দুই বছরের জন্য নির্বাচিত কমিটি কোনো নির্বাচন, জবাবদিহিতা, সাধারণসভা, অডিট ছাড়াই ১৮ বছর ধরে ক্ষমতা আঁকড়ে আছে মেহেরপুর জেলা বাস মালিক সমিতি। তারা দুই বছরের জন্য ক্ষমতা পেলেও গত ১৬ বছর ধরে আর কোনো নির্বাচন দেননি। কারণ এই সংগঠনটির সভাপতি হলেন জেলা আওয়ামী লীগের শিল্প বিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক জনপ্রশাসন মন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের চাচা জহুরুল ইসলাম এবং সাধারণ সম্পাদক হলেন সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান গোলাম রসুল।
মেহেরপুর বাস মালিক সমিতির সাবেক কোষাধক্ষ্য মিন্টু হোসেন জানান, নতুন বাস রুটে সংযুক্ত হলে কিংবা রুট পারমিট ফি ও সদস্য ফি বাবদ মালিক সমিতিকে দিতে হয় ৫ লাখ টাকা। এছাড়া বিভিন্ন রুটের বাসের প্রতি টিকিট থেকে আয় হয় প্রায় ১৫-২০ হাজার টাকা। আবার বিভিন্ন চেকপোস্ট বসিয়ে বাস বিলম্বে পৌঁছানোসহ অবৈধ যানবাহন থেকে জরিমানা বাবদ প্রতিদিন আয় হয় প্রায় ১০ হাজার টাকা। এর বাইরেও আয় আছে মালিক সমিতির। সবমিলিয়ে ১৮ বছরে প্রায় ২০ কোটি টাকা আয় করেছে এই সমিতি। কিন্তু এত বড় সংগঠনের আয় ব্যায়ের কোনো অডিট হয়নি এতদিন। ইচ্ছেমতো বিল ভাউচার দেখিয়ে ব্যায় সমন্বয় করার পরও ৩-৪ কোটি টাকার কোনো হিসেব দেখাতে পারেননি তারা।
সমিতির সাধারণ সদস্যদের অভিযোগ দুই বছরের জন্য নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতার দাপটে ১৮ বছর জোরপূর্বক ক্ষমতা ধরে রেখেছেন তারা। কমিটির বিরুদ্ধে একাধিকবার শ্রম অধিদপ্তরে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির লিখিত অভিযোগ করেছেন তারা। শ্রম আধিদপ্তরের খুলনা রেজিস্ট্রার অব ট্রেড ইউনিয়ন একাধিকবার সমিতির নির্বাহী কমিটিকে অভিযোগগুলো সমাধানের জন্য পত্র দিলেও কোনো গুরুত্ব দেননি কমিটি। এভাবেই ১৮ বছর কোনো নির্বাচন ও হিসাব নিকাশ দেয়নি কমিটির সভাপতি জহিরুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রসুল।
সমিতির সাধারণ সদস্যরা জানান, ২০০৫ সালে মেহেরপুর আন্তঃজেলা বাস মিনিবাস সমিতির ১১ সদস্যর কার্যনির্বাহী পরিষদের দ্বিবার্ষিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে ওই কমিটি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ক্ষমতা ধরে রেখেছে। নির্বাহী কমিটির কয়েকজন সদস্য মারা গিয়েছে। আবার কেউ কেউ পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। সেই সকল শূন্য পদে সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাহী কমিটি বা সাধারণ সভার সিদ্ধান্ত ছাড়াই নিজেদের পছন্দের লোককে কমিটিতে যুক্ত করেছেন।
সমিতির ৩-৪ কোটি টাকার আয়-ব্যায়ের কোনো হিসেব নেই। দাখিল করা হয়নি বার্ষিক আয়কর রিটার্ন। ১৮ বছরে একটিও সাধারণ সভা হয়নি। এছাড়াও মেহেরপুর বাস টার্মিনাল প্রতি বছর সমিতি ইজারা নেয় কিন্তু কত টাকায় ইজারা নেয় তা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছাড়া কাউকে জানানো হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, এই বাস টর্মিনাল সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম রসুলের ভাতিজা মাহফুজুর রহমান নিয়ন্ত্রণ করেন।
মেহেরপুর বাস মিনিবাস সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন বলেন, ১৮ বছর ধরে আমরা বারবার নির্বাচনের কথা বলে আসছি। কিন্তু বর্তমান নির্বাহী কানে নিচ্ছে না। বিষয়টি আমরা লিখিতভাবে খুলনা বিভাগীয় শ্রম অধিদপ্তর কার্যালয়ে জানিয়েছি। শ্রম আধিদপ্তর নির্বাচন ও বার্ষিক হিসেব চেয়ে চিঠি দিলেও রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাবে সে চিঠির গুরুত্ব দেইনি। ১৮ বছর আয় ব্যয়ের কোনো হিসাব পাইনি। হিসাব চাইলেই আমাদের বিভিন্ন হুমকির মুখে পড়তে হয়।
বর্তমান কোষাধক্ষ্য রেজানুর রহমান খোকন বলেন, আমি নির্বাচিত কোষাধক্ষ্য নই। সভাপতি, সম্পাদক আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে। তাদের হুকুম শুনি। মাস শেষে বেতন পাই। আয় ব্যায়ের বিষয়ে আমার কিছুই জানা নেই। কোনো খাতাপত্রের দায়িত্ব আমার কাছে নেই।
এই বিষয়ে জানতে মেহেরপুর আন্তঃজেলা বাস ও মিনিবাস সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে একাধিকবার ফোন দিলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। তবে সমিতির সহ-সভাপতি মোজাম্মেল হক বলেন, রাজনৈতিক কারণে ১৬ বছর নির্বাচন হয়নি। নির্বাচন আসলেই সদস্যরা সভাপতি সম্পাদককে তাদের মতো করে কমিটি সাজিয়ে নিতে বলতো। তবে নির্বাচনের বিষয়ে গত ২১ আগস্ট একটি সভা হয়েছে। বিষয়টি শ্রম অধিদপ্তরকে চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে। তারা চিঠির জবাব দিলে আমরা নির্বাচনের প্রস্তুতি নেব। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে পারব না।
শ্রম অধিদপ্তরের খুলনা রেজিস্ট্রার অব ট্রেড ইউনিয়নের পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, আমরা একাধিকবার চিঠি দিয়েছি। এই কমিটি চিঠির কোনো কর্ণপাত করেনি। আমাদের ক্ষমতা চিঠি দেওয়া পর্যন্ত। তবে মালিক সমিতির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সাধারণ সদস্যরা ইচ্ছা করলে এই কমিটির বিরুদ্ধে অনাস্থা আনতে পারেন। অনাস্থা আনলে তখন আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারব।