আমি যখন ঢাকায় আসি, মনি কিশোর দাদা দারুণ জনপ্রিয়। চারদিকে কান পাতলেই শোনা যায় মনি কিশোর দাদার ‘কী ছিলে আমায়, বলো না তুমি...।’ আমি তখন ঢাকা কলেজে এসে অনার্স প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছি, যেহেতু আমি গান পছন্দ করি, বলতে গেলে শিল্পী হতে চাই। তাই মনি কিশোর দাদার সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা করলাম। একদিন শান্তিনগর মোড়ে অডিও আর্টস স্টুডিওতে দেখা করলাম। তিনি এত অমায়িক মানুষ, এত সরল মানুষ আমি মুগ্ধ হয়েছি। এরপরে তার সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল। আমি মাঝে মধ্যেই মনি কিশোরদার সঙ্গে দেখা করতাম। সম্পর্কটা একটা পর্যায়ে এমন হলো যে আমি মাঝেমধ্যেই তার সঙ্গে রিকশায় করে ঘুরতাম। কিন্তু মনি কিশোরদা একটা সময়ে চিন্তা করলেন তিনি ব্যবসা করবেন। ফাইনালি ঠিক করলেন মিষ্টির দোকান দেবেন। যে কথা সেই কাজ। তিনি মালিবাগে একটা মিষ্টির দোকান দিলেন। টাঙ্গাইলের চমচমসহ অনেক নামি মিষ্টি পাওয়া যেত।
মনি কিশোর দাদার সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি। তখন আমি শিল্পী হয়ে গেছি। মানে আমার ‘অনেক বেদনা ভরা আমার এ জীবন’ তখন হিট হয়ে গেছে। মানুষজন আমাকে চেনে। ১৯৯৬/৯৭ সালের কথা; তো এরপর আমি নিজের গানের কাজ করছি। আমার চারটি গান তখন নতুনভাবে করছি, একটা অ্যালবামের জন্য। মিল্টন খন্দকার তখন খুবই জনপ্রিয় সুরকার। সঙ্গীতার প্রযোজক সেলিম খানের জন্য সেই চারটি গান করছি। সুর করতে দিলাম মিল্টন ভাইকে। মিল্টন ভাইকে বললাম, ভাই আমি এই গানগুলোর মিউজিক করব। তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ করো।’ এরপর আমি ওই চারটি মিল্টন ভাইয়ের কাছ থেকে সুরের কাজ সম্পন্ন করে নিয়ে এলাম। সে সময় মনি কিশোর দাদা ভারত যাবেন তার গানের জন্য। তো আমি তাকে বললাম, দাদা আপনি যাচ্ছেন, আমার চারটা গান আছে, এই চারটা গানের যদি সংগীতায়োজন করে নিয়ে আসতেন... তখন মনি কিশোর দাদা আমার কথা রাখলেন। বললেন, ‘ঠিক আছে দাও।’ আমি তাকে টাকা-পয়সা বুঝিয়ে দিলাম। পরে চারটা নিয়ে গেলেন। তারপরে সংগীতায়োজন করে নিয়ে এলেন। মনি কিশোর দাদা প্রসঙ্গে একটা কথা বলে রাখি, উনার যে ভয়েস তা অসাধারণ, আমি যেটা দেখেছি, আমার ধারণা সেটা গড গিফটেড ভয়েস। তো উনি যে সংগীতায়োজকের সঙ্গে কাজ করেন, তিনি হয়তো মনি কিশোর দাদার খালি গলার গানের সঙ্গে মিউজিক করতে পারতেন। কিন্তু আমার গানের যে মিউজিক করে আনলেন, সেটার স্কেল থেকে ওপরে উঠে গিয়েছিল। আমি মনি কিশোর দাদাকে বললাম। তিনি বললেন, ‘আরে আমরা রাতে একসঙ্গে আড্ডা দিলাম, আমি তো আসলে খেয়াল করিনি। পরে তিনটা গান তেমনই থাকল, একটা গান বাংলাদেশে বাপ্পা মজুমদার ও বাসুকে দিয়ে করলাম। সেই চারটা গানের একটা গান সুপার ডুপার হিট হলো। গানটার নাম ‘লাল বেনারসি, জড়িয়ে তুমি আমার সীমানাটা ছাড়িয়ে গেলে...।’ ওই অ্যালবামের আরও একটা গান আলোচিত ছিল, ‘তোমার নীল নীল চোখে...।’ এছাড়াও ছিল ‘ফুলেরা বলল...’ এই গানগুলোর সঙ্গে মনি কিশোরদা জড়িয়ে আছেন।
মনি কিশোরদা আমার শিল্পী জীবনে ভূমিকা রেখেছেন। তিনি আমাকে সবসময়ই উৎসাহ দিয়েছেন। শিল্পী হিসেবেও আমাকে দারুণ পছন্দ করতেন।
অনুলিখন : মাহতাব হোসেন