ব্যাটিং প্রতিভার এত আকাল!

জেন-জি বা জেনারেশন জি, জুলাই বিপ্লবের কল্যাণে বাংলাদেশে এই শব্দটি পেয়েছে বাড়তি মাত্রা। ১৯৯৭ থেকে ২০১২; এই সময়ে যাদের জন্ম তাদেরই মূলত বলা হয় জেন-জি। ক্রিকেটের জনপ্রিয় ওয়েবসাইট ক্রিকইনফো এই জেন-জি প্রজন্মের যে সেরা চার ব্যাটসম্যান বেছে নিয়েছে, তাতে বাংলাদেশের কেউ নেই। থাকার কথাও নয়। কারণ গত দেড় দশকে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বমানের কোনো ব্যাটসম্যানই উঠে আসেনি।

আইসিসি টেস্ট ব্যাটসম্যানদের র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের যে ক্রিকেটারের নাম এখন সবার আগে, তিনি ২০তম স্থানে থাকা লিটন কুমার দাস। ২৩তম স্থানে মুশফিকুর রহিম, ৪৩ নম্বরে সাকিব আল হাসান। ৪৮ নম্বরে নাজমুল হোসেন শান্ত। শীর্ষ পঞ্চাশে পাওয়া গেল মাত্র ৪ জনের নাম। ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ে চোখ বুলিয়ে তালিকায় নিচে নামতে থাকলে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সবার প্রথমে খুঁজে পাওয়া যাবে মুশফিকুর রহিমকে, ২৪তম অবস্থানে। এরপর ৩৭তম স্থানে নাজমুল হোসেন শান্ত, ৪৮ নম্বরে সাকিব আল হাসান। শীর্ষ ৫০ জনের ভেতর বাংলাদেশের মাত্র ৩। টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সবার ওপরে তাওহীদ হৃদয়, ২৬ নম্বরে। লিটনের অবস্থান ৪০তম। এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের ব্যাটিং সামর্থ্য কোন পর্যায়ের।

বিরাট কোহলি, কেন উইলিয়ামসন, স্টিভেন স্মিথ এবং জো রুট; মিলেনিয়াল অর্থাৎ জেন-জি’র আগের প্রজন্মের এই চার ব্যাটসম্যানকে একসঙ্গে অনেক সময় বলা হয় ফ্যাবুলাস ফোর বা ফ্যাব ফোর। এই চার ব্যাটসম্যান সময়ের সেরা, নিজ নিজ দলকে কৃতিত্বের সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়ে সাফল্য এনে দিয়েছেন। জেন-জি’র ফ্যাবুলাস ফোর-এ ক্রিকইনফো রেখেছে রাচিন রবীন্দ্র, যশস্বী জয়সওয়াল, হ্যারি ব্রুক এবং কামিন্দু মেন্ডিসকে। এরা প্রত্যেকেই তিন সংস্করণের ক্রিকেটে রেখেছেন প্রতিভার ছাপ এবং তাদের ব্যাটেই দেখা যায় উজ্জ্বল আগামীর প্রতিশ্রুতি। বাংলাদেশ থেকে বিশ্বমানের অলরাউন্ডার উঠে আসছে, পেস বোলার উঠে আসছে এমনকি অনেকদিন পর একজন ভালো মানের লেগস্পিনারও খুঁজে পাওয়া গেছে। কিন্তু মোহাম্মদ আশরাফুলের পর ব্যাটিং দিয়ে কেউ বিশ্বকে চমকে দিতে পারেননি। লিটন দাসকে নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও সেটা মূলত বাংলাদেশের ক্রিকেট মহলেই, বৈশ্বিক পর্যায়ে লিটনের প্রতিভার প্রমাণ খুব যে দেখা গেছে তেমনটা নয়। কেন ভালো ব্যাটসম্যান পাচ্ছে না বাংলাদেশ, এই প্রশ্নটাই দেশ রূপান্তরের তরফ থেকে রাখা হয়েছিল ওয়াসিম জাফরের কাছে। ভারতের সাবেক এই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার কয়েক দফায় কাজ করেছেন বাংলাদেশে। জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচ ছিলেন, সবশেষ অনূর্ধ্ব-১৯ দলেরও ছিলেন ব্যাটিং পরামর্শক। বাংলাদেশের ক্রিকেট অবকাঠামো, সমস্যা সবই তার জানা। কানপুর টেস্টের দ্বিতীয় দিন বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়ার সুযোগে আলাপ হলো তার সঙ্গে। তার পরামর্শটা অবশ্য নতুন কিছু নয়। সমস্যাটা সবারই জানা, শুধু সমাধান কেন হচ্ছে না সেটাই অজানা।

