শক্তি প্রদর্শন নাকি নমনীয়তা

ইরানে ইসরায়েলের প্রতিশোধমূলক হামলার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। তেল আবিবের হামলায় খুব একটা ক্ষয়ক্ষতি না হলেও নিজেদের নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। ইরান বলেছে, আত্মরক্ষা করা তাদের অধিকার ও কর্তব্য। তাতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আরও বেড়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রসহ ইসরায়েলের মিত্র দেশগুলো দুই পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন করার আহ্বান জানিয়েছে। তবে ইরান নতুন করে পাল্টা হামলা চালালে চলমান এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন যুদ্ধ বিশ্লেষকরা।

গত শনিবার ইসরায়েলের হামলায় চার সেনা নিহত হওয়ার পর এই হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। হামলার পর ইরান জানিয়েছে, অবশ্যই তেল আবিবকে এর সমানুপাতিক জবাব দেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য তেহরানে ফের সংঘাতে না যেতে ইসরায়েলকে সতর্ক করেছে। ইসরায়েলের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, তিনি আশা করেন, এটাই শেষ হামলা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন উত্তেজনা এড়াতে সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন করতে আহ্বান জানিয়েছে। ইরানের প্রতিবেশীসহ অন্য দেশ ইসরায়েলের হামলার নিন্দা করেছে। আরব উপসাগরীয় দেশগুলোও নিন্দা জানিয়েছে ইসরায়েলের হামলায়। তবে ইরানে হামলা চালানোর পর ইসরায়েল নিজ দেশের সাধারণ মানুষের চলাচল নিয়ে এখনো নতুন করে কোনো নির্দেশনা জারি করেনি। আন্তর্জাতিক যুদ্ধ বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ইসরায়েল শিগগির ইরানের পাল্টা হামলার আশঙ্কা করছে না। আবার জানমাল ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি কম হওয়ায় ইরানও দ্রুততম সময়ের মধ্যে ইসরায়েলে হামলার পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে পারে। গত বৃহস্পতিবার ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীও তেমন ইঙ্গিত দিয়েছিল। এরই মধ্যে পাল্টা হামলা না চালাতে ইরানকে সতর্কবার্তা দিয়েছে ইসরায়েল।

এদিকে, ইসরায়েল ইরাকের আকাশসীমা ব্যবহার করে ইরানে হামলা চালিয়েছে অভিযোগ করেছে তেহরান। জাতিসংঘে ইরানের মিশন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক পোস্টে জানায়, ‘ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ইরাকের আকাশসীমা ব্যবহার করে প্রায় ৭০ মাইল দূরে ইরান সীমান্তের কাছাকাছি থেকে রাডার ও সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তু করেছে। এই আক্রমণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে। কারণ ইরাকি আকাশসীমা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক দখল, নিয়ন্ত্রণ ও কমান্ডের অধীনে রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণের সঙ্গে জড়িত থাকার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইরানে ইসরায়েলের প্রতিশোধমূলক হামলার পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে। জাতিসংঘে ইসরায়েলের মিশন জানিয়েছে, ইরানের আহ্বানে আজ সোমবার বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হবে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানো এক চিঠিতে ইরানে জাতিসংঘের স্থায়ী মিশন বলেছে, ইসরায়েলের এই কার্যকলাপ ইরানের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার গুরুতর লঙ্ঘন’। এটি আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের পরিপন্থি। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগকে হাস্যকর বলে অভিহিত করেছেন জাতিসংঘে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি দানন। তিনি বলেন, ইরান তার সহযোগী সংগঠনগুলোর পেছনে লুকাতে পারবে না। কারণ ইরান আমাদের হুমকি ও ক্ষতি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আর এর জন্য তাকে চড়ামূল্য দিতে হবে।

ইরানের তিনটি প্রদেশের কয়েকটি সামরিক স্থাপনায় তিন দফায় এই হামলা চালানো হয়। স্থানীয় সময় শনিবার গভীর রাত আড়াইটার দিকে ইরানের রাজধানী তেহরান, পার্শ্ববতী কারাজ ও পূর্বাঞ্চলের মাশহাদ শহরে অন্তত সাতটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এর পর থেকে সেখানে প্রায় চার ঘণ্টা হামলা চলতে থাকে। হামলার সঙ্গে সঙ্গে ইরান জুড়ে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা চালু করা হয়। ইসরায়েল অবশ্য ইরানের কোনো তেলক্ষেত্র বা পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়নি। এদিকে, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণ কর্মসূচির অংশ ছিল এমন একটি পরিত্যক্ত ভবনে ইসরায়েলি বিমান আঘাত হেনেছে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি পৃথকভাবে জাতিসংঘের সাবেক অস্ত্র পরিদর্শক ডেভিড অলব্রাইট ও ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক সিএনএর সহযোগী গবেষণা বিশ্লেষক ডেকার এভেলেথের কাছে পৌঁছায়। এসব ছবি বিশ্লেষণ করে ইরানের কোন কোন স্থাপনা ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা মূল্যায়ন করেন তারা।