পরপর তিনটি ঘটনা। এর মধ্যে একটি ছিল দিনের আলোয়। ইস্টার্ন রিফাইনারিতে তেল খালাসের সময় নোঙর করা অবস্থায় প্রথমে বিস্ফোরণ ও পরে অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের মালিকানাধীন ‘এমটি বাংলার জ্যোতি’তে। এ সময় জাহাজটিতে ১১ হাজার ৭০০ টন ক্রুড অয়েল (অপরিশোধিত তেল) ছিল। সকাল ১০টার দিকে আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের টাগবোটগুলো দক্ষতার সঙ্গে দুই ঘণ্টার মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। তবে প্রথমে বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গেই তিনজনের মৃত্যু হয়। এই জাহাজের তেল যদি বিস্ফোরিত হতো, তাহলে পাশে থাকা ইস্টার্ন রিফাইনারি, পদ্মা, মেঘনা অয়েলসহ বিভিন্ন কোম্পানির তেল শোধনাগার ছিল এ এলাকায়। ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসত পুরো এলাকায়।
এ দুর্ঘটনার রেশ না কাটতেই আবারও ৪ অক্টোবর রাত ১২টা ৪০ মিনিটে অগ্নিকা-ের সূত্রপাত হয় বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ‘এমটি বাংলার সৌরভ’ জাহাজে। এ সময় জাহাজটি ১১ হাজার ৫৫ টন তেল মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) থেকে নিয়ে এসে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে খালাসের জন্য বহির্নোঙরে অপেক্ষায় ছিল। মধ্যরাতে আগুন লাগার পরও উদ্ধারকারী টাগবোটগুলোর দক্ষতায় প্রায় আড়াই ঘণ্টার মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। তবে আতঙ্কিত হয়ে একজন নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার পর উপকূলে উঠে তার মৃত্যু হয়। আর এ দুইয়ের ঘটনা শেষ না হতেই ১২ অক্টোবর রাত ১টার দিকে মাদার ভেসেল ‘ক্যাপটেইন নিকোলাস’ থেকে লাইটার জাহাজ ‘এলপিজি সোফিয়া’য় স্থানান্তরের সময় আগুন লাগে। এ আগুন ৩৬ ঘণ্টা পর পুরোপুরি নেভানো সম্ভব হয়। ক্যাপটেইন নিকোলাস জাহাজে ৪২ হাজার ৯২৫ টন এলপিজি গ্যাস নিয়ে কুতুবদিয়ায় নোঙর করে। সেখান থেকে লাইটার জাহাজে করে শিপ টু শিপ (এসটিএস) পদ্ধতিতে গ্যাস ট্রান্সফার করা হচ্ছিল। আর এ সময় উভয় জাহাজে আগুন লাগে। মাদার ভেসেল জাহাজে নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হলেও সুফিয়ার নাবিকরা ভয়ে সাগরে ঝাঁপ দেন। পরে উদ্ধারকারী জাহাজ সব নাবিককে উদ্ধার করলেও সুফিয়ার আগুন নেভানো সম্ভব হয়নি। যতক্ষণ পর্যন্ত গ্যাস ছিল, ততক্ষণ জাহাজটি আগুনে জ¦লছিল। তবে এ আগুন যাতে ছড়িয়ে পড়তে না পারে কিংবা জাহাজটি বিস্ফোরিত হতে না পারে, সেজন্য সার্বক্ষণিক পানি দেওয়া হচ্ছিল টাগবোটগুলোর মাধ্যমে।
বন্দরের ইতিহাসে এ রকম ঘটনা আগে ঘটেনি
চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাস অনেক পুরনো। কিন্তু প্রাচীন ও দেশের প্রধান এই বন্দরে এর আগে এত বড় দুর্ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। বন্দরের বহির্নোঙরে আরও একবার বাংলার সৌরভে আগুন লাগার ঘটনা ঘটলেও এবার একেবারে ডলফিন জেটিতে (তেল খালাসের জেটি) বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেনি। বাংলার জ্যোতির দুর্ঘটনা তাই প্রথম।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক বলেন, ‘বন্দর চ্যানেলের পাশে জেটির মধ্যে এত বড় দুর্ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। আল্লাহ সহায় ছিলেন বলে দেশ বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছে।’
অন্যদিকে এলপিজিবাহী জাহাজ অনেক দিন থেকেই চলাচল করলেও এবার প্রথম দুর্ঘটনা ঘটল। সবসময়ই এসটিএস পদ্ধতিতে মাদার ভেসেল থেকে গ্যাস ট্রান্সফার হলেও দুর্ঘটনা কিন্তু হয়নি। তাহলে এবার কেন হলো?
