২২ জন মানুষ মিলে একটা মাঠে খেলতে নেমে গেলেই একটা ক্রিকেট ম্যাচ হয় না। চারজন আম্পায়ার, ম্যাচ রেফারি, কিউরেটর, মাঠকর্মী, নানা প্রযুক্তি থেকে শুরু করে নিরাপত্তার বিশাল আয়োজনের যে বিশাল দক্ষযজ্ঞ, তার মূল দর্শন একটাই, ন্যায্যতা। দুটো দলের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাটা যেন ন্যায্য হয়। ব্যাট এবং বলের দ্বৈরথে যেন সমতা বিরাজ করে। নিজেদের মাঠের সুবিধা নেওয়ার নাম করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বছরের পর বছর মিরপুরের শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে যেসব উইকেট বানিয়ে রেখেছে, তা আক্ষরিক অর্থেই ক্রিকেটের জন্য অভিশাপ। বাংলাদেশের শীর্ষ ক্রিকেটাররা নানা সময়ে প্রকাশ্যেই বলেছেন যে, এখানে বেশি ম্যাচ খেললে ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে। ভারত সফরে খারাপ ব্যাটিংয়ের জন্য দেশের উইকেটকে দোষ দিয়েছেন ব্যাটসম্যানরা। এবার দেশের মাটিতে ব্যাটিং ব্যর্থতার পর অভিযোগ জানাবার জায়গাটুকুও তাদের নেই।
মিরপুরে বাংলাদেশ-দক্ষিণ আফ্রিকা টেস্টের প্রথম দিনে ১৬ উইকেটের পতন। এক দিনের খেলায় সোমবারই সবচেয়ে বেশি উইকেটের পতন দেখল শেরেবাংলার ২২ গজ। মাস দশেক আগে, ডিসেম্বরে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্টের প্রথম দিনে পতন হয়েছিল ১৫ উইকেটের। ২০০ রানের নিচে ছিল চারটি ইনিংসই। বৃষ্টিতে দ্বিতীয় দিনের খেলা ভেসে যাওয়ার পরও সেই টেস্ট সাড়ে তিন দিনেই শেষ। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্টেরও পরিণতি একই দিকে যাচ্ছে বলেই প্রতীয়মান। মিরপুর ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চেন্নাই এবং কানপুরেও বাংলাদেশকে তিন দিনের ভেতরেই হেরে যেতে দেখার অভ্যাস রপ্ত করতে দেখা গেছে। টেস্ট ক্রিকেট বাঁচিয়ে রাখতে যেখানে আলাদা তহবিল গঠনের দাবি উঠেছে, সাদা পোশাকের ক্রিকেটকে উত্তেজনাপূর্ণ করতে যেখানে ইংল্যান্ড, ভারতের মতো দল টেস্টেও সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রান তুলছে, সেখানে মিরপুরের এসব দৃষ্টিকটু টেস্টম্যাচ কি ভালো কোনো উদাহরণ সৃষ্টি করছে? এমন প্রশ্নই রাখা হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকার পেসার কাগিসো রাবাদার কাছে। উত্তরের শুরুটা রসিকতা দিয়ে করলেও পরে জানিয়েছেন গভীর আশঙ্কার কথা, ‘শেষ পর্যন্ত আমরা কী চাই, ব্যাট আর বলের ভেতর ন্যায্য একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এই ধরনের উইকেটই সবার তৈরি করার চেষ্টা করা উচিত। আমি বলব প্রথম দিনেই ১৬ উইকেট মানে পাল্লাটা বোলারদের দিকেই ঝুঁকে আছে। কেউ নিশ্চয়ই চাইবে না লড়াইটা খুব একপেশে হোক। কিছু কন্ডিশন বোলারদের সহায়তা করবে, কিছু ব্যাটসম্যানদের করবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক উইকেট নিরপেক্ষ আচরণ করবে। কে জানে পরের টেস্টে হয়তো ৪৫০-৫০০ রান হতে পারে। তবে আমার দৃষ্টিকোণ থেকে টেস্ট ক্রিকেট; সর্বোপরি ক্রিকেট হতে হবে ব্যাট আর বলের মধ্যে ন্যায্য একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বোলাররা ভালো বল করলে উইকেট নেবে আর ব্যাটসম্যানরা নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগালে রান করবে।’
একই প্রশ্ন রাখা হয়েছিল পাঁচ উইকেট শিকারি তাইজুল ইসলামের কাছে। তার দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্য ভিন্ন, ‘একটা দল যখন খারাপ খেলে তখন ফেয়ার (ন্যায্য) আসলে কোনোভাবেই হয় না। সেটা আপনি ভালো উইকেট দেন আর খারাপ উইকেট দেন। আমার কাছে আসলে ভালো খেলাটা ইম্পরট্যান্ট। কন্ডিশন কোনো সময় এদিক-ওদিক হতে পারে। নিউজিল্যান্ডে দক্ষিণ আফ্রিকায় গেলে তো আপনি লো, ফ্ল্যাট উইকেট পাবেন না। তাদের হয়তো মুভমেন্ট থাকবেই। আমার কাছে মনে হয় উইকেটের দোষ দিয়ে কোনো লাভ নেই।’
অতীতে অস্ট্রেলিয়া ইংল্যান্ডের জন্য দেশে এমন স্পিনের ফাঁদ পেতে টেস্ট জয়ের কৃতিত্বও নিয়েছেন সাবেক কোচ। কিন্তু তাতে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের দক্ষতা বাড়েনি, তৈরি হয়নি বড় দৈর্ঘ্যরে ম্যাচ খেলার মানসিকতা।