তাইজুল ইসলামের বলটি সুইপ করেই সিঙ্গেল নিতে ছুটলেন কাইল ভেরেইনা। নন-স্ট্রাইক প্রান্তে ব্যাট কোনোরকমে ছুঁইয়ে নিজেকে ছুড়ে দিলেন শূন্যে। হাওয়ায় ভাসলেন, ছুটলেন দিগি¦দিক, ব্যাট তুলে ধরলেন ড্রেসিংরুমের দিকে। মিরপুরের গ্যালারিতে থাকা গুটিকয়েক বাংলাদেশি সমর্থকও ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সেঞ্চুরি করা ভেরেইনাকে অভিনন্দন জানাতে কার্পণ্য করলেন না। সতীর্থদের আনন্দ দিতেই উদযাপনটা হলো দীর্ঘ। ব্যাটারদের বধ্যভূমিতে ১০৮ রানে ৬ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর আট নম্বর ব্যাটারকে সঙ্গী করে শতাধিক রানের জুটি, তারপর নিজের সেঞ্চুরি। তার ১১৪ রানে ভর করে দক্ষিণ আফ্রিকা এমন এক জায়গায় পৌঁছে গেল, যেখান থেকে পরাজয়ের শঙ্কা নেই বললেই চলে।
২৭ বছর বয়সী ভেরেইনার টেস্ট অভিষেক ২০২১ সালে। শুরুর কয়েকটি ইনিংস পাঁচে ব্যাট করলেও পরবর্তী সময়ে ছয় নম্বরেই থিতু হন। ২০২২ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ক্রাইস্টচার্চে ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি করেছিলেন ছয়ে নেমেই। মাঝেমধ্যে সাত নম্বরেও খেলতে হয়েছে দলের প্রয়োজনে। ১৯ টেস্টে ৩০.৮৫ গড়ই বলে দিচ্ছে, লোয়ার-মিডল অর্ডারে তার গুরুত্ব। কিন্তু মিরপুরে তার সেঞ্চুরিটার গুরুত্ব ভিন্ন। উপমহাদেশে টেস্ট খেলার কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না ভেরেইনার। একটি মাত্র প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছিলেন। এখানকার গরম, আর্দ্র কন্ডিশন তার কাছে অচেনা। ছোট্ট ক্যারিয়ারে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথাগত উইকেটে খেলেই তিনি বড় হয়েছেন। কিন্তু প্রথমবার উপমহাদেশে এসে মিরপুরের বিরুদ্ধ কন্ডিশনে ব্যাট হাতে তিনি যা দেখালেন, সেটাকে অসাধারণ বললেও কম বলা হবে।
উপমহাদেশ মানেই স্পিন স্বর্গ ক্রিকেট দুনিয়ায় এটা একটা মিথ হয়ে গেছে। ভারত সেই স্পিন বলয় থেকে বেরিয়ে এলেও বাংলাদেশ পারেনি। তাই ভেরেইনাদের প্রস্তুতিটাও ছিল স্পিন আক্রমণকে মাথায় রেখেই। সংবাদ সম্মেলনে ভেরেইনার অভিব্যক্তি দেখে বোঝার উপায় নেই মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই কী অসাধারণ এক ইনিংস খেলে এসেছেন। নির্মোহভাবেই ঘোষণা করলেন, ‘যদিও বলার সময় হয়নি, তবু বলছি যে এটা অবশ্যই আমার টেস্ট ক্যারিয়ারের সেরা ইনিংস, যা আমি সবচেয়ে কঠিন কন্ডিশনে, গরম এবং আর্দ্রতার সঙ্গে লড়াই করে খেলেছি। ক্রাইস্টচার্চের কন্ডিশন এমন ছিল না। আমরা জানতাম, উপমহাদেশে স্পিন আক্রমণের মুখোমুখি হতে হবে। আমার ইনিংসের ৯০ শতাংশই ছিল স্পিনারদের বিপক্ষে। এটা খুবই কঠিন ছিল।’
সেই কঠিন কাজটা কীভাবে সহজ করেছেন, সে সম্পর্কেও ধারণা দিয়েছেন ভেরেইনা। বাংলাদেশকে তারা মোটেও হালকাভাবে নেয়নি। তাই সফরের আগে প্রিটোরিয়াসে হয়েছে প্রস্তুতি ক্যাম্প। সেই ক্যাম্পে আবার বাংলাদেশের সাবেক ব্যাটিং কোচ অ্যাশওয়েল প্রিন্সকেও পেয়েছিলেন ভেরেইনারা, যিনি এখানকার কন্ডিশন সম্পর্কে সবই জানেন। তাই অনুশীলনে গুরুত্ব পায় স্পিন সামলানো। বাংলাদেশি স্পিনের বিপক্ষে প্রোটিয়াদের প্রচুর সুইপ শট খেলতে দেখা গেছে, যা তাদের অনুশীলনেরই প্রতিফলন। তবে বিশেষ কোনো শট খেলার ওপর জোর দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করলেন ভেরেইনা। বললেন, ‘প্রস্তুতি ক্যাম্পে সুইপ শট খেলার ওপর কোনো বাড়তি জোর দেওয়া হয়নি। তবে স্পিন বোলিং নিয়ে আমরা যথেষ্ট কাজ করেছি। নিজেকে বুঝিয়েছি, ইতিবাচক থাকতে হবে এবং সঠিক জায়গায় ফোকাস রাখতে হবে। হ্যাঁ, অ্যাশওয়েলও (প্রিন্স) আমাদের সমৃদ্ধ করেছে।’
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এসব শটে বাংলাদেশি ব্যাটাররা নিয়মিতই আত্মাহুতি দিয়ে সমালোচিত হন। প্রথাগত শটেও সঠিক বল নির্বাচন কিংবা ঠিকঠাক টাইমিং করতে পারেন না। ভেরেইনার আত্মবিশ্বাস আর মনঃসংযোগ এমন জায়গায় ছিল যে, ৯৯ থেকে তিন অঙ্কে যেতে সুইপ শটকেই বেছে নিয়েছেন। তারপর আনন্দে ডানা মেলেছেন। লম্বা সময় ধরে করেছেন উদযাপন। যে উদযাপনের কোনো রহস্য নেই, আছে শুধু বাঁধভাঙা আনন্দ।