বেনামে নিজেই ঠিকাদারি কাজ করেছেন সাবেক মেয়র খালেক

খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি তালুকদার আবদুল খালেক। ছিলেন খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) তিনবারের মেয়র। ক্ষমতাসীন দলের টানা মেয়র থাকার কারণে হয়ে ওঠেন দোর্দ- প্রতাপশালী। আচার-ব্যবহার ও কথায় চলে আসে চরম রূঢ়তা। কারণে-অকারণে মানুষের সঙ্গে করতেন দুর্ব্যবহার। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিতেন গালি। গালি শোনার ভয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তার কাছেই ভিড়তেন না। করপোরেশন চলত তার খেয়ালখুশিমতো। নিয়োগ ও পদোন্নতিতে নিয়মনীতির তোয়াক্কা করেননি। তবে বেশি অনিয়ম-দুর্নীতি করেছেন ঠিকাদারি কাজে। উন্নয়নকাজ ভাগবণ্টন, বেনামে নিজেই ঠিকাদারি কাজ করা, কমিশন-বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে তার বিরুদ্ধে। গড়েছেন অঢেল অর্থ-সম্পদও। তার ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাননি কেউ।

স্থানীয় সরকার আইন, ২০০৯ (সিটি করপোরেশন)-এর ধারা ৯(২) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি মেয়র বা কাউন্সিলর পদে নির্বাচিত হওয়ার অথবা মেয়র বা কাউন্সিলর পদে থাকার যোগ্য হবেন না, যদি তিনি বা তার পরিবারের কোনো সদস্য সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের কাজ সম্পাদন বা মালপত্র সরবরাহের জন্য ঠিকাদার হন। অথবা তারা এ ধরনের কাজে নিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অংশীদার হন বা সিটি করপোরেশনের কোনো বিষয়ে তাদের কোনো ধরনের আর্থিক স্বার্থ থাকে। অথচ অভিযোগ উঠেছে, এই আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ঠিকাদারি কাজই চালিয়ে গেছেন তালুকদার খালেক।

করপোরেশনের পূর্ত শাখায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৮ সালে কেসিসি মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর ২০১২ সালে প্রথমবার বয়রা কলেজের সামনে সড়ক উন্নয়নকাজ করেন। সেই কাজ দেখাশোনা করতেন তার ভাই জলিল তালুকদার। ২০১৮ সালে দ্বিতীয়বার ও ২০২৩ সালে তৃতীয়বার মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন খালেক। তার পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হোসেন ট্রেডার্স, আজাদ ইঞ্জিনিয়ার্স ও মেসার্স তাজুল ইসলাম, শহীদ এন্টারপ্রাইজ, জিয়াউল ট্রেডার্স, মাহাবুব ব্রাদার্স ও রোজা এন্টারপ্রাইজ নামের বিপুল পরিমাণ উন্নয়নকাজ দেন। এর মধ্যে গত চার বছরে শুধুই মেসার্স হোসেন ট্রেডার্সের লাইসেন্সে ৫৮ কোটি ৪২ লাখ টাকার ২০টি কাজ দেন তিনি।

করপোরেশনের সাধারণ ঠিকাদার ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, এসব লাইসেন্সে দেওয়া কাজের মধ্যে বেশিরভাগ কাজের ঠিকাদারি নিজেই করতেন তালুকদার আবদুল খালেক। মেসার্স হোসেন ট্রেডার্সের লাইসেন্সে বেশি কাজ করেছেন। মাত্র কয়েক বছরে লাইসেন্সগুলোর নামে বিপুল অঙ্কের টাকার কাজ করেছেন তিনি। যেসব কাজ ঠিকাদার এইচ এম সেলিম (সেলিম হুজুর) দেখাশোনা করতেন। এর বাইরে কমিশনের ভিত্তিতেও উন্নয়নকাজ বড় ঠিকাদারের কাছে বিক্রি করেছেন। আবার লাইসেন্স ছাড়াই পছন্দের ব্যক্তি, সাংবাদিক, আওয়ামী লীগ নেতা ও কাউন্সিলরদের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছেন কোটি কোটি টাকার কাজ। পরে এসব কাজ মোটা অঙ্কের পার্সেন্ট দিয়ে তাদের কাছ থেকে ঠিকাদারদের কিনতে হতো। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের খরচের কথা বলে চারটি বছর প্রতিটি কাজের বিলের ১ শতাংশ করে ঠিকাদারদের কাছ থেকে কেটে নেওয়া হয়েছে।

