নতুন জার্সি, নতুন স্টেডিয়াম; কিন্তু সেই পুরনো বাংলাদেশ। সেই পুরনো আত্মাহুতির পালা। ১৪ বছর পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ফিরেছে গোয়ালিয়রে। দূরদূরান্ত থেকে ক্রিকেটভক্তরা কোহলি রোহিতদের নাম লেখা জার্সি চাপিয়ে মাধব রাও সিন্ধিয়া স্টেডিয়ামে এসেছেন। পথে পুলিশের ব্যারিকেড, তল্লাশি কত কিছুই সইতে হয়েছে। কিন্তু এসে যে ম্যাচটা তাদের দেখতে হলো, সেটা টি-টোয়েন্টির নামে অত্যাচার। দর্শকদের সঙ্গে প্রতারণা।
সিরিজ শুরুর সংবাদ সম্মেলনে নাজমুল হোসেন শান্ত বলেছিলেন, ‘এ সিরিজ থেকে আপনি দেখতে পারবেন আমাদের খেলোয়াড়দের মধ্যে অন্য এক অ্যাপ্রোচ খেলছে। সবাই জেতার জন্যই খেলবে।’ ইনিংসের গোড়াপত্তনে একটা নাম আর জার্সির নকশা ছাড়া আর কোনো নতুনত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। লিটন দাস আগের মতোই দায়িত্বজ্ঞানহীন, ১২০ বলের খেলায় ৫২টাই ডট বল, না আছে বাউন্ডারি মারার সামর্থ্য, না আছে স্ট্রাইক-পরিবর্তন করার সক্ষমতা। ফল আরও একটি কুৎসিত ব্যাটিং প্রদর্শনী। আফগানিস্তানের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচের পর একাদশে দুই একটা ব্যক্তির নাম বাদে কিছুই বদলায়নি বাংলাদেশের।
গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়া সাম্রাজ্যের শেষ রাজার ছেলে, বিসিসিআইএর সাবেক প্রেসিডেন্ট মাধব রাও সিন্ধিয়ার নামে স্টেডিয়ামে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। দুপুর থেকেই শহরের ব্যস্ত চৌরাস্তায় ভাসমান জার্সি বিক্রেতাদের ঘোরাঘুরি। শহরের খানিকটা দূরের এই স্টেডিয়ামে আসতে স্কুটারে বাইকে তিনজন করে চেপে জার্সি গায়ে চাপিয়ে আসছেন ভক্তরা, মিডিয়া বাসের জানালা দিয়ে এই দৃশ্য দেখতে দেখতেই মাঠে আসা। পার্কিং এলাকা যেন টু-হুইলারের বিশাল এক সমুদ্র! ৩০ হাজার দর্শকের এই স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে আসা ৯৯ শতাংশ সমর্থকই ভারতীয়। তাদের হতাশ করে সূর্যকুমার যাদব টস জিতে নিয়েছেন বোলিং। তাতেই ম্যাচের উত্তেজনা কমে গেছে অর্ধেক। বাংলাদেশের ইনিংসের পাওয়ার-প্লে শেষ হতে না হতেই টি-টোয়েন্টি ম্যাচ হয়ে গেল সূরজ বরজাতিয়ার পারিবারিক সিনেমা, যেখানে কোনো ক্লাইম্যাক্স নেই।
এক বছর আগে, ভারতেই হয়ে যাওয়া ওয়ানডে বিশ্বকাপে ইনিংসের সূচনায় নামা লিটনের শট বাছাই নিয়ে এন্তার লেখালেখি হয়েছে। লিটন বদলাননি অথবা বদলাতে চান না। আর্শদীপের অফস্টাম্পের বলকে লংঅন দিয়ে উড়িয়ে মারতে গিয়ে তুলে দিলেন আকাশে। সহজ ক্যাচ রিঙ্কু সিংয়ের। তানজিদ তামিমকে বসিয়ে পারভেজ হোসেন ইমনকে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল একাদশে, লেগসাইডে একটা ছয় মারাটাই তার প্রাপ্তি। ইনসাইড এজে বোল্ড হয়েছেন আর্শদীপের বলেই। লেগস্পিনের বিপক্ষে বাংলাদেশের দুর্বলতাটা কোনো প্রতিপক্ষেরই অজানা নেই। বরুণ চক্রবর্তী এসে তুলে নিলেন ৩ উইকেট। ওদিকে মায়াঙ্ক যাদবের অভিষেক হলো মেডেন ওভার দিয়ে। তার টানা ৬ বলে কোনো রান নিতে পারলেন না তাওহীদ হৃদয়। এরপর আবার স্ট্রাইকে এসে একটা বলে রান করতে না পারার পর চাপের মুখেই উড়িয়ে খেললেন লংঅনে, সোজা ফিল্ডারের হাতে।
একটা নতুন দৃশ্য অবশ্য দেখা গেছে। সাধারণত দল বিপর্যয়ের মুখে পড়লে মাহমুদউল্লাহ এসে হাল ধরে একটা সম্মানজনক সংগ্রহ গড়ার চেষ্টায় লিপ্ত হন। কাল মাহমুদউল্লাহও মুখোমুখি হওয়া দ্বিতীয় বলেই উড়িয়ে মারতে গিয়ে আউট হলেন, ২ বলে ১ রান করে। সাকিব আল হাসানের বিকল্প হিসেবে মেহেদী হাসান মিরাজকে দেখছেন প্রধান নির্বাচক ও অধিনায়ক। মিরাজ ৩ বাউন্ডারিতে ৩২ বলে অপরাজিত ৩৫ রান করে তাদের মুখরক্ষা করেছেন। শান্ত, রিশাদ ও তাসকিনের সঙ্গে তার তিনটা ছোট ছোট জুটিতেই দলীয় একশ রান পার করেছে বাংলাদেশ।
২০ ওভারের ইনিংসে মাত্র ৯টা চার আর ৪ খানা ছক্কা, সঙ্গে ১২০ বলের ভেতর ৫২ খানা অর্থাৎ প্রায় অর্ধেকই ডট বল। এই রকম একটা ইনিংস দেখার জন্য নিশ্চয়ই টি-টোয়েন্টি ম্যাচ দেখতে মাঠে আসেন না দর্শকরা। অন্যদিকে নতুন একটা স্টেডিয়ামের প্রথম ইনিংসটা এমন ম্যাড়মেড়ে হলো যে তাতে পরের ম্যাচ পেতে না আবার ১৪ বছর অপেক্ষায় থাকতে হয়।
উৎসবের মঞ্চকে বিরক্তি উৎপাদন কারখানা বানিয়ে ফেলার দায়টা সম্পূর্ণভাবে সূর্যকুমার যাদবের। টস জিতে ব্যাটিং নিলেই পারতেন ভারত অধিনায়ক। তাতে দর্শকরা কিছু চার-ছয় বেশি দেখার সুযোগ পেতেন। টি-টোয়েন্টি দেখতে এসে ঘুমপাড়ানি ব্যাটিং দেখতে হতো না।
‘সৌদামিনী মালো’ ছোটগল্পে স্বদেশি বাবুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে শওকত ওসমান লিখেছিলেন, ‘এককথায় স্বদেশি বাবুর শুভ্রতা তার টুপির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রইল।’ এই বিখ্যাত লেখকের অনুকরণে বলা যায়, বাংলাদেশ দলের নতুনত্ব কেবল জার্সিতেই সীমাবদ্ধ থাকল, মাঠের খেলায় সেই পুরনো বাংলাদেশই।