হাসান নাসরাল্লাহর মৃত্যু, এখন কি করবে হিজবুল্লাহ, ইসরায়েল এবং ইরান?

টানা ৩২ বছর ধরে ইরান সমর্থিত লেবানন ভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর নেতৃত্ব দিয়েছেন হাসান নাসরাল্লাহ। তবে গত শুক্রবার লেবাননের বৈরুতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন তিনি।

হাসান নাসরাল্লাহর মৃত্যুতে বেশ বড় ধাক্কা খেয়েছে হিজবুল্লাহ এবং লেবানন। এছাড়া একের পর এক সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের হত্যাকাণ্ডে বেশ ক্ষুব্ধ ইরানও।

দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলী খামেনি বলেছেন, হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসারাল্লাহর মৃত্যু ‘প্রতিশোধহীন’ যাবে না। এছাড়া নাসরাল্লাহর মৃত্যুতে ইরানে পাঁচ দিনের শোক ঘোষণা করেছেন তিনি। একই সাথে জরুরি ভিত্তিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সভা ডাকার আহবান জানিয়েছে দেশটি।

অন্যদিকে, নাসারুল্লাহর মৃত্যুকে ‘ঐতিহাসিক মোড় ঘুরানো ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আর এই হত্যাকাণ্ডকে ‘ন্যায়বিচারমূলক পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।

হাসান নাসরাল্লাহকে হত্যা মূলত লেবাননের এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটির সাথে ইসরায়েলের যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে ধরা হচ্ছে।

হেজবুল্লাহ এখন কী করবে

একের পর এক আঘাতে জর্জরিত হিজবুল্লাহ। এক ডজনেরও বেশী শীর্ষ পর্যায়ের কমান্ডারের হত্যাকাণ্ডে এর কমান্ড কাঠামো বিপর্যস্ত।

এছাড়া যোগাযোগের যন্ত্র পেজার ও ওয়াকিটকি বিস্ফোরণের ঘটনায় সংগঠনটির যোগাযোগ কাঠামো এবং বিমান হামলায় বহু অস্ত্র ধ্বংস হয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্য নিরাপত্তা বিশ্লেষক মোহাম্মেদ আল-বাশা বলেছেন: “হাসান নাসারুল্লাহকে হারানোর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়বে, গোষ্ঠীটি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার সম্ভাবনার পাশাপাশি স্বল্প মেয়াদে এর রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশলকে পরিবর্তন করবে।

তবে ইসরায়েল বিরোধী শক্তিশালী এই সংগঠনটি হুট করে ক্ষান্ত দেবে এমন প্রত্যাশা কিংবা ইসরায়েলের চাওয়া অনুযায়ী শান্তির পথে আসবে তা সম্ভবত হবে না। কারণ হিজবুল্লাহ ইতোমধ্যেই লড়াই অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে এবং ইসরায়েলে হামলা চালাচ্ছে।

দলটির এখনো হাজার হাজার যোদ্ধা আছে। এদের অনেকেরই সিরিয়া যুদ্ধে অংশ নেয়ার অভিজ্ঞতা আছে এবং তারা প্রতিশোধ নেয়ার দাবি করেছে।

সংগঠনটির এখনো যথেষ্ট পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র আছে, যার অনেকগুলোই দূরপাল্লার। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার মতো অস্ত্র আছে, যা তেল আবিব ও অন্য শহরগুলোতে পৌঁছাতে পারে। নিজেরা আরও ধ্বংসের লক্ষ্যে পরিণত হওয়া বা নিশ্চিহ্ন হওয়ার আগে সেগুলো ব্যবহারের জন্য গোষ্ঠীটির ভেতরে চাপ বাড়ছে।

কিন্তু ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভেদ করে তারা সেটি যদি করে এবং তাতে বেসামরিক নাগরিক হতাহত হলে ইসরায়েলের জবাব হতে পারে আরও ভয়াবহ। তাতে লেবাননের অবকাঠামো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে এবং এমনকি সেটি বিস্তৃত হতে পারে ইরান পর্যন্ত।

ইরান কী করবে?

ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহর প্রধান নাসরাল্লাহর হত্যাকাণ্ড ইরানের জন্যও একটি বড় ধাক্কা। ইতোমধ্যেই ইরানে পাঁচ দিনের শোক ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া দেশটি তাদের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলী খামেনিকেও সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে গোপন জায়গায় সরিয়ে নিয়েছে।

গত জুলাই মাসে তেহরানের গেস্ট হাউজে সাবেক হামাস প্রধান ইসমাইল হানিয়ার হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ এখনও নিতে পারেনি ইরান। এর মধ্যে যোগ হয়েছে নাসরাল্লাহ হত্যাকাণ্ড। বিশেষতই বেশ ক্ষুব্ধ দেশটি। 

পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ইরানের বেশ কিছু সশস্ত্র সহযোগী গোষ্ঠী আছে। হিজবুল্লাহর মতো ইয়েমেনে আছে হুতি এবং ইরাক আর সিরিয়ায় আছে কয়েকটি গোষ্ঠী। প্রতিশোধ হিসেবে ইরান এসব গোষ্ঠীকে ইসরায়েলে এবং ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে হামলা করতে নির্দেশ দিতে পারে।

কিন্তু যেই পদক্ষেপই ইরান নিক না কেন সেটি হবে যুদ্ধের জন্য বন্দুকে চাপ দেয়ার মতো, যাতে তারা জয়ের খুব একটা আশা করতে পারে না।

ইসরায়েল কী করবে?

নাসরাল্লাহ হত্যাকে বড় বিজয় হিসেবে দেখছে ইসরায়েল, কিন্তু এখনই হামলা বন্ধ করতে রাজি নয় দেশটি। যুক্তরাষ্ট্রসহ ১২টি রাষ্ট্রের দেয়া একুশ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব অনুযায়ী সামরিক অভিযান বন্ধ করার কোন লক্ষ্যই ইসরায়েলের নেই। দেশটির সামরিক বাহিনী হিজবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি পুরোপুরি না যাওয়া পর্যন্ত আরও আক্রমণ চালাতে চায়।

হিজবুল্লাহর আত্মসমর্পণের সম্ভাবনা কম। এটা দেখা খুব একটা সহজ হবে না যে কীভাবে ইসরায়েল স্থল অভিযানে সৈন্য না পাঠিয়ে হিজবুল্লাহর আক্রমণের হুমকি দূর করে তাদের যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জন করে।

ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্স অবশ্য সীমান্তের কাছে তাদের পদাতিক বাহিনীর প্রশিক্ষণের ফুটেজ প্রকাশ করেছে। তবে সবশেষ যুদ্ধের পর হিজবুল্লাহ আঠার বছর সময় ব্যয় করে পরবর্তী যুদ্ধের পর প্রশিক্ষণ নিয়েছে।

মৃত্যুর আগে সবশেষ বক্তৃতায় নাসারুল্লাহ তার অনুসারীদের বলেছেন দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের অনুপ্রবেশ তার ভাষায় হবে ‘একটি ঐতিহাসিক সুযোগ’।

আইডিএফের জন্য লেবাননে যাওয়া সহজ হবে কিন্তু গাজার মতো বেরিয়ে আসতে হলে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা