মেট্রোর নিচে দিনে ঘুম, রাতে মাদক সেবন-ছিনতাই

বাংলা মোটর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোয়েল চত্বর। প্রায় দেড় কিলোমিটারে মেট্রোরেলের নিচের অংশে গাছ ভেঙে তৈরি হয়েছে বসতঘর। বিভিন্ন ধরনের কাপড় ও পলিথিন দিয়ে তৈরি ছোট ছোট প্রায় অর্ধশতাধিক সেইসব ঘর বসবাস করছে ভবঘুরেরা। দিনের বেলায় সেখানে তারা ঘুমায় আর রাতে চলে মাদক সেবনের আড্ডা। এই অঞ্চলে ছিনতাই, চুরি, মাদক কারবারসহ বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডও চালায় তারা। মেট্রোরেলের নিচের এই বাসিন্দারা কোনো কিছু পরোয়াও করে না। পথচারীদেরও এসব স্থান দিয়ে চলাচল করতে হয় ভয়ে ভয়ে।

মেট্রোরেলের নিচের অংশের পরিবেশ সুন্দর রাখতে এর নিচের সড়ক বিভাজকে নানা জাতের বৃক্ষরোপণ করেছিল ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। মেট্রোরেলের মাঝখানের এই বিভাজক জুড়ে লাগানো এসব গাছ প্রথম দিকে বেশ নান্দনিক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ছিন্নমূল মানুষের আগ্রাসনে বর্তমানে অনেক গাছই নষ্ট হয়েছে।

মেট্রোরেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালন (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ আব্দুর রউফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, মেট্রোরেলের নিচের অংশে ভবঘুরেদের বসবাসের বিষয়টি আমাদের চোখেও পড়েছে। আন্দোলনের সময়ও অনেক গাছ নষ্ট হয়েছে সেটাও আমরা দেখেছি। কিন্তু বর্তমানে আমাদের লোকবল কম থাকায় এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারছি না। এ ছাড়া আমাদের কাজ মেট্রোর ওপরের অংশে। নিচের অংশের দেখভাল করে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। তবুও এ বিষয়ে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নেব। 

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, বাংলা মোটর থেকে টিএসসি পর্যন্ত প্রায় জায়গাই গাছ ভেঙে ঘুমানোর স্থান তৈরি করছে ভবঘুরেরা। বাংলা মোটরের ৪৯৮ থেকে ৪৯৯ পিলারের মধ্যে তিনটি ঘুমানোর স্থান দেখা যায়। এই জায়গাটুকুতে দীর্ঘ সময় বসবাস করায় গাছগুলোও মরে গেছে। ৫০২ থেকে ৫০৩ নম্বর পিলারের মাঝখানেও করা হয়েছে থাকার ব্যবস্থা। দিনের বেলায়ই সেখানে দুজনকে মাদক সেবন করতে দেখা যায়। শাহবাগের বারডেম হাসপাতালের সামনে একাধিক স্থানে ভিক্ষুক ও ভবঘুরদের দেখা যায়। শাহবাগ মোড় মেট্রোরেলের নিচের অংশের ওপরে একাধিক সাইকেল পাকিং, পচা ফুল ফেলাসহ নানা আবর্জনা রেখে এখানের গাছগুলো নষ্ট করা হচ্ছে। ৫৩০ থেকে ৫৩১ নম্বর পিলারে মধ্যেও দেখা যায়, চারজন ভবঘুরে ঘুমিয়ে আছেন। ৫৩৭ থেকে ৫৩৮ নম্বর পিলারের নিচেও তিনটি বসতঘর রয়েছে। সেখানে কয়েকজন ঘুমিয়ে রয়েছে।

ঘুম থেকে উঠিয়ে ১২ বছরের শিশু মোহাম্মাদ আলীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তার বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দিতে। সে বিকেলে ও রাতে টিএসসি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এলাকায় বোতল টোকায়। থাকার কোনো জায়গা নাই, তাই মেট্রোরেলের নিচে ঘুমিয়ে থাকে। একই স্থানে রিকশাচালক মোহাম্মদ মহসিন জানান, ভাড়া রিকশা চালান ও রাতে মেট্রোরেলের নিচে ঘুমিয়ে থাকেন। টাকায় পোষায় না, তাই এখানে থাকেন। কিন্তু রাতে এখানে কোনো অপরাধ হয় না বলে জানান।

মেট্রোরেলের নিচে টিএসসি থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি ছোট্ট ছোট ঘর রয়েছে। যেখানে বিভিন্ন কাপড় ও পলিথিন দিয়ে ঘেরাও করে দুই থেকে তিনজন করে থাকছেন। তাদের কাঁথা-বালিশ, হাঁড়ি-পাতিল সবই রয়েছে। ৫৫৯ থেকে ৫৬০ নম্বর পিলারের নিচে চারটি ছোট ঘর বানিয়ে থাকছেন মাদকসেবীরা। এক একটি ঘরে একাধিক ব্যক্তিকে দেখা গেছে। কেউ ঘুমাচ্ছে আবার কেউ খাওয়া-দাওয়া করছেন, কেউ মাদক সেবনের প্রক্রিয়া করছেন। তবে দিনের বেলায় এই স্থানগুলোতে বেশিরভাগ লোককে ঘুমিয়ে থাকতে দেখা যায়। আর রাতে তারা বিভিন্ন ধরনের অপরাধে জড়ায়।

মেট্রোরেলের নিচের অংশে এমন অবস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে রাজধানীর প্রেস ক্লবের সামনে দায়িত্বরত ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) পুলিশ সদস্য কনস্টেবল ইশতিয়াকুল বলেন, আমাদের কার্যক্রম হলো মেট্রোরেলের ওপরের অংশে। যাত্রীদের শৃঙ্খলাসহ যাবতীয় ওপরের কার্যক্রম নিয়েই আমরা কাজ করে থাকি। কিন্তু নিচের যে বিষয়টি রয়েছে সেটি থানা-পুলিশ দেখে।

এ বিষয়ে এমআরটি পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত ডিআইজি জাহিদুল কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, এমআরটি পুলিশ দায়িত্ব পালন করে মেট্রোর ওপরে। মেট্রোরেলের নিরাপত্তায় আমাদের তৈরি করা হয়েছে। মেট্রোরেলের নিচের অংশের বিষয়ে এমআরটি পুলিশের কোনো কাজ নেই। তাই এই বিষয়গুলো আমরা দেখছি না।