স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে নিয়োগ নিয়ে মুখোমুখি ড্যাব-এনডিএফ

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন পদে গত ১৭ অক্টোবর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ দেওয়া ১০ জনকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা ড্যাব ও ও জামায়াতপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম বা এনডিএফ।

ড্যাব এসব নিয়োগের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এসব কর্মকর্তাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দোসর ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থানের অভিযোগ এনে অধিদপ্তরসহ সব ধরনের প্রতিষ্ঠান থেকে অপসারণের দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে নিয়োগপ্রাপ্তদের কাজের সুযোগ করে দিতে পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এনডিএফ।

এ নিয়ে আজ সোমবার দুপুরে রাজধানীর মহাখালী টিবি গেটে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ভবনে দুই পক্ষের অবস্থানকে কেন্দ্র করে হামলার ঘটনা ঘটে। এতে এনডিএফপন্থি তিন চিকিৎসক আহত হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, এদিন সকাল থেকেই অধিদপ্তরের সামনে অবস্থান নেন ড্যাবপন্থি চিকিৎসকরা। এ সময় তারা সদ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ফ্যাসিবাদের দোসর আখ্যা দিয়ে নিয়োগ বাতিলের দাবি জানান। অন্যদিকে অধিদপ্তরের ভেতরে অবস্থান নিয়ে স্বাস্থ্যখাত সচল রাখতে বর্তমান নিয়োগপ্রাপ্তদের কাজের পথ সুগম করার দাবি জানান এনডিএফপন্থি চিকিৎসকরা।

এ সময় দুই পক্ষ পরস্পর বিরোধী স্লোগান দিতে থাকেন। এক পর্যায়ে এনডিএফপন্থি চিকিৎসক ও ড্যাবপন্থি চিকিৎসকদের মধ্যে উওেজনা দেখা দেয় এবং তা হাতাহাতি পর্যায়ে পৌঁছায়। আন্দোলনকারীদের কিছু অংশ চিকিৎসকদের ওপর হামলা চালায়।

এনডিএফপন্থি চিকিৎসকদের দাবি, ড্যাবের সঙ্গে থাকা বহিরাগত সন্ত্রাসীরা রড ও লাঠিসোঁটা নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এতে তিনজন আহত হয়েছেন। তারা হলেন- ডা. ইমরান হোসাইন, শাহরিয়ার ও যোবায়ের। ডা. ইমরান বিএসএমএমইউর নিউরো সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক এবং এনডিএফের একজন সদস্য। আহতদের মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর।

অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে নিয়োগ ও বদলিকে কেন্দ্র করে গত কয়েকদিন ধরেই আন্দোলন করে আসছে ড্যাব। এর আগে গতকাল রবিবারও ড্যাব অবস্থান কর্মসূচি পালন করে এবং নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অধিদপ্তরে ঢুকতে বাঁধা দেয়। অধিদপ্তরে ঢুকতে না পেরে বাহির থেকেই চলে যান নিয়োগ পাওয়া পরিচালক (প্রশাসন) ডা. এবিএম আবু হানিফ, উপপরিচালক (হাসপাতাল-১) ডা. জয়নাল আবেদীন টিটোসহ কয়েকজন। তারা এ সময় সাংবাদিকদের কাছে তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন।

গতকাল রবিবারের বিক্ষোভ সমাবেশকে ড্যাবের পক্ষ থেকে ড্যাব ও এনডিএফসহ বঞ্চিত চিকিৎসকদের সম্মিলতি আন্দোলন হিসেবে দাবি করেছিলেন ড্যাবের এক জ্যেষ্ঠ নেতা। তিনি দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছিলেন, বৈষম্যের শিকার সবাই ড্যাব ও এনডিএফের চিকিৎসক। সমাবেশে এনডিএফের সদস্য হয়তো কম ছিল, ড্যাবের বেশি ছিল। কিন্তু এই দুই সংগঠনের চিকিৎসকরাই বেশি বৈষম্যের শিকার ও তারা সম্মিলিতভাবে এসব নিয়োগের বিরোধিতা করে আসছেন। কারণ তারাই স্বাধীনতার মূল শক্তি এবং এই সরকারের মূল সমর্থক। কিন্তু গতকাল সেই এনডিএফের সাথেই সংঘর্ষ বাঁধে ড্যাবের।

এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিচার দাবি করেছেন এনডিএফের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) শাখার সভাপতি ডা. আতিয়ার রহমান। তিনি সোমবার রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, গণঅভ্যত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যতদূর সম্ভব যাচাই-বাছাই করে নিরপেক্ষ ও দক্ষ লোক নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করছে। এনডিএফের দায়িত্ব হচ্ছে সরকারকে সহযোগিতা করা। সে জন্যই তারা কয়েকদিন আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে নিয়োগ পাওয়া কিছু কর্মকর্তাদের কাজে যোগদানের পক্ষ নিয়েছে। কিন্তু আরেকটি সংগঠন এই নিয়োগের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আমাদের সন্দেহ হয়- এরা বিদায়ী স্বৈরশাসকের দোসর কি না। কারণ ভালো মানুষদের যোগদান করতে দিচ্ছে না। রবিবারও এনডিএফ নিয়োগপ্রাপ্তদের কাজে যোগদানে সহযোগিতা করার জন্য গিয়েছিল। কিন্তু সেদিনও ওই সংগঠন তাদের কাজে যোগ দিতে দেয়নি।

এই এনডিএফ নেতা বলেন, আমরা ভেবেছিলাম সোমবার তাদের কাজে যোগদান করতে দেওয়া হবে। সে জন্য সংগঠনের পক্ষ থেকে ফুলের তোড়া নিয়ে তাদের স্বাগত জানাতে আগে থেকেই চিকিৎসকরা অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু সেখানে আরেকটি সংগঠনের চিকিৎসকরা চলে আসেন এবং নিয়োগপ্রাপ্তদের কাজে যোগদান করতে দেননি। উল্টো এনডিএফের চিকিৎসকদের মারধর শুরু করেন। এতে তিনজন আহত হন। একজনের আঘাত গুরুতর। হামলাকারীরা সবাই ডাক্তার না। তাদের সাথে কিছু কর্মচারী ও রাস্তার লোকজনও ছিল। আমরা চাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তাদের নিয়োগ বাস্তবায়ন করবে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখবেন। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।

অন্যদিকে সোমবারের ঘটনাকে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ বলে দাবি করেছেন ড্যাবের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ডা. মেহেদী হাসান। তিনি গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। আমাদের কর্মসূচি ছিল পূর্বনির্ধারিত। তাদের কোনো কর্মসূচি ছিল না। কিন্তু আমরা গিয়ে দেখি তারা ওখানে বসে আছেন। আমরা ওদের সেখান থেকে সরে যাওয়ার অনুরোধ করি। কারণ তাদের সঙ্গে গণ্ডগোলের কোনো সুযোগ নেই। ওরা আমাদের সেখানে যেতে বলে ও কোনো অসুবিধা নেই বলে জানান। এ অবস্থায় সেখানে আমরা যাই। কিন্তু তাদের কিছু ছেলেপেলে ওখানে বসেছিল। এ সময় কিছু মৃদু ধাক্বাধাক্বি হয়।

আহত হওয়ার ব্যাপারে এই ড্যাব নেতা বলেন, তাদের সঙ্গে আমাদের সংঘাত হওয়ার কোনো কারণই নেই। আমরা তো ওদের সঙ্গে আলোচনা করেই গিয়েছি। ধাক্কাধাক্বির কারণে কেউ সামান্য আহত হতে পারেন। ইচ্ছে করে কোনো আঘাত করা হয়নি। আমরা আমাদের কর্মসূচি পালন করেছি।