মেয়েদের ফুটবল নিয়েই ‘বেশি আগ্রহ’ ছিল কাজী সালাউদ্দিনের

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি হিসেবে কাজী সালাউদ্দিনের ১৬ বছরের রাজত্বের অবসান ঘটল। ছিলেন বাংলাদেশের ফুটবলের মহানায়ক, কিন্তু বাফুফে সভাপতি হিসেবে নিজেকে তিনি খলনায়কে পরিণত করেন। দেশের ফুটবলকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেন। তাই বিদায়বেলায় তিনি স্রেফ নিন্দিত।

২০০৮ সালের ২৮ এপ্রিল সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ভোট যুদ্ধে নেমেছিলেন দেশের ক্রীড়াঙ্গনের প্রথম সুপারস্টার সালাউদ্দিন। ধুঁকতে থাকা ফুটবলকে নিজের ক্যারিশমায় জাগিয়ে তুলবেন, এমন আকাশচুম্বি প্রত্যাশায় ভোটাররা সালাউদ্দিনকে সভাপতি নির্বাচিত করেছিলেন। প্রথম মেয়াদের চারটি বছর প্রত্যাশা মেটাতে কাজ করেছেন সালাউদ্দিন। নিয়মিত হয়েছিল শীর্ষ লিগ।

ফুটবলাররা হাফ ছেড়ে বেঁচেছিলেন, দেখেছিলেন পেশাদার ফুটবল খেলে জীবিকা অর্জনের স্বপ্ন। ফুটবলপ্রেমীরাও সালাউদ্দিনের প্রথম চার বছরের কর্মকান্ডে স্বপ্ন ঘুড়িটা উড়িয়েছিল দূর আকাশে। মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থনে ২০১২ সালেও নির্বাচিত হন সভাপতি পদে। এরপর অবশ্য মোহভঙ্গ ঘটতে সময় লাগেনি। এরপরই সালাউদ্দিন বদলে ফেলেন নিজেকে। অগ্রাধিকারে এরপর আর ফুটবলের সত্যিকারের উন্নয়ন থাকেনি। বরং নিজের এবং ছায়াসঙ্গীদের চাওয়া-পাওয়া বড় হয়ে ওঠে তার কাছে।

ফুটবলকে সঠিক পথে রাখতে যা যা করা প্রয়োজন ছিল, তার বেশিরভাগটাই করতে পারেননি কিংবা বলতে পারেন করতে চানওনি। জাতীয় দল আর শীর্ষ লিগ নিয়েই পড়ে থেকেছেন। আর ভীষণ জোড় দিয়েছিলেন নারী ফুটবল উন্নয়নে। ফুটবলার উঠে আসার জমিনে পানি-সাড় কিছুই দেননি। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে গ্রাম-গঞ্জের ফুটবল। জেলাগুলো লম্বা ঘুমে চলে যায়। তাদের জাগানোর দায়িত্ব নিয়েও জাগাননি এক রহস্যময় কারণে।কাজী সালাউদ্দিন এবং মাহফুজা আক্তার কিরণ।

অথচ ফি নির্বাচনে জিততে কারি কারি টাকা ঢেলেছেন, কিনেছেন ভোট। আবার টাকায় যেটা সমাধান হয়নি, সেটা করতে ব্যবহার করেছেন সরকারীর বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে। এভাবেই দেখতে দেখতে চারবার সভাপতি পদ দখলে রেখেছেন। তারকাখ্যাতি ব্যবহার করে তিনি পারতেন দেশের ফুটবলে সোনা ফলাতে। শুরুর দিকে অনেক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এসেছিল ফুটবল সহায়তায়। কারি কারি টাকা দিয়েছে। তবে তাদের বিদায়গুলো হয়েছে হতাশায়।

কিরণকে তিনি পৌঁছে দেন ফিফা-এএফসির আঙিনায়। ছেলেদের ফুটবলকে অবহেলায় ঠেলে দিয়ে সালাউদ্দিন নারী ফুটবলে দেন জোর।

