আহত কিশোর কি স্বাধীনতার স্বাদ পাবে না?

বহু পথ মাড়িয়ে, দেড় হাজারের বেশি শহীদের রক্তে ভেজা রাজপথ পেরিয়ে আমাদের দেশে ইনকিলাব ফুটেছিল ৫ আগস্ট ২০২৪, যেদিনকে আমরা ভালোবেসে বলছি ৩৬ জুলাই। আন্দোলনে আহত হয়েছে ২২ হাজার, পঙ্গুত্ববরণ করেছে ৫ শতাধিক, ৬৮৫ জন গুলিতে আংশিক বা সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে। দুই চোখই নষ্ট হয়ে গেছে ৯২ জনের। ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার বিলোপ ঘটিয়ে একটি সাম্য ও মানবিক দেশ গড়ার জন্য এত আত্মত্যাগ বিশে^ বিরল।

শুধু ২০২৪ সাল নয়, বাংলাদেশিরা যুগের পর যুগ নানা ইতিহাসের পটপরিবর্তনে আত্মত্যাগ করেছে। কিন্তু বারবার ঘুঘু এসে পাকা ধান খেয়ে যায়। পিআইবির ডিজি ও সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফ গত ১২ সেপ্টেম্বর দৈনিক সমকালে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের মাটি উর্বর, কারণ এখানে দুর্ভিক্ষে, গণহত্যায় মারা যাওয়া অগণিত লাশ মাটির বুকে নাইট্রোজেনের জোগান দিয়েছে।’ সত্যি সত্যি এ দেশের মানুষের ত্যাগ অনেক। ইতিহাসের পথরেখার বিভিন্ন বাঁকের গণ-অভ্যুত্থান দেখলেও, পরে সেই অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে জাতি গড়তে পারিনি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে যে আকাক্সক্ষা ও চেতনা থেকে মানুষ যুদ্ধে গিয়েছে, শহীদ হয়েছে, স্বাধীন পতাকা পেয়ে আপ্লুত হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সে আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন হয়নি। নব্বই দশকে স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে গণতন্ত্রের প্রতি যে সর্বদলীয় প্রতিশ্রুতি তৈরি হয়েছিল, রাজনৈতিক দলগুলো সে চেতনা ধরে রাখেনি। রাজনৈতিক দলগুলো ১/১১ থেকেও কোনো রাজনৈতিক পাঠ নেয়নি। কেন বারবার আমরা জাতীয় চেতনার নিরিখে দেশের জন্য ঐক্যবদ্ধ হতে ব্যর্থ হই! যদি গভীরভাবে চিন্তা করি, তবে এতে দেশ-বিদেশ থেকে ষড়যন্ত্র দেখতে পাব। যারা আমাদের নানা ছোট ছোট ইস্যুতে বিভক্ত করে রাখতে চায়। আমরা সাম্য ও মানবিক দেশ গড়ি, সেটা তারা চায় না। এই শক্তির কাছে আমরা বারবার হেরে গেছি। কিন্তু আর না!

৪ আগস্ট রাতে মানুষ একে অন্যকে ফোন করে বলেছে, ‘কাল হয় শহীদ নয়তো বিজয়, হয়তো এটাই শেষ কথা।’ আমাদের শহীদের তালিকা দেড় হাজারেরও বেশি। কিন্তু আরও হাজার হাজার গাজী শহীদ হতে রাজি ছিল। এই স্পিরিট একটি স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার পাথেয়। প্রত্যেকটা অভ্যুত্থান বা বিপ্লবের পর একটি নতুন চেতনা জাগ্রত হয়, একটি নতুন চিন্তা ও শক্তির উদ্ভব হয়। যেভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অভ্যুত্থান হয়, সেভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সেই অভ্যুত্থানের চেতনাকে সুদৃঢ় করতে কাজ করতে হয়। অভ্যুত্থানের চেতনা যদি প্রতিষ্ঠিত করা না যায়, তবে সেটা শুধু একটি আন্দোলনের গল্প হয়ে যায়। একটি সফল অভ্যুত্থান যেমন জাতির মধ্যে শক্তির জোগান দেয়, তেমনি পরে সেই চেতনা প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে তা জাতির মধ্যে হতাশা তৈরি করে। যারা শহীদ হয়েছে, তাদের মধ্যে নানা বিশ^াস, পেশা, শ্রেণি, আদর্শ এমনকি নানা ধর্মের লোক আছে। তারা কেউ বলেনি ভিন্ন আদর্শের মানুষ আন্দোলনে আছে, আমি এই আন্দোলনে শহীদ হব না। শহীদরা দেশের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশকে ভালোবেসে জীবন উৎসর্গ করেছে। আমরা যারা জীবিত আছি, তাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত তাদের চেতনাকে ধারণ করে ঐক্যবদ্ধ হওয়া।

