বীরেন্দর শেবাগ যখন সাকিব আল হাসানকে অবসর নিতে বলেছিলেন, তখন বাংলাদেশে অনেক সমর্থকই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছিলেন। এমনকি সাকিবকেও এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে পাল্টা প্রশ্ন করেছিলেন ‘কে?’ শেষ পর্যন্ত শেবাগের কথাকে সত্যি করেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকেই এই সংস্করণে বাংলাদেশের হয়ে নিজের শেষ উপস্থিতির কথা জানিয়ে দিয়েছেন সাকিব। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কাছ থেকে নিরাপদে দেশ ছাড়ার ব্যাপারে কোনো প্রতিশ্রুতি না মেলায় দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে তাকে খেলতে দেখার আশাও ক্ষীণ। উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ থেকে ঘটমান বর্তমান হয়ে সাকিব দ্রুতই হয়ে যাবেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের সোনালি অতীত।
সাকিবকে অতীত করে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎটা কেমন? দলে সাকিবের জায়গাটা নেওয়ার মতো কে আছে? সাকিব আল হাসান যে দলের হয়ে সাংসদ হয়েছিলেন, সেই আওয়ামী লিগও বিকল্প না থাকার ভয় দেখাত। জনতা যেভাবে বিকল্প খুঁজে নিয়েছে, তেমনি সাকিবের বিকল্পও তৈরি হয়ে যাবে নিঃসন্দেহে। সাকিবকে ছাড়াই যে সামনের দিনগুলোতে ভালো করতে পারবে বাংলাদেশ, তার প্রমাণ এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
পাকিস্তানের বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে টেস্ট সিরিজ জয় নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি। এই সিরিজেই ব্যাটিং বা বোলিং, কোনো ভূমিকাতেই খুব একটা মূল্যবান ভূমিকা রাখতে দেখা যায়নি সাকিবকে। এছাড়াও নিউজিল্যান্ডে মাউন্ট মঙ্গানুইতে ঐতিহাসিক জয়েও সাকিব ছিলেন না দলে, দেশের মাটিতে নিউজিল্যান্ডকে টেস্টে হারানোর দলেও ছিলেন না সাকিব। এছাড়া সম্প্রতি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও সাকিব নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচে একটা হাফসেঞ্চুরি বাদে বাকি সময়টা ছিলেন বিবর্ণ। বিপিএলের সবশেষ আসরেও রংপুর রাইডার্স অনেকটা ভুগেছে সাকিবের ব্যাটিং ব্যর্থতায়। সাকিবের নেতৃত্বে ২০২৩ বিশ্বকাপেও ছন্নছাড়া ছিল বাংলাদেশ। পারফরম্যান্স এবং নেতৃত্ব, দুই ভূমিকাতেই সাকিব ক্রমশ রঙ হারিয়েছেন। তাই ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে এসে খেলা ছাড়ার ঘোষণা যখন সাকিব দিলেন, তখন তার অনুপস্থিতি খুব বড় প্রভাব ফেলবে না বাংলাদেশ দলের মাঠের খেলায়। এমনটাই মনে করেন ক্রিকেট সংশ্লিষ্টরা। সাবেক অধিনায়ক এবং বিসিবির ব্যাটিং কোচ রাজিন সালেহ দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, উঠতি অলরাউন্ডার মাহফিজুর রহমান রাব্বির ভেতর সাকিবের ছায়া দেখতে পান, ‘সাকিবের বিকল্প নেই, ঠিক। কিন্তু তাকে ছাড়াও বাংলাদেশ খেলেছে। তবে আরেকটা সাকিব তৈরি হতে সময় লাগবে। ব্রায়ান লারার রেকর্ড ম্যাথু হেইডেন ভেঙেছিল। পরে লারা আবার সেটা ভেঙে এখনো নিজের করে রেখেছে। রেকর্ড হয় রেকর্ড ভাঙার জন্য। তেমনি একজন সেরা ক্রিকেটার চলে যায় আরেকজনকে সেরা হওয়ার সুযোগ দিতে। এইচপিতে আমি মাহফুজ রাব্বিকে দেখেছি, তার মধ্যে আমি সেই ছায়া পাই, যা সাকিবের মধ্যে দেখে এসেছি। তাকে সময় দিলে সে গড়ে উঠবে বলে মনে করি। সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। তবে অবসরটা সম্পূর্ণ তার ইচ্ছা। আমি মনে করি পারফরম্যান্সের বাইরের বিষয়ও তাকে ভাবিয়েছে। প্রেস কনফারেন্সে সাকিবের নিরাপদে দেশে আসা এবং দেশত্যাগ নিয়েছে মন্তব্য সেটাই প্রকাশ করেছে।’
বিসিবি পরিচালক এবং বিকেএসপির ক্রিকেট উপদেষ্টা নাজমুল আবেদীন ফাহিম সাকিবের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন। শৈশবের ক্রিকেট গুরু। ফাহিমও মনে করেন সিদ্ধান্তটা সময়োপযোগী, ‘বাংলাদেশ ক্রিকেটে তার অবদান আমরা সবাই জানি। হয়তো অনেকে সামনাসামনি স্বীকার করি না। সবার মনের মধ্যে সে কোনো না কোনোভাবে থেকে যাবে। কারও কাছে ইতিবাচকভাবে, কারও কাছে নেতিবাচকভাবে। ঘরের মাঠে শেষ টেস্ট খেললে, সবার ভালোবাসা নিয়ে অবসর নিলে ভালো হতো’ গণমাধ্যমে এমনটাই জানিয়েছেন বিসিবি পরিচালক।
সাকিবের অবর্তমানে যেটা বাংলাদেশের ক্রিকেট সবচেয়ে বেশি যা হারাবে তা হচ্ছে আন্তর্জাতিক পরিচিতি। সাকিবের আইপিএল, কাউন্টি, বিগব্যাশ মিলিয়ে পরিচিতির যে ব্যাপ্তি, সেটা বাংলাদেশের অন্য কোনো ক্রিকেটারের হয়ে ওঠেনি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আশরাফুলের পর সাকিবকে ঘিরেই আগ্রহের মাত্রাটা ছিল সবচেয়ে বেশি। যেটা স্পষ্ট বোঝা গেছে সাকিবের অবসর ঘোষণার সংবাদ সম্মেলনেও, যেটা সাকিব ছাড়া অন্য কোনো ক্রিকেটারের বেলায় হয়তো দেখা যেত না। তবে এই হারানোর বিপরীতে প্রাপ্তি হতে পারে স্থিরতা। সাকিব দলে থাকা মানেই কোনো একটা বিতর্ক ধেয়ে আসার আশঙ্কা, পরের সিরিজে তাকে পাওয়া যাবে কি না এ সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা। সাকিব পরবর্তী সময়ে এসব সমস্যাও হয়তো কাটিয়ে উঠবে বাংলাদেশ দল।