত্র থাকা কোনো ভবনে থাকেন, তবে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ওই গ্রাম থেকে দূরে থাকুন।’
সোমবার আল জাজিরার সংবাদদাতারা জানান যে বার্তাগুলো প্রচার করার জন্য রেডিও সম্প্রচারগুলোও হ্যাক করা হয়েছিল।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র দানিয়েল হাগারি গতকাল সকালে এক্স হ্যান্ডেলে পাঠানো এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘আমরা লেবাননের গ্রামবাসীর প্রতি এ বার্তা ও ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর পাঠানো সতর্কবার্তায় মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’
লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে যে, দেশটির তথ্যমন্ত্রী জিয়াদ মাকারিও রেকর্ড করা ফোন কল পেয়েছিলেন।
আল জাজিরার সংবাদদাতা বলেন, “আমরা জানি না কিভাবে ইসরায়েল স্থানীয় মানুষের ফোন নম্বর, অবস্থান-বিস্তারিত তথ্যগুলো পেয়েছে। এটি তথ্য ফাঁস, নাকি লেবাননের টেলিকম অবকাঠামোয় ইসরায়েলের হ্যাকিংয়ের কারণে ঘটল, সেটি এক প্রশ্ন।’
এগুলো কি সতর্কতার চেয়ে বেশি?
ইসরায়েল বলছে, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি কমাতে বোমা হামলার আগে তাদের সেনাবাহিনী সতর্কবার্তা পাঠায়। গাজায় চলমান যুদ্ধের সময়ও একই যুক্তি দেখিয়েছিল দেশটি।
কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি এ যুক্তিকে সমর্থন করে না। লেবাননে ইসরায়েলের বোমা এমন সব ভবনেও আঘাত হেনেছে, যেখানকার বাসিন্দারা কোনো সতর্কবার্তা পাননি। অন্যদিকে গাজায় বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে থাকা মানুষের ওপরও হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ইসরায়েলের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধেরও একটি উদাহরণ। এর উদ্দেশ্য, ফিলিস্তিনিদের এ কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে তাঁরা যখন, যেখানেই থাকুন, ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারিতে রয়েছেন।
এ নিবিড় নজরদারি ইসরায়েলকে তার নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতেও সহায়তা করেছে। গাজায় গ্রহণ করা এ পরিচিত পদ্ধতিই এবার লেবাননে ঘটাল ইসরায়েল।
কিভাবে লেবাননের টেলিকম নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশ করেছিল ইসরায়েল?
গত সপ্তাহে, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সদস্যদের ব্যবহৃত যোগাযোগ যন্ত্র হাজার হাজার পেজার এবং ওয়াকি-টকির বিস্ফোরণে অন্তত ৩৭ জন মারা গেছে। আহত হয়েছেন প্রায় তিন হাজার মানুষ। লেবানন, হিজবুল্লাহ এবং গোষ্ঠীর মিত্রদেশ ইরান ইসরায়েলকে দায়ী করেছে। যদিও ইসরায়েল দায় স্বীকার করেনি। তবে বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞরা এই বিস্ফোরণের পিছনে ইসরায়েলই ছিল বলে মনে করেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পেজার ও ওয়াকিটকিগুলো বিস্ফোরিত হওয়ার কয়েক মাস আগেই ইসরায়েল এসব যন্ত্রের ভেতর বিস্ফোরক ঢুকিয়ে দেয়। এ ঘটনার পর গতকাল লেবাননের নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের ফোনে ফোনে সতর্কবার্তা পাঠানো ও কল করার মধ্য দিয়ে ইসরায়েল এ ইঙ্গিতই দিল যে শত্রু হিজবুল্লাহই শুধু নয়, সাধারণ লেবাননিদের ব্যক্তিগত তথ্যে অনুপ্রবেশ করার সক্ষমতাও রয়েছে তার।
অবশ্য ঝুঁকি ও সংঘাতবিষয়ক বিশ্লেষক এলিজাহ ম্যাগনিয়ারের মতে, এ ঘটনায় বিস্ময়ের কিছু নেই।
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সংঘাত ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা এই বিশ্লেষক আল–জাজিরাকে বলেন, গত বছরের ৮ অক্টোবরের আগেই লেবাননের টেলিকম নেটওয়ার্ক হ্যাক করেছে ইসরায়েল।
তিনি বলেন, ‘তাদের কাছে ল্যান্ডলাইন, গাড়ির প্লেট নম্বর, মোবাইল ফোনের অ্যাক্সেস রয়েছে। এর মানে হলো পশ্চিম তীর বা গাজার মতো লেবাননের দক্ষিণেও যেকোনো ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠায় সক্ষম তারা।’
ম্যাগনিয়ার বলেন, অত্যাধুনিক গোয়েন্দা প্রযুক্তির অর্থ হল ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারে কে কোথায় থাকে, তাদের ফোন নম্বর কি এবং কারা তাদের বাড়িতে ঘন ঘন যাতায়াত করে।‘
এই গোয়েন্দারা নির্দিষ্ট সরঞ্জাম নিয়ে শহরের সড়কগুলোতে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় হাজার হাজার আইপি অ্যাড্রেস সংগ্রহ করতে সক্ষম বলে জানান এই বিশ্লেষক। সেই সঙ্গে কোনো এলাকায় হিজবুল্লাহর বৈঠকের মতো কোনো ‘অস্বাভাবিক ঘটনা’ ঘটছে কি না, সেটি শনাক্ত করা ও ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করতেও সক্ষম তাঁরা—বলেন ম্যাগনিয়ার।