তারা আরও জানান, মেসার্স হোসেন ট্রেডার্স ছাড়াও এইচ এম সেলিম ওরফে সেলিম হুজুরের বেনামে সিটি করপোরেশনের আরও বেশ কিছু ঠিকাদারি লাইসেন্স রয়েছে। আত্মীয়-স্বজনের নামে করা এসব লাইসেন্সের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিতেন। আর এসব বড় কাজ সাবেক মেয়র তালুকদার খালেক নেপথ্যে থেকে সেলিমকে দিয়ে করাতেন। এ ছাড়া তসলিম উদ্দীন আশা সিন্ডিকেট নামের একটি চক্র ছিল কেসিসিতে ওপেন সিক্রেট। তসলিম উদ্দীন আশা সোনাডাঙ্গা থানা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক। সিন্ডিকেট করে কাজ বাগিয়ে নেওয়াই ছিল তার কাজ। আশার সিন্ডিকেটে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করতের খালেক। তবে যেসব প্রতিষ্ঠানের নামে সাবেক মেয়র কাজ করেছেন, সেসব বেশিরভাগ ঠিকাদারই এখন পলাতক রয়েছেন।

কেসিসি ঠিকাদারি কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মেসবাহুল আক্তার দেশ রূপান্তরকে জানান, মুষ্টিমেয় কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে সব কাজ দিতেন। ওইসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামেই কাজ করেন। তবে সিংহভাগ কাজ মেসার্স হোসেন ট্রেডার্সকে দেওয়া হতো। এই লাইসেন্সে বেশি কাজ করেছেন সাবেক মেয়র। অন্যদিকে কাজ না পেয়ে অনেক ঠিকাদার নিঃস্ব হয়ে গেছেন।

কেসিসি ঠিকাদার জাহিদ হাসান খসরু জানান, ইজিপির টেন্ডারে অংশ নিলেও তালুকদার আবদুল খালেকের নির্দিষ্ট ফার্মে টিক দেওয়া থাকত। তিনি বেনামে ঠিকাদারি কাজ করতেন। নির্দিষ্ট চার-পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের নামে কাজ করতেন, এটি সবাই জানে।

হলফনামার তথ্য বলছে, ১৫ থেকে ১৬ বছরে বহু গুণে বেড়েছে খালেকের সম্পদ। ২০০৮ সালের তথ্য অনুযায়ী, তালুকদার আবদুল খালেকের বার্ষিক আয় ছিল ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। তার কাছে নগদ টাকা ছিল ৫৭ হাজার ৫৫০। সম্পদ বলতে ছিল ব্যাংকে জমা ১৬ লাখ ৯৮ হাজার টাকা, সঞ্চয়পত্র ও স্থায়ী আমানতে ২৮ লাখ টাকা।

২০২৩ সালের হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, খালেকের আয় ২৮ লাখ ১৫ হাজার ৭০২ টাকা। তার কাছে নগদ টাকা আছে ৪ কোটি ৭৯ লাখ। চারটি ব্যাংকে তার জমা ১ কোটি ১৮ হাজার টাকা। এর বাইরে ৩ দশমিক ২১ একর কৃষিজমি, ৩ কাঠা অকৃষিজমি, রাজউকের পূর্বাচলে একটি, কেডিএর ময়ূরী আবাসিকে একটি, গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের মুজগুন্নি আবাসিকে প্লট রয়েছে। এ ছাড়া খুলনা নগরীর ২ নম্বর কাস্টমঘাট এলাকায় বছর দু-এক আগে সাড়ে ছয়তলা বাড়ি করেছেন। এর আগে তিনি খুলনায় ভাড়া থাকতেন। তবে ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি আত্মগোপনে। বিক্ষুব্ধ জনতা তার বাড়িটি ভাঙচুর করেছে।

