ফ্যাসিবাদে নেই লেখকের মুক্তি

খক লিখতে বসলেন, তার মানেই তিনি পাঠকের স্বাধীনতা স্বীকার করে নিলেন। পাঠক বই খুলে ধরলেন, তার মানে তিনি লেখকের স্বাধীনতা স্বীকার করে নিলেন। যেদিক থেকেই দেখেন না কেন, শিল্পকর্ম মাত্রেই মানবসমাজের স্বাধীনতার আস্থার ঘোষণা। লেখকের মতোই পাঠকরাও এই স্বাধীনতা স্বীকারের সঙ্গে সঙ্গেই তার আত্মপ্রকাশ প্রত্যাশা করেন। তাই শিল্পকর্মের সংজ্ঞা দেওয়া যায়, মানবমুক্তি দাবি করে বলেই তা বিশ্বলোকের কাল্পনিক উপস্থাপনা। বিষাদাচ্ছন্ন সাহিত্য বলে কিছু নেই, কেননা, যত কালো রঙেই কোনো লেখক পৃথিবীকে আঁকুন না কেন, তার রঙ লাগাবার একটাই উদ্দেশ্য, যাতে স্বাধীন মানুষ সেই ছবির দিকে তাকিয়ে তাদের স্বাধীনতা উপলব্ধি করতে পারে। (জাঁ-পল সার্ত্র হোয়াট ইজ আর্ট, অনুবাদ, অজিষ্ণু ভট্টাচার্য, পরিচয় ৯০ বর্ষ পূর্তি উদযাপন-ফ্যাসিস্টবিরোধী সংকলন, সম্পাদনা দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, তরুণ স্যান্যাল, প্রথম প্রকাশ-২০২১)

এমন গভীর অনুধাবন আমাদের দেশে কোনো লেখক করেছে কি না আমার জানা নেই, যে ‘ফ্যাসিবাদে নেই লেখকের মুক্তি’। ফরাসি দেশের লেখক, দার্শনিক জাঁ-পল সার্ত্র তার ‘হোয়াট ইজ লিটারেচার’ ‘সাহিত্য কি’? নামে একটি প্রবন্ধে ফ্যাসিবাদের সমর্থক লেখকদের নিয়ে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যা তার ওই প্রবন্ধের উপসংহার হিসেবে প্রকাশিত হয়। শিরোনামটি আমি জাঁ-পল সার্ত্রের ‘হোয়াট ইজ লিটারেচার’ প্রবন্ধের শেষাংশের অনুবাদক অজিষ্ণু ভট্টাচার্য থেকে ধার করেছি।

আমাদের দেশে লেখক বলতে যাদের আমরা দেখি, জানি তাদের সঙ্গে কথা বলেই আমরা তাদের মনের অভিলাষ বুঝতে পারি। আর লেখা পড়লে বুঝতে পারি তাদের চিন্তার দৌড় কতদূর, তারা কোথায় যেতে চায় বা তারা জাতিকে কোথায় নিয়ে যেতে চায়। ফেসবুক আসার পর তাদের মনকে বুঝতে অনেক সুবিধা হয়েছে। নগ্ন মনের বা মনের নগ্ন প্রকাশ-উন্মোচন আমরা দেখেছি তাদের লেখায়, কথায়, বডির ভাষায়, বক্তৃতায়, আচরণে, অভিলাষে, রুচিতে। স্বাধীনতার পূর্বে যারা লিখেছে এবং স্বাধীনতার পরে যারা লিখেছে এসব বিশ্লেষণে গিয়ে কোনো লাভ নেই, গণমানুষ ও পৃথিবী বদলে যাওয়া বা প্রয়োজনের মুহূর্তে তারা নীরব থেকেছে, ফ্যাসিস্টদের পক্ষ নিয়ে নীরব থেকেছে। এই নীরবতা তাদের সারা জীবনের জন্য বোবা করে দিয়েছে। তারা আর লিখতে পারে না, তাদের লেখা আর কেউ নিতে পারে না। লেখক হিসেবে তাদের মৃত্যু ঘটেছে। ওই সব লেখকও বিবেকের তাড়নায় নিজের মনে নিজে চিৎকার করতে করতে প্রায় শেষ হয়ে যায়। কী লিখবে তারা, কীভাবে লিখবে, সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কার জন্য লিখবে।

