জেলা দায়রা বা মহানগর দায়রা আদালতে একেকটি এজলাসে বিচারকাজ পরিচালনা করতে রাষ্ট্রপক্ষে সাধারণত সর্বোচ্চ ১০ জন আইন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু এবার ব্যতিক্রম ঘটনা ঘটেছে ঢাকার দুটি আদালতে। সম্প্রতি ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে ৮৪ জন এবং ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে ৬১ জন বিভিন্ন পদমর্যাদার সরকারি আইন কর্মকর্তা নিয়োগ পেয়েছেন। যদিও এর আগে মহানগর দায়রা জজ আদালতে চার এবং জেলা দায়রা জজ আদালতে ৯ জন আইন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেছেন। অথচ চারজনের স্থলে ৮৪ এবং ৯ জনের স্থলে ৬১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি ঢাকার আদালতগুলোয় রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করতে ৬৫৯ জন আইন কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছে আইন, বিচার এবং সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের সলিসিটর অনুবিভাগ। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ঢাকা মহানগর দায়রা আদালত, ঢাকা জেলা ও দায়রা আদালতে তিন আদালতেই দায়িত্ব পালন করবেন ১৪৫ জন আইন কর্মকর্তা। বিষয়টি বর্তমানে ঢাকার আদালত এলাকায় আলোচনার খোরাক হয়েছে।
ঢাকার আদালত এলাকায় ফৌজদারি, দেওয়ানি ও অন্যান্য মামলার বিচারকাজ পরিচালনা করতে এজলাস রয়েছে দেড়শোর মতো। আইনজীবীরা বলছেন, এজলাসগুলোয় স্থানের সংকুলান আছে। আদালতগুলোয় সর্বোচ্চ ৪০ থেকে ৪৫ জন আইনজীবী বসতে পারেন। অন্যদিকে একটি আদালতে এত বেশিসংখ্যক সরকারি আইন কর্মকর্তা নিয়োগের ফলে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। এরপর থেকে অনেকটা আত্মগোপনে চলে যান আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা। বিশেষ করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন সময়ে নিয়োগ পাওয়া ৫০০-এর বেশি আইন কর্মকর্তার অনুপস্থিতিতে ঢাকার আদালতের কার্যক্রমে অচলাবস্থা চলছিল। এই পরিস্থিতিতে গত ১৪ অক্টোবর ঢাকার বিভিন্ন আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করতে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অতিরিক্ত পিপি, অতিরিক্ত জিপি (গভমেন্ট প্লিডার), সহকারী পিপি, সহকারী জিপি পদমর্যাদার ৬৫৯ জন সরকারি আইন কর্মকর্তা নিয়োগ দেয় আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়। ঢাকার আদালতের ইতিহাসে একসঙ্গে এ নিয়োগ সর্বোচ্চ বলে জানান জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা।
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর একজন (অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক ফারুকী), অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর ২৬ জন এবং সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবে ৫৭ জন নিয়োগ পেয়েছেন। এর আগে মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর একজন, অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর ছিল তিনজন। জেলা দায়রা জজ আদালতে দেওয়ানি মোকদ্দমা পরিচালনার জন্য নিয়োগ পেয়েছেন ৪৫ জন আইন কর্মকর্তা। একই সঙ্গে ফৌজদারি মামলা পরিচালনা করার জন্য নিয়োগ পেয়েছেন ১৬ জন। দেওয়ানি মামলায় ১০ জন অতিরিক্ত জিপি ও ৩৪ জন সহকারী জিপি নিয়োগ পেয়েছেন।
নিয়োগের বিষয়ে ঢাকার আদালতে ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের সাবেক পিপি এহসানুল হক সামাজী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এর আগে কোনো সরকারের আমলে একসঙ্গে এত বেশিসংখ্যক সরকারি আইন কর্মকর্তা নিয়োগ হয়নি। নির্বাচিত সরকার এসে দলীয় বিবেচনায় আইন কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে থাকে। বর্তমান সরকার কোনো দলের নয়, তাই তারা দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে পারে না।’ একটি আদালতে ৮৪ আইন কর্মকর্তা নিয়োগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ‘এটা কোনোভাবে কাম্য নয়, এতে আদালতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে।’
জানা গেছে, ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল, নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনাল, মানব পাচার ট্রাইব্যুনাল, জননিরাপত্তা ট্রাইব্যুনাল, বিভাগীয় বিশেষ জজ ও পরিবেশ আপিল আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা এত দিন বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (বিশেষ পিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তারা ছিলেন মহানগর পিপির অধীনে। গত ১৪ অক্টোবর আইন মন্ত্রণালয় থেকে যে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে এসব আদালতের আইন কর্মকর্তাদের পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা আইনজীবী সমিতির এডহক কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ খোরশেদ আলম মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। তবে আমার আইন পেশার ৩৫ বছরে এমন নিয়োগ দেখিনি।’