ইব্রো নদীর উপত্যকার পাহাড়গুলো ছিল বেশ সরু ও সফেদ বর্ণের। এই পাশটায় না ছিল গাছ, না ছিল ছায়া। আর রেলস্টেশনের অবস্থান ছিল এর ঠিক মাঝ বরাবর। স্টেশনের পাশ ঘেঁষে ঠিক বিপরীত দিকে একটি বাড়ির ছায়া ও পর্দা চোখে পড়ে, পর্দাটি বাঁশের ছোট্ট ছোট্ট গুটিকা দিয়ে বানানো, যেটি কি না পানশালার সদর দরজায় টানানো যেন ভেতরে কোনো মাছি প্রবেশ করতে না পারে। একজন আমেরিকান এবং একজন মেয়ে বাড়িটির ছত্রছায়ায় বাইরের দিকের একটি টেবিলে বসল। দিনটি ছিল প্রচ- খর এবং বার্সেলোনা থেকে ট্রেনটির এখানে আসতে মিনিট চল্লিশ লাগবে। এই জংশনে দুই মিনিট থেমে মাদ্রিদের উদ্দেশে যাত্রা করবে।
মেয়েটি মাথা থেকে টুপিটি খুলে টেবিলে রাখে এবং জিজ্ঞেস করে, ‘আমাদের আজ কোনটা খাওয়া উচিত?’
লোকটি বলে, ‘আজ অনেক গরম’
‘চলো বিয়ার খাই’
লোকটি উঠে পর্দার সামনে গিয়ে বলে এলো ‘দস সেরভেজাস’
দরজার সামনে থেকে এক মহিলা বললেন ‘বড়টা দেব? ’
‘হ্যাঁ দুইটা বড় দেবেন’
মহিলাটি দুই গ্লাস বিয়ার নিয়ে এলেন। এগুলো টেবিলে রেখে তিনি দুজনের দিকে তাকালেন। মেয়েটি পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। তারা দুজন যেন রোদে ঝলসে সফেদ বর্ণ ধারণ করেছিল আর প্রকৃতি বাদামি ও শুষ্ক বর্ণ বরণ করেছে।
মেয়েটি বলে, ‘পাহাড়গুলো সফেদ হাতির মতন দেখাচ্ছে’
লোকটি বিয়ার খেতে খেতে বললেন, ‘আমি তো কখনো দেখলাম না’
‘না, তুমি দেখবেও না’
লোকটি বলে, ‘আমি তো দেখতেও পারি। তুমি যে বললে আমি দেখতেও পাবো না এই কথাটা কিছু প্রমাণও করে না।’
মেয়েটি বাঁশের গুটিকা দিয়ে করা পর্দাটির দিকে তাকাল। এরপর বলল, ‘ওরা পর্দায় কিছু এঁকে রেখেছে। এটার মানে কী?’
‘আনিস দেল টরো, এটা একটা মদ’
‘আমরা কি এটা খেতে পারি?’
লোকটি পর্দা দিয়ে ডাকলেন, ‘শুনছেন?’ একজন মহিলা পানশালা থেকে বের হয়ে এলেন।
‘চার রিয়েল’
‘আমাদের দুটো আনিস ডেল টরো দিন’
‘সাথে পানি দেব?’
‘তুমি কি এটা পানির সাথে খেতে চাও?’
মেয়েটি বলল, ‘আমি জানি না। পানির সঙ্গে খেতে কি ভালো হবে?
ঠিকঠাক লাগবে।’
মহিলাটি জিজ্ঞেস করল, ‘আপনাকে কি পানি মিশিয়ে দেব?’
‘এটা খেতে যদি মধুর মতন’, মেয়েটি এ কথা বলে গ্লাসটি নামিয়ে রাখে।
‘সবকিছুর সাথে এভাবেই খেতে হবে।’
মেয়েটি বলে, ‘হ্যাঁ, সবকিছুর স্বাদ যদি মধুর মতন হয় যখন তুমি সেসব জিনিসের জন্য অধীর আগ্রহে থাকো, যেমন ‘এব সিন্থে মদের মতন।’
‘আহা, বাদ দাও তো।’
মেয়েটি বলে, ‘তুমি শুরু করেছ। আমি চুপ হয়ে গিয়েছিলাম। আমি তো ভালোই সময় কাটাচ্ছিলাম।’
‘ঠিক আছে, চলো চেষ্টা করি আর দারুণ সময় কাটাই।’
‘ঠিক আছে, আমি চেষ্টা করছিলাম। আমি বলেছিলাম যে পাহাড়গুলোকে সফেদ হাতির মতন লাগছে। এখন তারচেয়েও বেশি সফেদ লাগছে না কি।’
‘উজ্জ্ব¡ল লাগছে।’
‘আমি এই নতুন মদটি চাখতে চাই। আমরা সবাই তো তাই করি, তাই নয় কি?
সব দেখো এরপর নতুন মদ চাখো?’
