লেবাননের বৈরুতে ইসরায়েলের বিমান হামলায় হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরাল্লাহ নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। হিজবুল্লাহর অন্য দুই কমান্ডারদের সাথে নাসরাল্লাহ নিহত হয়েছেন বলে দাবি জানিয়েছে দেশটি।
শুক্রবার বৈরুতের দক্ষিণে ঘনবসতিপূর্ণ শহর দাহিয়েহতে হিজবুল্লাহর শীর্ষ কমান্ডারদের লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইসরায়েল।
তার মৃত্যু ঘোষণা করে এক বিবৃতিতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে যে, অনেক ইসরায়েলি বেসামরিক ও সৈন্যকে হত্যা এবং হাজার হাজার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নকারী হচ্ছে নাসরাল্লাহ। ইসরায়েল তাকে হিজবুল্লাহর কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী এবং সংগঠনের কৌশলগত নেতা বলে অভিহিত করেছে।‘
ইরান সমর্থিত লেবাননের শিয়া মুসলিম সংগঠন হিজবুল্লাহর প্রধান শেখ হাসান নাসরুল্লাহ মধ্যপ্রাচ্যে অন্যতম পরিচিত এক মুখ ও সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতাদের একজন। ইরানের সহায়তায় চার দশক আগে গঠিত এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হাসান নাসরাল্লাহ ১৯৯২ সালে হিজবুল্লাহ প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ইসরায়েলি হেলিকপ্টার হামলায় তার পূর্বসূরি এবং পরামর্শদাতা আব্বাস মুসাভি নিহতের পর হিজবুল্লাহর সেক্রেটারি-জেনারেল হিসাবে দায়িত্ব নেন তিনি।
হিজবুল্লাহকে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী আধাসামরিক বাহিনীতে পরিণত করার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তার। নাসরুল্লাহর নেতৃত্বে হিজবুল্লাহ ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের যোদ্ধাদের পাশাপাশি ইরাক ও ইয়েমেনের মিলিশিয়াদের প্রশিক্ষণগত সহায়তা দিয়েছে। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবহারের লক্ষ্যে ইরানের কাছ থেকে সংগ্রহ করা ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেটের এক সমৃদ্ধ ভান্ডার রয়েছে হিজবুল্লাহর।
বছরের পর বছর লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকলেও নাসরুল্লাহর প্রতি তাঁর সমর্থকদের শ্রদ্ধা–ভালোবাসা এতটুকু কমেনি।
দখলকৃত লেবাননি ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি সেনাদের তাড়াতে প্রথমে একটি মিলিশিয়া দল হিসেবে গড়ে উঠেছিল হিজবুল্লাহ। পরে এ দলকেই লেবাননের সেনাবাহিনীর চেয়ে শক্তিশালী এক বাহিনীতে রূপ দেন নাসরুল্লাহ। সংগঠনটি এখন দেশের রাজনীতিতেও উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তারকারী একটি শক্তি।
এছাড়া লেবাননের জনগণকে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, শিক্ষা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও নিয়োজিত হিজবুল্লাহ।
হাসান নাসরাল্লাহ
১৯৬০ সালে সাধারণ একজন মুদি ব্যবসায়ীর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন হাসান নাসরুল্লাহ। লেবাননের রাজধানী বৈরুতের পূর্বাঞ্চলীয় উপকণ্ঠের বুর্জ হামুদ এলাকায় বেড়ে উঠেন তিনি। নাসরাল্লাহ তার কৈশোরকাল লেবাননের গৃহযুদ্ধের ছায়ায় অতিবাহিত করেন। নয় সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়।
১৯৭৫ সালে লেবাননে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে তিনি শিয়া মুভমেন্ট ‘আমাল আন্দোলনে’ যোগ দেন। পরে কিছুকাল ইরাকের নাজাফে শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাটান। সেখান থেকে লেবাননে ফিরে আবার আমালে যোগ দেন। ১৯৮২ সালে আরও কয়েকজনের সঙ্গে দলটি থেকে বেরিয়ে যান তিনি।
আমাল থেকে দলছুট হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ইসলামিক আমাল’। দলটি পরবর্তী সময়ে শিয়া মিলিশিয়াদের সবচেয়ে পরিচিত ও কার্যকর দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে। একপর্যায়ে এটিই সশস্ত্র হিজবুল্লাহ সংগঠনে রূপ নেয়।
১৯৮৫ সালে একটি খোলা চিঠি প্রকাশের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে হিজবুল্লাহ সংগঠনের প্রতিষ্ঠার কথা জানায় তাঁরা। ইসলামের প্রধান দুই শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয় যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নকে। পাশাপাশি মুসলিমদের ভূমি দখলকারী হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়ে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলকে ধ্বংস করার ডাক দেয় হিজবুল্লাহ।
১৯৯২ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে হিজবুল্লাহর প্রধান হন নাসরুল্লাহ। এ দায়িত্ব নেওয়ার পর তার পূর্বসুরী মুসাবি হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া ছিল হাসান নাসরুল্লাহর প্রথম কাজ। সে অনুযায়ী ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে রকেট হামলার পাশাপাশি তুরস্কে ইসরায়েলের দূতাবাসে গাড়িবোমা হামলার নির্দেশ দেন তিনি। ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসে ইসরায়েলি দূতাবাসে আত্মঘাতী হামলায় ২৯ জন নিহত হন।
লেবাননের সাথে ইসরায়েলের নানা সংঘর্ষের মধ্যেই ২০০০ সালে লেবানন থেকে পিছু হটে দেশে ফিরে যান ইসরায়েলি সেনারা। এটিকে নাসরুল্লাহ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরবদের প্রথমবারের মতো বিজয়ের দাবি করেন।
পরবর্তীতে ২০০৬ সালে আবারও ইসরায়েল–হিজবুল্লাহর মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি দেখা দেয়। ওই বছর হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা ইসরায়েল সীমান্তে হামলা চালালে আট সেনা নিহত ও দুজন অপহৃত হন। পরে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল ও বৈরুতের দক্ষিণে ইসরায়েলের ব্যাপক হামলায় ৩৪ দিন ধরে চলা যুদ্ধে অন্তত ১ হাজার ১২৫ লেবাননি নিহত হন, যাঁদের বেশির ভাগ ছিলেন বেসামরিক লোক। নিহত হন ১১৯ ইসরায়েলি সেনা ও ইসরায়েলের ৪৫ বেসামরিক নাগরিকও।
সম্প্রতি গেলো বছর গাজায় ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা ও গণহত্যার প্রতিবাদের আবারও উত্থেজনা বৃদ্ধি পায় হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের। ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রদর্শনের অংশ হিসেবে মাঝেমধ্যেই ইসরায়েলের অভ্যন্তর ও দখলকৃত গোলান মালভূমি এলাকায় রকেট হামলা চালায় হিজবুল্লাহ।
তবে গত কয়েকমাস ধরে বৃদ্ধি পায় দুই পক্ষের হামলার পরিমাণ। অতিসম্প্রতি লেবাননে পরপর দুদিন হাজার হাজার পেজার ও ওয়াকিটকি বিস্ফোরণের ঘটনায় হিজবুল্লাহর সদস্যসহ অন্তত ৩৯ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন হাজারো মানুষ। এই হামলার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করেছে হিজবুল্লাহ।
এর পর পরই লেবাননে ভয়াবহ হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল, প্রতিদিনই দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে ও রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণে হামলা চালাচ্ছে দখলদার দেশটি। ইতিমধ্যে লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় প্রায় ৮০০ লেবাননি প্রাণ হারিয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন লাখো মানুষ।