আর চার-পাঁচ জন কলেজ পড়ুয়ার মতোই ছিলেন। ক্যাম্পাস রাজনীতিতে হাত পাকাচ্ছিলেন। আর সেই পড়ুয়াই বর্তমানে হয়ে উঠেছেন দেশের সেরা গ্যাংস্টার। এই মুহূর্তে ভারতের এক নম্বর ডন বলা হচ্ছে তাকে। তার নাম লরেন্স বিষ্ণোই।
বর্তমানে গুজরাটের সবরমতী জেলে বন্দী রয়েছেন ৩১ বছরের লরেন্স বিষ্ণোই। তবে জেলে বসেও থেমে নেই তার অপরাধ কর্ম। একের পর খুন, হুমকির মতো অপরাধের কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন এই গ্যাংস্টার। প্রকাশ্যেই বলেছেন, বলিউডের সুপারস্টার সালমান খানকে খুন করতে চান। সম্প্রতি, সালমানের ঘনিষ্ঠ এনসিপি নেতা বাবা সিদ্দিকিকে হত্যার নেপথ্যেও হাত রয়েছে বিষ্ণোই গ্যাংয়ের। এই হত্যাকাণ্ডের পর আরও একবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে বিষ্ণোই।
কে এই লরেন্স বিষ্ণোই?
পাঞ্জাবের ফিরোজপুরের একটি গ্রামে ১৯৯৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন লরেন্স বিষ্ণোই। তার বাবা হরিয়ানা পুলিশের একজন পুলিশ কনস্টেবল ছিলেন।
চণ্ডীগড়েই স্কুল-কলেজ পড়াশোনা করেন বিষ্ণোই। কলেজ শেষে ২০১১ সালে পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটিতে এলএলবিতে ভর্তি হন, যোগ দেন পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস স্টুডেন্টস কাউন্সিলে।
গ্রামবাসীর মতে, লরেন্স খুব ভালো ছাত্র ছিলেন। ক্রিকেট, ভলিবল ও ঘোড়া চালানোয় প্রচণ্ড ঝোঁক ছিল। তিনি ভদ্র স্বভাবের ছিলেন। কখনও কারও সাথে মারামারি করতেও দেখা যেত না থাকে।
পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস স্টুডেন্টস কাউন্সিলে লরেন্সের সাথে দেখা হয় আরেক গ্যাংস্টার গোল্ডি ব্রারের। এরপর থেকেই বদলে যেতে থাকেন লরেন্স। জড়িয়ে পড়েন সন্ত্রাসী কার্যক্রমে। গোল্ডিই পাঞ্জাব গায়ক সিধু মুসেওয়ালাকে হত্যা করেন বলে দায় স্বীকার করেছিলেন।
অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড
লরেন্স বিষ্ণোই চণ্ডীগড়ে তার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড শুরু করেন যখন তার বিরুদ্ধে ২০১০ এবং ২০১২ সালের মধ্যে খুনের চেষ্টা, অনুপ্রবেশ, হামলা এবং ডাকাতির জন্য একাধিক এফআইআর নথিভুক্ত করা হয়েছিল। এসব মামলার সবগুলোই ছিল তার ছাত্র রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা।
২০১৩ সালে স্নাতক শেষ করার পর, তিনি মুক্তসারে সরকারি কলেজের ছাত্র নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থী এবং লুধিয়ানা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে গুলি করে হত্যা করেছিলেন।
এরপর থেকেই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠতে থাকেন তিনি। ২০১৭ সাল পর্যন্ত লরেন্সের বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ আসতে শুরু করে তা যে কোনও রাজ্যের প্রশাসনের ঘুম কেড়ে নেওয়ার মতো। সাত বছরে ১৬টি গুলি চালানোর ঘটনায় নাম জড়ায় লরেন্সের। এই সময়ে পাঞ্জাব, চণ্ডীগড়, রাজস্থান এবং হরিয়ানা—চার রাজ্যে মোট ৩৩টি মামলায় নাম জড়ায় পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই ছাত্র নেতার।
বিষ্ণোইকে প্রায়ই আত্মগোপনে যেতে হতো। ২০১৪ সালে, রাজস্থান পুলিশের সাথে গোলাগুলির পর তাকে জেলে পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু জেলে বসেই তিনি হত্যা এবং সাক্ষীদের মৃত্যুদন্ডের পরিকল্পনা করেছিলেন। ভরতপুর কারাগারে থাকাকালীন জেল কর্মীদের কাছ থেকে সাহায্য পেয়ে বিষ্ণোই তার সিন্ডিকেট পরিচালনা করতেন।
লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং
বিষ্ণোই গ্যাং কোনো ছোট
খাট সিন্ডিকেট নয়, তাদের বিশ্বজুড়ে কার্যক্রম রয়েছে। বিশেষ করে কানাডায় এই অপরাধ সিন্ডিকেটের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য গোল্ডি ব্রার অবস্থান করছেন। তাদের প্রভাব এবং নেটওয়ার্ক এতটাই বিস্তৃত যে, লরেন্স বিষ্ণোই যখন জেলে বন্দী থাকেন তখনও গ্যাংটির কার্যক্রম অব্যাহত থাকে।
২০১৪ সালে লরেন্স বিষ্ণোই কারাগারে যাওয়ার পর থেকে আরও সংঘবদ্ধভাবে অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করছেন তিনি। বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সংঘটিত হত্যাকাণ্ড লরেন্স বিষ্ণোই-এর জেলে থাকা অবস্থাতেও শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখা, জেলে বসেই গ্যাং পরিচালনা এবং অপরাধ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতাকে নির্দেশ করে।
পাঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান, দিল্লি এবং হিমাচলপ্রদেশসহ বেশ কয়েকটি রাজ্য এবং দেশের বাইরেও ছড়িয়ে রয়েছে বিষ্ণোইয়ের গ্যাং। খুন-রাহাজানি-সহ একগুচ্ছ গুরুতর ঘটনায় পরপর উঠে এসেছে তার নাম। এই দলের প্রধান টার্গেট উচ্চবিত্ত, ধনবান তারকা, ব্যবসায়ীরা।
উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, ভারতের পাঁচটি রাজ্য জুড়ে বিষ্ণোই গ্যাংয়ের ৭০০ জন সদস্য রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ভারতের বাইরেও এই গ্যাংয়ের সদস্য রয়েছে বলে জানা গেছে।
জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ) রিপোর্ট প্রকাশ করেছে যে বিষ্ণোই এবং তার সহযোগী গোল্ডি ব্রারের সাথে খালিস্তানপন্থী সংগঠনেরও যোগসূত্র রয়েছে। কর্তৃপক্ষের মতে, বিষ্ণোই জেলের বাইরে তার সহযোগীদের সাথে যোগাযোগ করতে ভয়েস ওভার আইপি কল ব্যবহার করেন।
সূত্র: উইকিপিডিয়া ও ইন্টারনেট।