‘আমার ও তাই মনে হয়।’
মেয়েটি পাহাড়ের চারপাশ দেখতে থাকে। সে বলে, ‘কী সুন্দর পাহাড়। ওরা আসলেই দেখতে সফেদ হাতির মতন নয় কি? মানে আমি বলতে চাইছি গাছের ভেতর দিয়ে ওদের গায়ের রঙের
কথা। আমরা কি আরেকটা প্যাগ খেতে পারি?’
‘ঠিক আছে।’
এক উষ্ণ নির্মল বাতাস বইয়ে যাচ্ছে তাদের টেবিলের পাশ দিয়ে।
লোকটি বললেন, ‘বিয়ারটা খুব ভালো।’
মেয়েটি বলল, ‘এটা দারুণ।’
লোকটি মেয়েটিকে বলল, ‘এটা সত্যি খুব সাধারণ অপারেশন, জিগ! এটাকে অপারেশন বললেও ভুল হবে।’
মেয়েটি টেবিলের নিচে তার পা রাখা অবলোকন করে।
‘আমি জানি তুমি কিছু মনে করবে না, জিগ। এটা আসলেই কিছু না। শুধু বাতাস ভেতরে প্রবেশ করবে এই তো।’
মেয়েটি কিছু বলে না।
‘আমি তোমার সাথে যাবো আর সারাক্ষণ থাকব কথা দিচ্ছি। ওরা শুধু ভেতরে বাতাস প্রবেশ করাবে। এরপর সব ঠিক হয়ে যাবে।’
‘এরপর আমরা কী করব?’
‘তারপর আবার সব আগের মতন হয়ে যাবে যেমনটা আমরা আগে ছিলাম।’
‘তোমার এটা ভাবার কারণ কী আসলে?’
‘কারণ এই জিনিসটা আমাদের উৎকণ্ঠিত করেছে। আর এটাই একমাত্র কারণ, যার জন্য আমি শান্তিতে নেই।’
মেয়েটি বাঁশের গুটিকা দিয়ে বানানো পর্দার দিকে তাকায়, তার এক হাত বাইরে রেখে আরেক হাতে পর্দার দুটি তারে দেয় টান।
‘তাহলে তুমি মনে করো যে এরপর আমরা ঠিকঠাক ও শান্তিতে থাকব?’
‘আমি জানি আমরা থাকব। তোমার উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। আমি এমন অনেককে জানি, যারা এই অপারেশন করেছে।’
মেয়েটি বলে, ‘যেমনটা আমি। আর এরপর ওরা সবাই খুশি হয়েছিল!’
লোকটি বলল, ‘ভালো, তুমি যদি করাতে না চাও দরকার নেই। আমি তোমাকে মোটেও জোর করব না। কিন্তু আমি জানি এটা একদম সহজ প্রক্রিয়া।’
‘আর তুমি সত্যি চাও?’
‘আমার মনে হয় এটা করলেই সবচেয়ে ভালো হবে। কিন্তু আমি চাই না তোমাকে জোর করতে।’
‘আর আমি যদি এটা করি তুমি খুশি হবে এবং সবকিছু আগের মতন হবে আর তুমি আমাকে ভালোবাসবে তাই তো?’
‘আমি এখনো তোমাকে ভালোবাসি। তুমি জানো যে আমি তোমায় ভালোবাসি।’
‘আমি জানি, কিন্তু আমি যদি এটা করি সব কি সুন্দর হবে, যদি আমি বলি সবকিছু সফেদ হাতির মতন সুন্দর কিন্তু অপ্রয়োজনীয় বস্তু ছাড়া কিছু নয়, যার ব্যয়ভারই বেশি, তবে তুমি পছন্দ করবে?’
‘আমি পছন্দ করব। আমি এখনও তোমায় ভালোবাসি কিন্তু আমি এ নিয়ে একদম ভাবতে চাচ্ছি না। তুমি তো জানো আমি উদ্বিগ্ন হলে কেমন করি।’
‘আমি যদি এটা করি তবে তুমি কখনো উদ্বিগ্ন হবে না?’
‘আমি একেবারে উদ্বিগ্ন হব না কারণ খুবই সহজ পদ্ধতি এটা।’
‘তাহলে আমি রাজি কেন না আমি আমার পরোয়া করি না।’
‘কিন্তু, আমি করি।’
‘ওহ, হ্যাঁ, কিন্তু আমি আমাকে নিয়ে ভাবি না আর আমি এটা করব এবং এরপর আশা করি সব ঠিক হয়ে যাবে।’
‘তুমি যদি এমন ভাবো তবে আমি চাই না তুমি তা করো।’
মেয়েটি উঠে দাঁড়াল এবং স্টেশনের শেষ মাথার দিকে হাঁটতে লাগল। ইব্রো উপত্যকার একপাশে শস্যের ক্ষেত ও সারি সারি গাছ। তারও দূরে নদীর ওপারে দেখা যায় পাহাড়। মেঘেরা ছুটে যাচ্ছে শস্যক্ষেতের ওপর দিয়ে আর মেয়েটি গাছের ভেতর দিয়ে দেখে নদী।
মেয়েটি বলে, ‘এসব আমাদের থাকতে পারত আর এসব আমাদের হতে পারত এবং আমরা প্রতিনিয়ত তা অসম্ভব করে তুলছি।’
‘কী বললে তুমি?’