বাংলাদেশ থেকে মোস্তাফিজুর রহমানের মতো কাটার মাস্টার বোলার উঠে আসে, নাহিদ রানার মতো পেসার পাওয়া যায়; কিন্তু ব্যাটসম্যান কেন পাওয়া যায় না? ভারতে রোহিত শর্মা-বিরাট কোহলিদের সময় শেষ হওয়ার আগেই শুবমান গিল, জয়সওয়ালরা রান করার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। কামিন্দু মেন্ডিস মনে করিয়ে দিচ্ছেন ডন ব্র্যাডম্যানকে। হ্যারি ব্রুক ইংল্যান্ডকে সাহস জোগাচ্ছেন ‘বাজবল’ মন্ত্রে স্থির থাকতে। ২০২৩ বিশ্বকাপে রাচিন রবীন্দ্র আবির্ভাবেই চমকে দিয়েছেন,এই বছরের শুরুতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে করেছেন ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি, সেটাও আবার ডাবল সেঞ্চুরি! তেতো হলেও সত্যি, এ রকম কোনো কৃতিত্ব বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানের নেই। কেন এই পর্যায়ে বাংলাদেশের কাউকে পাওয়া যায় না, তার পেছনে দেশের উইকেট একটা প্রধান কারণ বলে মনে করেন ওয়াসিম, ‘কারণ হিসেবে আমি যেটা মনে করি, (বাংলাদেশের) ঘরোয়া ক্রিকেটের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পার্থক্যটা অনেক বেশি। বাংলাদেশে ঘরোয়া ক্রিকেটে যেসব উইকেটে খেলা হয় আর বাংলাদেশের বাইরে গেলে যেসব উইকেটে ব্যাটসম্যানরা খেলে, সেটা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। ঘরোয়া ক্রিকেটের মান, সেটাই আমার কাছে প্রধান কারণ।’ ১০ টেস্ট খেলা জাকির হাসান ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে খেলেছেন ৮০টা ম্যাচ, সবশেষ ইনিংসে ২৪ বল খেলে একটা রানও করতে পারেননি কানপুরে। গত মৌসুমের জাতীয় লিগে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সাদমান ইসলামের, বছর দুয়েক পর টেস্ট দলে ফিরে ইনিংসগুলো শুরু করতে পারলেও থেমে যাচ্ছে অকালে। এ রকম অনেকেই আছেন যারা ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত রান করেও জাতীয় দলে এসে পারেন না। সমস্যাটা কি তাহলে তাদের ব্যাটিং কৌশলে, এমন প্রশ্নে ওয়াসিমের উত্তর, ‘সমস্যাটা তাদের ব্যাটিং কৌশলের নয়, প্রতিপক্ষের শক্তিতে। ঘরোয়া ক্রিকেটের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পার্থক্যটা অনেক বেশি। ঘরোয়া ক্রিকেটে যে স্তরের বোলিং তারা খেলে আসে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার চেয়ে অনেক কঠিন বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে খেলতে হয়। তাদের আসলে ঘরোয়া ক্রিকেটের বাইরে বয়সভিত্তিক ক্রিকেট, হাই পারফরম্যান্স ক্রিকেট এই সব পর্যায়ে বিদেশি প্রতিপক্ষের সঙ্গে অনেক বেশি খেলতে হবে। দেশের বাইরে খেলতে হবে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আসার আগে তাদের পরিণত হতে হবে সময় নিয়ে। বাংলাদেশে অন্য অনেক দেশের চেয়ে কম সময়ে জাতীয় দলে চলে আসা যায়, এটাই আমি বলব।’

বছর পাঁচেক আগেও বাংলাদেশ টেস্ট খেলেছে কোনো পেস বোলার ছাড়া। সৌম্য সরকারের মিডিয়াম পেস সম্বল করে টেস্টে নতুন বল হাতে নেওয়ার  দুঃসাহসও দেখিয়েছে। মূলত বিদেশে ভালো করার তাগিদ থেকেই পেস বোলার খোঁজার এবং তাদের  যথাযথভাবে প্রশিক্ষণের বাড়তি উদ্যোগ নিয়েছে বিসিবি, উদ্যোগ আছে লেগস্পিনার খোঁজার বেলাতেও। কিন্তু রান করার বেলায় যে ভাটার টান সেদিকে মনোযোগ নেই। ব্যাটসম্যানদের মান ভালো করার জন্যও কি এমন কিছু করা দরকার? প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রায় ২০ হাজার রান করা ওয়াসিমের অভিমত, ‘ভালো উইকেটে খেলার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। ঢাকার মাঠে (শেরে বাংলা) বা একাডেমিতে যেসব উইকেট দেখেছি, বেশিরভাগই র‌্যাংক টার্নার, কম বয়সে এসব উইকেটে দিনের পর খেলাটা ঠিক নয়। ভালো উইকেটে খেললে ভালো ব্যাটসম্যান উঠে আসবে। ঢাকার বাইরে উইকেট বা  সুযোগ-সুবিধা পর্যাপ্ত নয়, বিশেষ করে অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে।’ ওয়াসিম আরও যোগ করে বলেন, ‘সুযোগ-সুবিধাগুলো বাড়াতে হবে। উইকেট ভালো হওয়া খুব দরকার। অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে অনেককেই দেখেছি কংক্রিটের উইকেটে অনুশীলন করে, বিশেষ করে নিজের শহরে। যেটা একদমই উচিত নয়। উইকেট ভালো হলে ফলও ভালো হবে।’

ভালো উইকেট বানাতে প্রয়োজন ভালো কিউরেটর। অথচ দেশের প্রধান স্টেডিয়ামের কিউরেটরের দায়িত্বে থাকা গামিনি ডি সিলভা নাকি আদতে কিউরেটরই নন! চেন্নাই টেস্টের প্রথম দিনের খেলা দেখার সময় আলাপ হচ্ছিল বিসিসিআইয়ের প্রধান কিউরেটর আশীষ ভৌমিকের সঙ্গে। এই পদে আসার আগে তিনি ছিলেন ভারতের সব কিউরেটরের প্রশিক্ষণের দায়িত্বে। ত্রিপুরায় বাড়ি, তাই বাংলায় জমে ওঠা আলাপে বলেই ফেললেন, ‘হ্যায় তো কোনো কিউরেটরই না, হ্যায় আছিল আম্পায়ার’। যে দেশে গত দেড় দশক ধরে কিউরেটরের কাজের কোনো রকম অভিজ্ঞতা এবং প্রশিক্ষণ ছাড়াই যদি একজন উইকেট বানিয়ে যেতে পারেন, সেই দেশের ব্যাটসম্যানদের যে র‌্যাংকিংয়ের তলানিতে দেখা যাবে এটাই তো স্বাভাবিক।