১৪ বছর পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ফিরছে গোয়ালিয়রে। এই নিয়ে যে আনন্দ উচ্ছ্বাস থাকার কথা, হিন্দু মহাসভার বন্ধ ডাকা ও বিক্ষোভ কর্মসূচির কারণে সেটা অনেকটাই মিইয়ে গেছে। নিরাপত্তার কড়াকড়ি, যানবাহন চলাচলে বিধিনিষেধের মানেই তো দর্শকদের ভোগান্তি। তার ওপর আবার সেদিন নবরাত্রির উদযাপন। টিকিট তো সব বিক্রি হয়ে গেছে, এত ভোগান্তি সয়ে উৎসবের রাতে যারা ক্রিকেট দেখতে আসবেন, তাদের পয়সা উসুল কতটা হবে?
বাংলাদেশ সবশেষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বা তার আগে যুক্তরাষ্ট্র এবং দেশে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজে যেমনটা খেলেছে, তাতে যে দর্শকদের মন ভরবে না সেটা স্পষ্ট। এখানকার দর্শকরা আইপিএলের টান টান রোমাঞ্চ দেখে অভ্যস্ত, চার ছক্কার বন্যায় বড় রান দেখে অভ্যস্ত। সেখানে বাংলাদেশের নিম্ন মধ্যবিত্ত ব্যাটিং যে তাদের মন ভরাবে না, সেটা জানা কথা। যদি রোমাঞ্চই না থাকে, তাহলে টি-টোয়েন্টি হয়ে যাবে ভেজিটেবল বিরিয়ানি।
ব্যাপারটা অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত জানেন বলেই আগের দিন বলেছেন, ‘এ সিরিজ থেকে আপনি দেখতে পারবেন আমাদের খেলোয়াড়দের মধ্যে অন্য এক অ্যাপ্রোচ খেলছে। সবাই জেতার জন্যই খেলবে।’
যদিও বিশ্বের কোনো খেলাতেই কোনো অধিনায়ক বলেন না যে হারার জন্য সবাই খেলবে, তবুও শান্তর কথায় আশাবাদী হওয়া যায় না। কারণ বিশ্বকাপের পর নতুন যাত্রায় সৌম্য সরকারের অনুপস্থিতি ছাড়া দলে বড় কোনো পরিবর্তন নেই। মাহমুদউল্লাহ এখনো আছেন, ইনিংসের সূচনায় সেই তামজিদ তামিম ছাড়া বিকল্পও নেই। নির্বাচকরা এখনো অভিজ্ঞতার গল্প শুনিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে ভারত মাঠে নামিয়েছে প্রায় আনকোরাদের নিয়ে গড়া দল। টি-টোয়েন্টি অভিষেকে শূন্য রানে আউট হওয়া অভিষেক শর্মা দ্বিতীয় ম্যাচেই করেছেন সেঞ্চুরি।
বাংলাদেশের তামিম ইকবাল ২০১৬ সালে টি-টোয়েন্টিতে সেঞ্চুরি করার পর ৮ বছর কেটে গেছে, এর মধ্যে আরব আমিরাত, নামিবিয়া, স্কটল্যান্ড এমন কত দলের বিপক্ষেই তো খেলেছে বাংলাদেশ। কেউই পারেননি সেঞ্চুরি করতে। পার্থক্যটা অভিজ্ঞতায় নয়, মানসিকতায়। অভিষেক সানরাইজার্স হায়দরাবাদে ট্র্যাভিস হেড, হেইনরিখ ক্লাসেনদের কাছ থেকে দেখে হয়ে উঠেছেন বিধ্বংসী ব্যাটসম্যান। যেটা দীর্ঘদিন বিপিএলে খেলে, ক্রিস গেইল থেকে শুরু করে অনেকের সঙ্গেই ড্রেসিংরুম শেয়ার করেও শেখা হয়নি বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের। গড়ে ওঠেনি টি-টোয়েন্টি উপযোগী ব্যাটিং দক্ষতা ও সামর্থ্য। সবকিছুই আটকে আছে মিরপুরের মানদন্ডে!