‘আমি বললাম সবকিছু আমাদের হতে পারত।’
‘আমাদের সব থাকত।’
‘না, থাকত না।’
‘আমরা পুরো বিশ্ব পেতে পারি না’
‘না, পারি না।’
‘আমরা যেখানে খুশি যেতে পারি।’
‘না, পারি না। এটা আর আমাদের মধ্যে নেই।’
‘এটা আমাদের।’
‘না, আমাদের না। একবার ওরা নিয়ে নিলে তুমি আর তা ফেরত পাবে না।
কিন্তু ওরা এটা নেবে না’
‘আমরা অপেক্ষা করব ও দেখব।’
লোকটি বলল, ‘আহা, ছায়ায় আসো। তোমার এমন মনে করা উচিত নয়।’
মেয়েটি বলে, ‘এমন ভাবছি না। আমি শুধু বিষয়টি বুঝছি।’
‘আমি চাই না তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করো।’
মেয়েটি বলে, ‘না, এটা আমার জন্য ভালো নয়। আমরা কি আরেকটা বিয়ার খেতে পারি!’
‘আচ্ছা, কিন্তু তোমার বুঝতে হবে যে...’
মেয়েটি বলে, ‘আমি বুঝেছি। আমরা কথা বন্ধ করতে পারি না?’
দুজন টেবিলে বসল আর মেয়েটি বসে বসে পাহাড় দেখে। লোকটি মেয়েটিকে দেখে এরপর টেবিলে তাকায়। বলে, ‘তোমাকে বুঝতে হবে তো যে তুমি যদি না চাও আমিও চাই না। এটা যদি সত্যি তোমার কাছে অনেক কিছু হয় তবে আমি তাতেও রাজি।’
‘এটা তোমার কাছে কিছু না?’
‘অবশ্যই কিছু। কিন্তু আমি তোমাকে ছাড়া কাউকে চাই না। আমি আর কাউকে চাই না। আর আমি জানি এটা করতে খুব সহজ।’
‘হ্যাঁ, তুমি জানো যে এটা খুব সহজ পদ্ধতি।’
‘তোমার বলার যৌক্তিকতা আছে কিন্তু আমি জানি, আমি জেনেই বলছি।’
‘তুমি কি এখন আমার জন্য কিছু করতে পারো?’
‘আমি তোমার জন্য সব করতে পারি।’
‘তুমি কি দয়া করে কথা বন্ধ করতে পারো?’
লোকটি চুপ হয়ে গেল আর স্টেশনের দেয়াল ঘেঁষে ব্যাগগুলো দেখতে লাগল। যেগুলোর গায়ে হোটেলের ট্যাগ লাগানো যেখানে তারা রাত কাটিয়েছিল।
লোকটি বলল, ‘কিন্তু আমি চাই না তোমাকে...। আমি এসবের আর পরোয়া করি না।’
মেয়েটি বলে, ‘আমি এবার চিল্লাব!’
একজন মহিলা পর্দার ভেতর থেকে দুই গ্লাস বিয়ার নিয়ে আসে। তিনি বললেন, ‘আর মিনিট পাঁচেকের মধ্যে ট্রেনটি আসবে।’
মেয়েটি বলল, ‘তিনি কী বললেন?’
‘বললেন যে, আর পাঁচ মিনিটের ভেতর ট্রেনটি আসবে।’
মেয়েটি মহিলাটিকে কৃতজ্ঞতা জানাতে তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
লোকটি বলল, ‘আমি এক কাজ করি ব্যাগগুলো স্টেশনের অপর পাশে রেখে আসি।’
মেয়েটি তার দিকে মৌনতা সূচক হাসি দিল।
‘ঠিক আছে, এরপর চলে আসো আমরা বিয়ারটা শেষ করি।’
লোকটি দুটি ভারী ব্যাগ বহন করে রেলপথের অন্য লাইনে নিয়ে গেল। তিনি রেললাইনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন কিন্তু ট্রেন দেখা যাচ্ছিল না। ফিরে এসে তিনি পানশালার দিকে হাঁটছিলেন ও মানুষ দেখছিলেন। তারা সবাই ট্রেনের অপেক্ষায় অপেক্ষারত। লোকটি পর্দার ভেতর গেলেন। মেয়েটি টেবিলে বসেছিল আর তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিল।
লোকটি বললেন, ‘তুমি এখন ভালো বোধ করছ?’
মেয়েটি বলল, ‘আমার ভালো লাগছে। আমার কিছুই হয়নি। আমি ভালো বোধ করছি।’