নদীকে বলা হয় সভ্যতার প্রাণ। পৃথিবীর যাবতীয় বড় বড় সভ্যতা গড়ে উঠেছে নদীর পাশে। নীল নদের কল্যাণে গড়ে উঠেছে মিসরীয় সভ্যতা, চীনের দুঃখ বলা হলেও আদতে এত সুবিশাল সভ্যতা গড়ে ওঠার পেছনে আছে হোয়াংহো নদী। আমাজন নদীর বৈচিত্র্য রক্ষা করে লাখ লাখ প্রাণ। আর বাংলা সাহিত্যে, বাংলার সংস্কৃতিতে আমরা গর্বভরে বলি এ দেশ নদীমাতৃক দেশ। যুগে যুগে কবিরা যথাযথই নদীকে মাতৃদুগ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন। গায়কের ভাষায় পদ্মা আমার মা, গঙ্গা আমার মা। মা যেমন শিশুকে পুষ্টি দেন নদী তেমনি আমাদের এই বদ্বীপ অঞ্চলকে পুষ্টি দেয়। নদীর পানিতে বয়ে নিয়ে আসা পলির কল্যাণে এ দেশের ভূমি হয়ে ওঠে সুফলা। মহাভারতের মতো সুপ্রাচীন গ্রন্থে এই অঞ্চলকে উল্লেখ করা হয় নদীর আশীর্বাদ হিসেবে। কেবল পলিমাটি বয়ে আনাই নয়, বিপুল সম্পদের নদী জীবিকার সন্ধান দিয়েছে লাখ লাখ মানুষকে আর নদীপথের বাণিজ্য হাজার হাজার বছর ধরে সমৃদ্ধির সবচেয়ে বড় উৎস। এমনকি এই আধুনিক প্রযুক্তির যুগে, উড়োজাহাজের যুগেও জলপথে বাণিজ্যিক পরিবহন সবচেয়ে সস্তা এবং কার্যকরী। তথাপি মানুষের লোভে এ দেশের প্রাণ নদীগুলো দীর্ঘদিন ধরেই হুমকির শিকার।
প্রায় প্রতিটি নদীর পাড় ঘেঁষে বেড়ে উঠেছে অসংখ্যা অবৈধ স্থাপনা। এসব স্থাপনা গড়ে উঠে রাজনৈতিক পেশিশক্তির বদৌলতে। এসব স্থাপনার ফলে দূষিত হয় নদীর পানি, নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীকে নদী হিসেবে চেনা যায় না বহু বছর। বুড়িগঙ্গার কালো পানি দেখলে শিউরে উঠতে হয়। এই পানির ঘনত্ব কোথাও কোথাও নর্দমার পানির চেয়ে বেশি। এতে থাকা নানারকম ক্ষতিকর কঠিন পদার্থের (দূষণ) পরিমাণ মাত্রাছাড়া। পান করা তো দূর, এই পানির সংস্পর্শে এলে মানুষসহ অন্য প্রাণীদের রোগ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। ব্যাপক মাত্রার দূষণে নদীতে উদ্ভিদ ও প্রাণীর পক্ষে জীবনধারণ করা প্রায় অসম্ভব।
অবৈধ দখল এবং কারখানার বর্জ্য নিষ্কাশনই কেবল নয়, বুড়িগঙ্গা নদীকে পরিকল্পিতভাবেই শহরের বর্জ্য নিষ্কাশনের আধার করে রাখা হয়েছে। সাধারণত নদীকে সামনে রেখে শহরগুলো পেছনের দিকে বাড়লেও ঢাকা শহরে বুড়িগঙ্গাকে পেছনে রেখে শহর সামনে দিকে বেড়েছে। বুড়িগঙ্গা পরিণত হয়েছে বর্জ্যরে ভাগাড়ে। একে বাঁচাতে কেবল তাই নদী পারের দখল উচ্ছেদ করাই নয়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণও জরুরি।
অন্যান্য নদীতেও একই প্রক্রিয়ায় দূষণ হচ্ছে। বাংলাদেশের নদীগুলো অসংখ্য খালবিল দ্বারা সংযুক্ত। এসব খালবিল দিয়েই পানি পৌঁছে যায় দেশের কোনায় কোনায়, মাটিকে করে উর্বর। অথচ এসব খালবিলের অধিকাংশই দখলে। কোথাও উন্নয়নের নামে বাঁধ দেওয়া হয়েছে, কোথাও বা অবৈধ দখল। ফলে এসব খালবিলের প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। শুকনা মৌসুমে পানির অভাবে খরা ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, অন্যদিকে বর্ষার মৌসুমে পানি সরে যাওয়ার জায়গা না পেয়ে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়।
আশার কথা হচ্ছে, স্বৈরাচার পতনের পর ক্ষমতা নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার নদী দখলমুক্ত করার উদ্যোগের কথা ব্যক্ত করেছে। নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন যে, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয় এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় ছাত্র-জনতাকে সঙ্গে নিয়ে দেশের নদ-নদীগুলোকে অবৈধ দখল ও দূষণমুক্ত করা হবে।
তবে, এ ধরনের উদ্যোগের কথা বহু বছর ধরেই কর্তাব্যক্তিরা বলে আসছেন। এগুলো কথার কথা হয়েই রয়েছে কোনো যথাযথ উদ্যোগ দীর্ঘসময়ের জন্য নেওয়া হয়নি, পরিস্থিতি বরং আরও খারাপ হয়েছে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবের কথা বলেন অনেকে। সেক্ষেত্রে, অন্তর্বর্তী সরকার ছাত্র-জনতাকে সঙ্গে নিয়ে সেই সদিচ্ছার প্রতিফলন দেখাতে পারবে আশা করি। কিন্তু নদীগুলো দখলমুক্ত করতে না পারলে তা বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দেখা দেবে।