এই জায়গাটাতেই আশা দেখছে বাংলাদেশ। গোয়ালিয়রের উইকেট সম্পর্কে স্থানীয় ক্রিকেট প্রশাসক (সচিব, মধ্যপ্রদেশ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন) ও সাবেক রঞ্জি ক্রিকেটার সঞ্জীভ রাও বলেছিলেন যে এখানে প্রচুর রান হবে, যেমনটা হয়েছে মধ্যপ্রদেশ প্রিমিয়ার লিগে।
সংবাদ সম্মেলনে এসে তাওহীদ হৃদয় বলেছেন উলটো, ‘আমরা এখানে দুই দিন অনুশীলন করলাম। উইকেট কিছুটা মন্থর ও নিচু বাউন্সের। আমরা মাঠকর্মীদের কাছ থেকে তথ্য নিচ্ছি। ঘরোয়া ক্রিকেটের কিছু ম্যাচও হয়েছে এখানে। মনে হচ্ছে উইকেটটা মন্থরই হবে। আমরা আমাদের মতো খেলার চেষ্টা করব।’
তার কাছে মনে হয়েছে, ‘এখানে ঘরোয়া ক্রিকেট আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের উইকেটে তারতম্য আছে, টি-টোয়েন্টি তো রানের খেলা। অবশ্যই সবাই রান চায়। এখানে আন্তর্জাতিক ম্যাচ এখনো হয়নি। ঘরোয়া ক্রিকেটের খেলা এবং আন্তর্জাতিক ম্যাচ আলাদা ব্যাপার। আমি মনে করি, এখানে খেলাটা শুরু হলে বুঝতে পারব। উইকেটটা কেমন হয় (বুঝতে পারব)। অনুশীলনে উইকেট দেখে বুঝেছি, এখানে উইকেট মন্থর ও নিচু বাউন্সের। এ রকম উইকেটে বড় রানের ম্যাচ খুব কমই হয়। আইপিএলের খেলাও এখানে হয়নি। দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত কী হয়।’
ঢাকায় কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা হলেও মধ্যপ্রদেশের আবহাওয়া উষ্ণ এবং শুষ্ক। হৃদয়ের কাছে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল গরমের ভোগান্তি নিয়ে, তার কাছে এই আবহাওয়া মনে হয়েছে মিরপুরের মতোই, ‘আমরা এখানে আসার আগে বেশিরভাগ ক্রিকেটারই দেশে অনুশীলন করেছি। আমি মনে করি আমরা সিরিজের জন্য খুবই ভালো প্রস্তুতি নিয়েছি। আশা করছি আমরা ভালো করব। এখানকার গরম আমাদের জন্য তেমন দুশ্চিন্তার বিষয় নয়। আমরা এই গরমে খেলে অভ্যস্ত। বাংলাদেশেও একই আবহাওয়া।’
হৃদয়রা অবশ্য ঢাকা ছেড়েছেন তাপপ্রবাহের মধ্যেই, তাই পার্থক্যটা ধরতে পারছেন না। আবহাওয়া এবং উইকেট মিরপুরের মতো, এটাই হয়তো গড়ে দিতে পারে ব্যবধান। কারণ মিরপুরে তো বাংলাদেশ আটকে দিয়েছে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের মতো দলকেও!
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তাওহীদ হৃদয়ের ব্যাটিং পজিশনে বেশ অদল-বদল হয়েছে। সাকিব আল হাসানের অনুপস্থিতি কি তাকে পদোন্নতি দেবে, এমন প্রসঙ্গে হৃদয়ের জবাব, ‘আমি অনেক পজিশনে ব্যাটিং করেছি ঠিক আছে, কিন্তু এটা তো দলের পরিকল্পনা ছিল। টিম যেভাবে চেয়েছে, সেভাবে দলকে দেওয়ার জন্য চেষ্টা করেছি। যদি এ রকম পরিকল্পনা থাকে, আমি একটা জায়গায় থিতু হব বা দল যদি আমাকে চায় তাহলে হবে।’
তারকাদ্যুতি কম হলেও মারকুটে ভাব কম নেই ভারতের টি-টোয়েন্টি দলে। অভিষেক শর্মা, সঞ্জু স্যামসন, শিভাম দুবে থেকে শুরু করে সূর্যকুমার এবং হার্দিক পান্ডিয়ারা মোটেও কম নন কোহলি-রোহিতদের চেয়ে। বরং নিজেদের প্রমাণের তাগিদটা বেশি। অন্যদিকে আর্শদীপের সুইং, মায়াঙ্ক যাদবের পেস, রবি বিষ্ণোইয়ের লেগ স্পিন, পাওয়ার প্লে-তে ওয়াশিংটন সুন্দরের ক্যারম বল, সবদিকেই ফাঁদ পাতা। এই চক্রব্যূহ ভেদ করতে হলে দলের সবাইকে ভালো খেলতে হবে, কাউকে কাউকে খুব ভালো খেলতে হবে। অধিনায়কের কথায় বিশ্বাস করে সবাই যদি জেতার জন্যই খেলে, তাহলে হয়তো গোয়ালিয়র দুর্গ জয় করাও সম্ভব। আর তা না হলে মুখে নতুন বাংলাদেশ বললেও বাস্তবে মাঠে দেখা যাবে সেই পুরনো বাংলাদেশকেই, যাদের আইসিসির সহযোগী দেশগুলোও হারিয়ে দেয় সহজে।