বাংলাদেশ একটি ভিন্ন বৈচিত্র্যের দেশ। বাংলাদেশ বিশে^র একমাত্র মুসলিম দেশ, যার সঙ্গে অন্য কোনো মুসলিম দেশের সীমান্ত নেই। এখানে নানা সময় নানা সুফি-সাধক, নবাব, রাজা, সেনাপতি এসে দেশ শাসন করেছেন। ফলে আমাদের সাংস্কৃতিক অভিযোজন হয়েছে নানাভাবে। এই দেশের জাতীয় চেতনা একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা রাজনৈতিক চেতনার আদলে তৈরি করা যাবে না। এই দেশে বাউল, সুফি যেমন ছিলেন, দেওবন্দি আলেমরা ছিলেন। এ দেশের মানুষ ধর্মকে যেমন ভালোবাসেন, তেমনি বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক চেতনাকেও আগলে রাখেন। কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় কবি। ঠিক তেমনি নজরুলের মতোই একটি দেশ বাংলাদেশ। যেখানে নবীজি (সা.)-এর শানে যেমন গজল গাওয়া হয়, ঠিক তেমনি শ্যামাসংগীত গায়। তরুণরা চুটিয়ে প্রেম করে বলে, ‘আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন’ আবার সে তরুণরা রাজপথে দাঁড়িয়ে বলে, ‘বল বীর বল উন্নত মম শির’; হাসিমুখে জেল বরণ করে বলে, ‘কারার ঐ লোহ কপাট ভেঙে ফের কর লে লোপাট’। এই দেশের সাংস্কৃতিক ও সভ্যতার বোঝাপড়া শত শত বছর অতিক্রম করে একটি মিশ্র চিন্তা ও চেতনা তৈরি করেছে। পূর্ব বাংলার মানুষ পাকিস্তান আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকই লাহোর প্রস্তাব পেশ করেন। কিন্তু তার মাত্র ২৪ বছর পরই মানুষ বুঝতে পেরেছে যে পাকিস্তান পেয়েছি, তা স্বাধীন দেশ নয় বরং এলিট পাঞ্জাবির একটি করপোরেট কোম্পানি। ফলে মানুষ পাকিস্তান তাড়িয়েছে। স্বাধীনভাবে মাথা উঁচু করে সিনা টানটান করে বাঁচার চেতনা বাংলাদেশের মানুষের চেতনায় মিশে আছে। ফলে এরশাদ বা হাসিনা কেউ এখানে টিকতে পারেননি।

জুলাই অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক আদর্শের কথা বললে, দেশে কোনো বামপন্থি বিপ্লব হয়নি, ডানপন্থি বিপ্লবও হয়নি। মূলত একটি মধ্যপন্থি চেতনা-তাড়িত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করেছে। বাংলাদেশে সব সময় একটি সুপ্ত রাজনৈতিক সচেতন মহল থাকে, যারা যুগে যুগে রাজপথে নেমে এসেছে, মূলত এই নাগরিক অংশের অংশগ্রহণ আন্দোলনের তীব্রতা দিয়েছিল। কেন ও কীভাবে এই গণ-আন্দোলন : আমরা দীর্ঘদিন ধরে ধর্ম ও সংস্কৃতির এক বিভেদের মধ্যে ছিলাম। আমরা এক চাপিয়ে দেওয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্তের মধ্যে ছিলাম। রাজনৈতিক ইস্যু বলে সবকিছু এড়িয়ে গিয়ে মধ্যবিত্ত আরবান, সেক্যুলার, স্বার্থবাদী ও ভোগবাদী চিন্তা আমাদের পেয়ে বসেছিল। এই আন্দোলন সেই চিন্তাকে খারিজ করেছে। রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে মানুষ প্রমাণ করেছে, তারা একে অন্যের জন্য মরতে পারে, দেশের জন্য বুলেটকে ব্যর্থ করে দিতে পারে। যেহেতু জনতার গণ-অভ্যুত্থান, নানা পথ ও মতের লোক এখানে মিলেছিল, ফলে একটা নির্দিষ্ট আদর্শিক ফ্রেমে এই আন্দোলনকে বন্দি করা যাবে না। এখানে বে-ইনসাফের বিরুদ্ধে সর্বদলীয় ঐক্য হয়েছে।