সিটিসেল, গ্রামীণফোন, প্রাইম ব্যাংক লিমিটেড, সাইফ পাওয়ারটেক, বসুন্ধরা গ্রুপের মতো পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ জলে যেতে দেখে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে বারবার। প্রতিষ্ঠানের মতো অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তিও একটা সময় সালাউদ্দিনের মোহে ফুটবলমূখী হয়েছিলেন। তাদের কাছ থেকেও সালাউদ্দিন নিয়েছেন কারি কারি টাকা, সুযোগ সুবিধা। তবে যখন মোহভঙ্গ ঘটেছে, অনেকেই আর সালাউদ্দিনমূখী হননি। আবার অনেককে প্রয়োজন শেষে নিজেই ছুঁড়ে ফেলেছেন সালাউদ্দিন।

ফিফা-এএফসির কাছ থেকে আসা বিপুল অর্থ ব্যবহারে কোন স্বচ্ছ্বতা ছিল না সালাউদ্দিনের ফুটবল প্রশাসনের। তার নাকের ডগায় দুর্নীতি, জালিয়াতি ও অনিয়মের রাজত্ব কায়েম করেন ফিফার নিষেধাজ্ঞা পাওয়া সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু নাইম সোহাগ। এছাড়া ‘কাছের মানুষ’ হিসেবে পরিচিত মাহফুজা আক্তার কিরণকে নানারকম বাড়তি সুযোগ সুবিধা দিয়ে গেছেন নির্লজ্জের মতো। তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়েন কিরণের উত্থানের সোপান তৈরিতে।

কিরণকে তিনি পৌঁছে দেন ফিফা-এএফসির আঙিনায়। ছেলেদের ফুটবলকে অবহেলায় ঠেলে দিয়ে সালাউদ্দিন নারী ফুটবলে দেন জোর। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে মেয়েদের সস্তা সব সাফল্য পুঁজি করে সালাউদ্দিন-কিরণ গং বারবার ছুটে গেছেন তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার কাছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বাহবা কুড়িয়ে এনেছেন। পাশাপাশি নিজের নানা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করেছেন রাষ্ট্রযন্ত্রকে।

অথচ ফুটবলের জন্য সুযোগ থাকা সত্যেও প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দ আনতে পারেননি বছরের পর বছর। এছাড়া সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন সময় থোক বরাদ্দ এনে সেগুলোর বেহিসাবী খরচ করেছেন। আবার সরকারকেই দাড় করিয়ে দিয়েছেন কাঠগড়ায়। সংবাদমাধ্যমকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেও ছাড়েননি। সংবাদকর্মীদের বাবা-মা নিয়েও মেতে উঠেছেন রঙ-তামাশায়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার ছিল নিবিড় সম্পর্ক। অথচ চার মেয়াদে সরকার প্রধানের কাছ থেকে ফুটবলের জন্য বিশেষ কিছুই আদায় করতে পারেননি। পারেননি ফুটবলের জন্য একটি স্টেডিয়াম বরাদ্দ নিতে।

জাতীয় দল নিয়ে অনেক পরিশ্রমের গল্প দিতেন সুযোগ পেলেই। অথচ জাতীয় দলকে শক্তিশালী করার দিকে ঝোঁক দেননি। ১৬ বছরে ২৩ জন কোচ বদলেছেন। তাতে দেশের ফুটবলের একটি সুনির্দিষ্ট ফুটবল স্টাইল গড়ে ওঠেনি। এ সব কিছু যোগফলে দেশের ফুটবল ও ফুটবলারদের মান কেবল নিচের দিকেই নেমেছে। র‌্যাংকিং গিয়ে পৌঁছেছে তলানীতে। তাতে উঠেছে সমালোচনার ঝড়। ফুটবল সমর্থকরা দিনের পর দিন সোশ্যাল মিডিয়ায় তীর্যক সমালোচনা করে গেছে সালাউদ্দিনের। এ সবে কিছুর তোয়াক্কা না করে একের পর এক বিতর্কিত কর্মকান্ড করে গেছেন। মিশেছেন, ফুটবল নিয়ে লুটপাটের সুযোগ করে দিয়েছে আস্থা ভাজনদের। এমনকি ফিফার নিষেধাজ্ঞা পাওয়া সোহাগের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রেখেছেন এখনও।