এ ব্যাপারে কেসিসির প্রধান প্রকৌশলী মশিউজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইতিমধ্যে মেসার্স হোসেন ট্রেডার্সকে এক বছর ও জিয়াউল ট্রেডার্সকে ছয় মাসের জন্য কালো তালিকাভুক্ত এবং জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৫ থেকে ২০টি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানো নোটিস দেওয়া হয়েছে।

তবে শুধুই ঠিকাদারি কাজ ভাগবাটোয়ারা নয়; নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রেও নিয়মনীতির তোয়াক্কা করেননি সাবেক মেয়র খালেক। নিয়োগ-বাণিজ্য প্রসঙ্গে করপোরেশনের কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি উজ্জ্বল কুমার সাহা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মূলপদ নিম্নমান সহকারী। অথচ পছন্দের ও দলীয় লোকদের শাখায় শাখায় প্রধানের দায়িত্বে বসান। জন্মনিবন্ধন ও ভোটার আইডি কার্ডে ভুল তথ্য থাকলেও চতুর্থ শ্রেণির পদে চাকরি দেন তিনি। এ ছাড়া টাকার বিনিময়ে শর্তানুযায়ী সনদ ও অভিজ্ঞতা না থাকার পরও কঞ্জারভেন্সি ও ভেটেরিনারি শাখায় চার থেকে পাঁচজনকে চাকরি দেন তিনি।

করপোরেশনের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, কারণে-অকারণে সাবেক মেয়র কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গালি দিতেন। ফলে সবাই তাকে এড়িয়ে চলতেন। বাধ্য না হলে কেউ তার সামনে যেতেন না। যার কারণে শাখাগুলোর সমস্যার কথা মেয়রকে জানানো সম্ভব হতো না। এ ছাড়া লাইসেন্সসহ কয়েকটি শাখায় তদন্তে দুর্নীতি প্রমাণিত হলেও সে বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেননি। কেসিসি কর্মচারী ইউনিয়ন ও এমপ্লয়িজ ইউনিয়নে তিনি দীর্ঘদিন নির্বাচন হতে দেননি। এ দুটি ইউনিয়নের অর্থ আত্মসাতের বিষয়েও কোনো সমাধান করেননি, যা নিয়ে কর্মচারীরা বিরক্ত।

খুলনা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শফিকুল আলম মনা বলেন, সাধারণ মানুষ সিটি করপোরেশনে গেলে দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছে। প্রত্যেক পর্যায়ে দলীয়করণ করা হয়েছে। এমনকি ওয়ার্ড অফিসে গিয়েও সেবা পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে নগর ভবন থেকেই নিয়ন্ত্রণ করতেন বাগেরহাট-৩ (রামপাল ও মোংলা) আসন। কেসিসি মেয়র নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি বাগেরহাট-৩ আসনের সংসদ সদস্য এবং সাবেক ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। তিনি আসনটি ছেড়ে দেওয়ার পর সেখানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তার স্ত্রী হাবিবুন নাহার। নগর ভবনে বসেই দুই উপজেলার সব ঠিকাদারির কাজ বণ্টন, টিআর বরাদ্দ ও উন্নয়নকাজ বণ্টনের নির্দেশ দিতেন তিনি।

৫ আগস্টের পর সাবেক মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক আত্মগোপনে। তার মোবাইল ফোনের নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে। সে কারণে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তার ব্যবসায়িক অংশীদার (পার্টনার) মেসার্স হোসেন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী এইচ এম সেলিম ওরফে সেলিম হুজুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাবেক মেয়র খালেক মেসার্স হোসেন ট্রেডার্স ও শহীদ এন্টারপ্রাইজ (জেভি) লাইসেন্সে তিন থেকে চারটি কাজ ও আজাদ ইঞ্জিনিয়ার্সের লাইসেন্সে দুই থেকে তিনটি কাজ করেন। তিনি সেই কাজ দেখাশোনা করেছেন। এর বাইরে কোনো কাজ করেছেন কি না, তার জানা নেই। এ ছাড়া তার (সেলিম হুজুরের) সাত থেকে আটটি লাইসেন্স আছে। কিন্তু সেগুলো কম রেটে দিয়ে কাজ পান। মেয়রের কোনো হস্তক্ষেপ ছিল না।