আগামী ২০২৫ সালে বিশ্ববাজারে ফার্নিচার খাতের বাজার হতে পারে ৬৫ হাজার ৪৬০ কোটি ডলারের। বর্তমানে দেশে আসবাবপত্র বা ফার্নিচার খাতের বাজার ২৫ হাজার কোটি টাকার। তবে কর কাঠামো পুনর্বিবেচনা, উদ্যোক্তাদের ঋণ সহায়তা, আলাদা ফার্নিচার শিল্পপার্ক প্রতিষ্ঠা, ভ্যাট কাঠামো সহজ করা এবং এ খাতের উদ্যোক্তা ও কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানো গেলে আন্তর্জাতিক ফার্নিচার বাজারের একটা বড় অংশ দখলে নিতে পারে বাংলাদেশ।
শ্রমের ব্যাপকতা ও সহজলভ্যতা, পুঁজি প্রবাহ, প্রযুক্তিগত সুবিধা এবং বিশ^বাজারে চাহিদার কারণে ফার্নিচার বাংলাদেশের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় পণ্য খাত হিসেবে বিবেচিত। গার্মেন্টস ও টেক্সটাইলস খাতের পর ফার্নিচার খাতে সর্বোচ্চ কর্মসংস্থান হয়েছে। এ খাতে প্রায় ২৫ লাখ জনবল কর্মরত। দেশের জিডিপিতে এ খাতের অবদান প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ। বাংলাদেশের রপ্তানির অবদান সারা বিশ্বের রপ্তানির তুলনায় ০.০৩ ভাগেরও কম। অর্থাৎ দেশের বিপুল ভোক্তার চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশে ফার্নিচারের রপ্তানি বৃদ্ধির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।
বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষ (বিডা) এ প্রতিবেদনে বলছে, দেশীয় ফার্নিচার শিল্প আংশিক রপ্তানিমুখী এবং এ সেক্টরের অধিকাংশ কাঁচামাল আমদানিনির্ভর ও কাঁচামালভেদে মোট আমদানি শুল্ক ১০ থেকে ১২৭ দশমিক ৭২ শতাংশ পর্যন্ত। অথচ ভিয়েতনামে ফার্নিচারের বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানিতে মোট আমদানি শুল্ক ০-৪৫ শতাংশ, যা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম। ফার্নিচার শ্রমঘন শিল্প। বাংলাদেশের শ্রমিক মজুরি কম হওয়ায় এবং রপ্তানির বিপরীতে ১৫ শতাংশ হারে প্রণোদনা প্রদান করা সত্ত্বেও কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চহারে শুল্ক পরিশোধ করার কারণে ফার্নিচার শিল্প বিদেশে রপ্তানিতে মূল্য প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা হারাচ্ছে।
উদ্যোক্তারা বলছেন, সরকারি নীতির সহায়তা পেলে ব্র্যান্ডেড ফার্নিচার কোম্পানির সঙ্গে সঙ্গে এই শিল্পও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়ক হতে পারে, কারণ বিশ্বব্যাপী পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্যানুযায়ী, দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ নন-ব্র্যান্ড আসবাবপত্র এসব ক্ষুদ্র কারখানায় তৈরি হয়। তাদের বাদ দিয়ে ছোট ও মাঝারি পর্যায়ের কারখানার সংখ্যা প্রায় সাড়ে ছয় হাজার। এর বাইরে সারা দেশে প্রায় ৬ হাজার ৫০০টি এসব নন-ব্র্যান্ড ফার্নিচার কারখানা গড়ে উঠেছে।
এদিকে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর কুড়িলে ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) দেশীয় ফার্নিচার শিল্পের সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী ১৯তম জাতীয় ফার্নিচার মেলা ২০২৪-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) অ্যাডমিনিস্ট্রেটর মো. হাফিজুর রহমান। মেলার আয়োজন করে বাংলাদেশ ফার্নিচার শিল্প মালিক সমিতি (বিএফইএ)।
নতুন রপ্তানির মার্কেট হিসেবে চামড়া শিল্পের পর ফার্নিচার শিল্প সম্ভাবনাময় উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত বছর ফার্নিচার সেক্টরে ১২ কোটি ডলার রপ্তানি হয়েছে। এ বছরের পরিমাণ কিছুটা কম। আমরা আশা করছি সামনে আমাদের রপ্তানি আরও বাড়বে।
ফার্নিচার সেক্টরের সমস্যাগুলো উল্লেখ করে এফবিসিসিআইর এ কর্মকর্তা বলেন, প্রথমত বন্ডেট ওয়্যারহাউজের একটি সমস্যা আছে। পাশাপাশি এ খাতে ট্যারিফ ট্যাক্স নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করে। আমার ধারণা, আমরা যদি ট্যাক্সের সমস্যাটা সমাধান করতে পারি তাহলে এ শিল্পকে অনেক উন্নত করা যাবে। আমরা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) অফিসে গিয়ে এ বিষয়ে আলোচনা করব কীভাবে ট্যাক্সের সমস্যা সমাধান করা যায়।
ব্যবসায়ীদের যাতে ট্যাক্সের অফিসসহ অন্যান্য সার্টিফিকেশন অফিসে দৌড়াদৌড়ি কম করতে হয়, সেজন্য সরকারের পক্ষ থেকে নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব আমাদের ব্যবসাগুলোকে কার্যকরী করে আরও সহজতর করা হবে। যারা রপ্তানি-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত, তাদের ঠিক যেভাবে সুবিধা দিলে তারা উন্নয়ন করতে পারবে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৫০ হাজার কোটি ডলারের ফার্নিচারের বাজার রয়েছে। ২০২৫ সালে বিশ্বে ফার্নিচার খাতের বাজার হতে পারে ৬৫ হাজার ৪৬০ কোটি ডলারের। বাংলাদেশ একসময় শতভাগ ফার্নিচার আমদানি করত। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশ দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশেও ফার্নিচার রপ্তানি করছে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ খাতে বাংলাদেশ আরও ভালো করতে পারবে।
আইসিসিবিতে আয়োজিত দেশীয় ফার্নিচার শিল্পের সর্ববৃহৎ এ আয়োজনে অংশ নিচ্ছে হাতিল, আখতার, ওমেগা, নাভানা, রিগ্যাল, নাদিয়া, ব্রাদার্স ফার্নিচারসহ নামিদামি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ ফার্নিচার শিল্প মালিক সমিতির চেয়ারম্যান সেলিম এইচ রহমানের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. আনোয়ার হোসেন, বাংলাদেশ ফার্নিচার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ও এফবিসিসিআই পরিচালক ড. কেএম আখতারুজ্জামান। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ফার্নিচার শিল্প মালিক সমিতির ভাইস চেয়ারম্যান ও মেলা কমিটির আহ্বায়ক শেখ আব্দুল আউয়াল প্রমুখ।