সকাল ৮টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত হাসপাতালের চেম্বারে বসার কথা থাকলেও তা মানছেন না বেশিরভাগ চিকিৎসক। সকাল ১০টার আগে তাদের দেখা পাওয়া যায় না। অথচ রোগীরা সেই ভোর থেকে চিকিৎসকদের চেম্বারের সামনে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন। দু-তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও যখন চিকিৎসকের দেখা পান না, তখন ক্ষুব্ধ হয়ে কেউ কেউ চলেও যান। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের প্রতিদিনের চিত্র এটি।
গত মঙ্গলবার সকাল ৭টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে সরেজমিনে অনুসন্ধান করা হয়। এদিনও সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত বেশিরভাগ চিকিৎসকের দেখা পাওয়া যায়নি।
সকাল ৭টায় হাসপাতালে এসে ৮টায় টিকিট কেটে চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ সাগর বড়ুয়ার চেম্বারের সামনে দাঁড়ান সদর উপজেলার বিরামপুরের মো. এনামুল। সকাল ৯টা ৪৪ মিনিট পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থেকেও চিকিৎসকের দেখা পাননি। এই চিকিৎসককে দেখানোর জন্য লাইনে ১০০ জনের বেশি রোগী অপেক্ষায় ছিলেন।
সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে ১০৫ নম্বর চেম্বারে গিয়ে দেখা যায়, সেখানেও চিকিৎসক নেই। রোগীরা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছেন।
সদর থানার মৈয়ন্দ গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম তার শিশুসন্তান রোজাকে (৩) নিয়ে সকাল ৮টায় হাসপাতালে আসেন। এরপর টিকিট কেটে নবজাতক শিশু ও কিশোর রোগ বিশেষজ্ঞ ইসমাইল ভূঁইয়ার (রাহাত) ১১৩ নম্বর কক্ষের সামনে দাঁড়ান। কিন্তু সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকলেও চিকিৎসক আসেননি।
সদর উপজেলার কালিশিমা এলাকার শফিকুল ইসলাম সকাল সাড়ে ৮টায় হাসপাতালে আসেন। ১০৫ নম্বর কক্ষে গেলে তাকে জানানো হয় সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বেলা ১১টায় আসবেন। তিনি বলেন, এই হাসপাতালে সকাল হয় ১০টার পরে। তাই সকাল ৮টায় এলেও চিকিৎসক পাওয়া যায় না।
থাইরয়েড রোগ বিশেষজ্ঞ এ বি এম মুছা চৌধুরীর ২১৪ নম্বর চেম্বারে গত সোমবার সকাল থেকে দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করেও চিকিৎসকের দেখা পাননি আখাউড়া উপজেলার গঙ্গাসাগর গ্রামের (১৪) রাইহান। এ কারণে মঙ্গলবার সকাল ৭টায় আবার আসেন তিনি। বেলা ১১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করলেও চিকিৎসকের দেখা না পাওয়ায় চলে যান।
এ সময় এ বি এম মুছা চৌধুরীর চেম্বারে থাকা চিকিৎসকের স্টাফ মাহির মিয়া বলেন, ‘ডাক্তার আজ আসবেন না।’ কী কারণে আসবেন না, তা তিনি পরিষ্কারভাবে বলতে পারেননি।
২১৫ নম্বর চেম্বারের চিকিৎসক হুমায়ুন কবির রেজাকে দেখানোর জন্য হাসপাতালে আসেন সদর উপজেলার চিনাইর চাপুর গ্রামের মনজুর আলী ভূঁইয়া। তিনি জানান, সকাল ৭টায় লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কেটেছেন। সাড়ে ৭টায় চিকিৎসকের চেম্বারের সামনে আসেন। ১০টা ১৫ মিনিটে চিকিৎসক তার চেম্বারে প্রবেশ করেন। প্রায় তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে তার পা ব্যথা হয়ে গেছে।
পুনিয়াউট এলাকার লাইলী বেগম জানান, গত সোমবার সকাল থেকে অপেক্ষা করেও মেডিসিন চিকিৎসক আলমগীর হোসেনকে দেখাতে পারেননি। তাই মঙ্গলবার ৯টায় আবার এসেছেন। কিন্তু বেলা সাড়ে ১০টা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকলেও চিকিৎসকের দেখা পাননি। তাই এখন চিকিৎসা না নিয়েই তিনি চলে যাবেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায় ২১৬, ২০৫, ২০৪ ও ২০৩ নম্বর চেম্বারের চিকিৎসকরা প্রশাসনিক কাজে তত্ত্বাবধায়কে সাহায্য করেন। এজন্য তারা রোগী দেখেন না। এসব চেম্বারের সামনে কোনো রোগীর আনাগোনাও দেখা যায়নি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (ভারপ্রাপ্ত) শাখাওয়াত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন রয়েছে। যারা সঠিক সময়ে উপস্থিত থাকেন না, সেটা চেক করে অভিযুক্ত চিকিৎসকদের সতর্ক করে দেওয়া হবে।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন নোমান মিয়া বলেন, ‘আমি এখানে নতুন এসেছি। বিষয়টি শুনলাম। দ্রুত সদর হাসপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গে বসবো। সঠিক সময়ে চিকিৎসকরা যাতে উপস্থিত থাকেন, সে ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’