যে চেতনা ধারণ করতে হবে : অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতায় আমরা যেন বিভক্ত হয়ে গেছি, হয়ে উঠেছি বিদ্বেষী। নিজের আদর্শের ভিন্ন কেউ কোনো পদে পদায়ন হলেই আমরা বিদ্বেষপূর্ণ কথা ছড়িয়ে দিচ্ছি। আমরা বিবেকহীনও হয়ে উঠেছি। আমরা প্রতিমা ভাঙতে যাচ্ছি, মাজার ভাঙতে যাচ্ছি, গণপিটুনির মতো পৈশাচিক কাজে জড়িয়ে পড়ছি। এসব ভুল পদক্ষেপের ফলে আমাদের সব অর্জন বৃথা যেতে পারে। এই পরিস্থিতিতে আন্দোলনকারী বন্ধু, ফ্যাসিস্ট-তাড়ানো মিছিলের সহযোদ্ধাদের মনে রাখতে হবে অভ্যুত্থান শেষ হয়নি। আমাদের মতাদর্শিক বিরোধ থাকবে, রাজনৈতিক বাহাস থাকবে কিন্তু শহীদের রক্তে ভেজা যে মাটির বুকে একটি লাল সবুজ দেশ গড়ে উঠেছে, তার স্বার্থে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। দেশে একটা প্রজন্মের রূপান্তর হয়েছে, সেটা বুঝতে হবে। সেই রূপান্তরিত সময়ে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরির পথে সবাইকে এক কাতারে আসতে হবে। সেখানে গণ-অভ্যুত্থানের ছাত্রশক্তি, বিএনপিসহ রাজনৈতিক শক্তি, নাগরিক সমাজ ও অন্তর্বর্তী সরকার সবারই দায় ও দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের ভাঙতে হবে সিন্ডিকেট, অনিয়ম ও দুর্নীতি, কিন্তু ভাঙতে শুরু হয়েছে সম্প্রীতি ও বিশ^াস। এটা আমাদের জন্য অশনিসংকেত। দুই মাস আগেও মনে হচ্ছিল দেশে আওয়ামী লীগ ছাড়া সবপক্ষের মধ্যে দৃঢ় ঐক্য হয়েছে। আজ মনে হচ্ছে আমরা একে অন্যকে প্রতিপক্ষ বানানোর ইচ্ছাকৃত চেষ্টায় আছি। সরকার গঠনের পরপরই অভ্যুত্থানের অংশীদাররা (সব রাজনৈতিক পক্ষ) যেভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ছে, তাতে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের নানা সুযোগ তৈরি হবে।

আমাদের অনুধাবন করা উচিত, আমরা কতটুকু রক্তের পথ পেরিয়ে, জালিমের শেকল ভেঙে এখানে এসে দাঁড়িয়েছি। সেই শেকল যেন আর দাঁড়াতে না পারে, তার জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া উপায় নেই। দৈনিক কালবেলায় প্রকাশিত এক সংবাদে এক আহত কিশোর বলছে, ‘গুলি লেগেছে আফসোস নেই, দেশ তো স্বাধীন হয়েছে।’ সেই কিশোর যদি সত্যিকারের স্বাধীনতার স্বাদ না পায়, তবে তার সমস্ত আফসোস ও ক্ষোভ এসে পড়বে আমাদের ওপর। আমরা যেন তাদের হতাশ না করি।

লেখক: কলামিস্ট ও গবেষক

shahahdatju44@gmail.com