পার্বত্য জেলাগুলোর পর্যটন ব্যবসা প্রায়ই থমকে যায়। কখনো হরতাল, কখনো পরিবহন ধর্মঘট, আবার কখনো আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে পর্যটক ভ্রমণে ঘোষিত-অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। কিন্তু এমন নিষেধাজ্ঞার কারণে ভয়ংকর অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখোমুখি হন ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে চলছে তিন পার্বত্য জেলায় পর্যটক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা। স্বাভাবিকভাবেই বর্তমানে পাহাড়ি-বাঙালিদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিক্রি তেমন নেই। ব্যবসায়ীদের প্রতিদিন লোকসান হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এ রকম পরিস্থিতিতে কেউ কেউ ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছেন। শারদীয় দুর্গাপূজা ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে ৪ দিনের ছুটি থাকলেও হোটেল-মোটেলে বুকিং নেই। যেসব বুকিং ছিল, তাও বাতিল হচ্ছে। রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসন থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এসএমএস বার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘অনিবার্য কারণবশত পর্যটকদের ৮ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায় ভ্রমণ থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করা হলো।’ এর আগে ৩ অক্টোবর রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের সাজেকে পর্যটকদের না যেতে পরামর্শ দিয়েছিল জেলা প্রশাসন।
চরম অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীন পরিবেশে পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধ সমাজ ও ভিক্ষু সংঘ আসন্ন পবিত্র ধর্মীয় উৎসব কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠান আয়োজনের বিষয়ে কোনো উৎসাহ বোধ না করায় সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠান না করার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ১৮ অক্টোবর থেকে ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত এই অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামে ১ মাস ধরে কঠিন চীবর দান উৎসব পালিত হয়।
সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা কেএনএফের তৎপরতার কারণে ২০২২ সালের ২০ অক্টোবর বান্দরবানের রুমা, থানচি ও রোয়াংছড়ির দুর্গম এলাকায় প্রথম পর্যটক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এরপর খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে দুই দফা সহিংসতার কারণে রাঙ্গামাটির সাজেক ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করেছিল প্রশাসন। খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার তদন্ত কার্যক্রম চলমান থাকার মধ্যেই গত ১ অক্টোবর ধর্ষণের অভিযোগে খাগড়াছড়ি সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এসবের জেরেই তিন পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে পর্যটনসংশ্লিষ্ট সব ধরনের ব্যবসাবাণিজ্য। ইতিমধ্যে ব্যাংক ঋণ নিয়ে গড়ে তোলা বেশ কয়েকটি আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে দিয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা। বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পাহাড়ি-বাঙালি সংঘাতের কারণে এমনিতেই পাহাড়ে পর্যটকদের আনাগোনা কম থাকে। ফলে লোকসান গুনতে হয় এই খাতের ব্যবসায়ীদের। দুর্গাপূজার ছুটিতে সেই লোকসান কিছুটা কাটিয়ে ওঠার প্রত্যাশা তাদের ছিল। তারা প্রশাসনের পর্যটক ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞায় হতাশ। বিশেষ করে রাঙ্গামাটির ব্যবসায়ীরা পড়েছেন অথৈ সাগরে। যত দ্রুত সম্ভব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন তারা। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটকদের ভ্রমণে বিরত থাকার যে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তা দ্রুত তুলে নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অন্তর্র্বর্তী সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা। ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে অবিলম্বে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে পর্যটকদের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ট্যুরিজম অ্যান্ড হোটেলস ওয়ার্কার্স এমপ্লয়িজ ফেডারেশন। তবে ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব রাঙ্গামাটির (টোয়ার) সভাপতি ও গরবা ট্যুরিজমের সিইও বাদশা ফয়সাল জানিয়েছেন দুশ্চিন্তার কথা। তিনি বলেছেন, ‘এই নিষেধাজ্ঞা শুধু একটা নির্দেশনা নয়, এটা দীর্ঘমেয়াদি একটা নেতিবাচক ফল বয়ে আনবে আমাদের জন্য। বাইরে থেকে সবাই ভাববে পাহাড় নিরাপদ নয়, সেখানে ঘুরতে যাওয়া নিরাপদ হবে না। সে ক্ষেত্রে প্রত্যাহারের পরও কতটুকু এটা রিকভার করতে পারব, আমরা বুঝতে পারছি না।’
হয়তো কর্তৃপক্ষ আইনশৃঙ্খলার অবনতির কোনো আভাস পেয়েছে। যে কারণে এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। যাদের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, তাদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও ভেবে দেখা দরকার। প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসুক পর্যটনে।