বিএসসির দুই জাহাজ ছিল সিঙ্গেল হাল ট্যাংকারের
বাংলাদেশ মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ও ১৯৯০-৯১ সালে বাংলার জ্যোতি জাহাজ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সমুদ্র সংস্থার (আইএমও) আইন অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে সমুদ্রপথে “ডাবল হাল ট্যাংকার” ছাড়া কোনো অয়েল ট্যাংকারবাহী জাহাজ চলাচল করতে পারবে না। ২০০৫ সাল থেকে আইএমও তা বলে আসছে এবং ২০১৫ সালের পর থেকে যে আর চলতে পারবে না, তা আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। আর বিএসসির এ দুই জাহাজ ছিল সিঙ্গেল হাল ট্যাংকারের। তাই তা সমুদ্রে চলাচলের অনুপযোগী। শুধু সরকার নিজে এর দায়িত্ব নিয়ে উপকূলীয় এলাকায় লাইটার জাহাজ (মাদার ভেসেল থেকে পণ্য পরিবহনের জন্য ছোট জাহাজ) চালিয়ে আসছিল। তাই এর দায়দায়িত্ব সরকারকেই বহন করতে হবে।’ তাহলে এখন প্রশ্ন ওঠে এই জাহাজ কীভাবে চলাচল করেছে? এ বিষয়ে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, ‘নৌ-দপ্তরের অনুমোদন নিয়েই জাহাজ চলাচল করেছে।’ এ বিষয়ে নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তরে প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন সাব্বির মাহমুদ বলেন, যেহেতু দেশের অভ্যন্তরীণ সীমায় রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে জাহাজটি তেল পরিহনের কাজ করছিল, তাই বিশেষ প্রয়োজনে তা চলাচলের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।’
এলপিজি সুফিয়া থেকে গ্যাস লিকেজ হয়েছিল
ক্যাপ্টেন নিকোলাশ নামের মাদার ভেসেল জাহাজ থেকে যখন লাইটার জাহাজ এলপিজি সুফিয়ায় গ্যাস ট্রান্সফার করা হচ্ছিল, তখন হোস পাইপ খোলার সময় আগুন লেগে যায়। এখন প্রশ্ন হলো হোস পাইপ খোলার সময় আগুন লাগল কেন? গ্যাস লিকেজ হয়েছিল এটা নিশ্চিত। আর লিকেজ হওয়ার কারণেই হয়তো সিগারেট বা অন্য কোনো কারণে স্পার্ক থেকে আগুন লেগেছে। তাহলে লিকেজ হলো কেন? খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পানামার পতাকাবাহী এলপিজি সোফিয়ায় গ্যাস লোড শেষ হয়ে যাওয়ার পর অটোমেশন প্রক্রিয়ায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করার পরও গ্যাস বন্ধ হয়নি। আর এতেই গ্যাস লিকেজ হয়েছে এবং পরে আগুন ধরেছে। অগ্নিকান্ডের ঘটনায় নিয়োজিত তদন্ত কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, ‘৩৬ ঘণ্টা পর আগুন নিভে যাওয়ায় আমরা জাহাজে গিয়ে অটোমেশন পদ্ধতিতে হোস পাইপ বন্ধ করলেও দেখি পুরোপুরি বন্ধ হয় না। এতেই বোঝা গেছে তা সঠিক ছিল না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পানামার পতাকাবাহী এলপিজি সোফিয়া ২৭ বছরের পুরনো। ১৯৯৭ সালের ২০ মে এটি তৈরি হয়েছিল পানামায়। এই জাহাজের মূল মালিক সংযুক্ত আরব আমিরাতের আটলান্টিস গ্যাস ডিএমসি।’
অয়েল ট্যাংকারবাহী জাহাজের ক্যাপ্টেনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারের আইন অনুযায়ী রাতের বেলা গ্যাস ট্রান্সফার বন্ধ রাখার নিয়ম। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। যদি মানা হতো, তাহলে রাত ১টায় আগুন লাগার কথা নয়। এ ছাড়া এই লাইটার জাহাজ লোড হওয়ার পর আরেকটি জাহাজ অপেক্ষায় ছিল লোড করার জন্য। এতেই বোঝা যায় এসটিএস পদ্ধতিতে রাতেই গ্যাস ট্রান্সফার হওয়ার কাজ চলছিল।