আমি বাংলাদেশের পার্টিজান কবি সাহিত্যিক লেখক দেখক পুরস্কার প্রত্যাশী জনপ্রিয়গামী কবি সাহিত্যিকদের লেখক মনকে তাদের লেখায়, আচার-আচরণে, শারীরিক ভাষায়, লেখার ভাষায় দেখেছি, সেই দেখার মধ্যে এক ধরনের বিশেষত্ব আছে যে তারা পার্টিজান থেকে তাদের মনকে বের করতে পারে না। কেউ আওয়ামী লেখক কবি, কেউ বিএনপি লেখক কবি, কেউ জামায়াতী লেখক কবি, কেই বামপন্থি লেখক কবি ইত্যাদি। মোটা দাগে আমি এদের দেখে দেখে বড় হয়েছি, নিজেও লেখক কবি হতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু জাঁ-পল সার্ত্র এখানে যার উদাহরণ টেনেছি তাদের মতো মানুষের কবি, পৃথিবীর কবি বা মানবমুক্তির জন্য কেউ লেখেনি। ওই চিন্তার ধারে-কাছেও তারা পৌঁছাতে পারেনি। ওই গভীর বোধ, প্রজ্ঞা, অনুভূতি তাদের নেই। প্রগতি বলতে মুক্তিযুদ্বের চেতনা ১৯৭১ সালের বেহাত বিপ্লবে আটকে আছে অনেক বড় বড় লেখক। প্রগতি মানে অনেকের কাছে আওয়ামী লীগ করা। প্রগতি ও প্রতিক্রিয়াশীলতার মধ্যে তারা পার্থক্যই করতে পারেনি। একটি দেশের জাতীয় লেখক কবিবৃন্দ যদি এই মানের চিন্তাশীল হয়, সে দেশের রাষ্ট্রীয় চিন্তা কতদূর এগোবে, সে দেশের রাষ্ট্রীয় চিন্তা কতটা প্রগতিশীল হবে বুঝতেই পারছেন। আমাদের এখন বিশ্লেষণের সময় এসেছে, সংশ্লেষণে আমাদের যেতে হবে। ফরাসি লেখক এমিলি জোলার ভাষায়, ‘আমরা এ পর্যন্ত শুধু বিশ্লেষণ পেয়েছি, সংশ্লেষের জন্য আরও পথ যেতে হবে। মধ্যস্থতা করা বিধায়কের কাজ; এ সম্পর্কে ভাবতে দিন এবং সবকিছু সঠিকতায় স্থাপন করতে দিন। এ নিয়ে আমার করার কিছু নেই। বর্তমান ব্যবস্থার খুঁটিনাটি তদন্ত হওয়া উচিত ভবিষ্যৎ বিকাশের দৃষ্টি রেখে। আগামী দিনের শক্তির মধ্যে সব প্রত্যাশা নিহিত আছে। আর সেই শক্তি জনগণের সঙ্গেই রয়েছে।’ (এমিলি জোলা, নেসেসিটি অব আর্ট, অনুবাদ শফিক রহমান, সংঘ প্রকাশন।)

জগতের ভাঙনের মধ্য দিয়ে মানুষের হৃদয় ভাঙার যে জোয়ার শুরু হলো, রক্ত ও আগুনের নদী বেয়ে, সামন্তকালের তলোয়ারের যুগ শেষ হয়ে; মানুষ যখন বন্দুকের যুগে প্রবেশ করল তখন পৃথিবীর সমস্ত নৈতিকতা পুড়ে গেল বারুদে। বারুদ হয়ে উঠল মানুষের শক্তি প্রকাশের সর্বশেষ অস্ত্র। লক্ষ্য করার বিষয় এই, সে সময় থেকে আজ পর্যন্ত শিল্পীরা তাদের মনোভুবনকে সুকুমার সৌন্দর্যে মানুষের মুক্তির জন্য উৎসর্গ করেছেন।  সেই বুর্জোয়া ভাবাবেগের  শিল্পী হোক বা মানুষের মুক্তির জন্য হৃদয় ভেঙেচুরে কষ্টের দহনে পুড়ে যাওয়া শিল্পীই হোক। কিন্তু প্রশ্ন জাগে তখন, যখন কোনো শিল্পী বুর্জোয়া মুনাফার মধ্যস্বত্বভোগী হয়ে তার ফ্যাসিস্ট কর্মের নিলজ্জ প্রচারক হয়ে ওঠেন।

“১৬৪১ খ্রিস্টাব্দে থেকে শুরু করে অর্ধশতাব্দী কালব্যাপী ইংল্যান্ড ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা ঘটনাবহুল এবং সংকটগুলো অতিক্রম করেছে। এই কাল দুটি বিপ্লব চিহ্নিত প্রথমটি একটি রক্তাক্ত বিপ্লব, ‘পিউরিটান বিপ্লব’ ১৬৪১ খ্রিস্টাব্দ। অন্যটি ১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দের ‘রক্তপাতহীন বিপ্লব’ বা গৌরবময় বিপ্লব। প্রথম বিপ্লবটি, যা রাজা প্রথম চার্লস এবং পার্লামেন্টের মধ্যে একসার সংগ্রাম, অন্তিমে রাজার মৃত্যু এবং এক দশকের সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। দ্বিতীয় বিপ্লব অবশ্য রাজাকে শারীরিক দিক থেকে কোনো আঘাত না করলেও তার শক্তি এবং মর্যাদায় চরম আঘাত হানে। আপাতদৃষ্টিতে এই দুই বিপ্লবের মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও উভয়ের মধ্যে অবশ্যই একটি লজিক্যাল যোগসূত্র ছিল। কেননা, একটির মধ্যে ইংরেজ বুর্জোয়াদের অতি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রনীতিক বিজয়ের সূচনা, অন্যটিতে তার সমাপ্তি। প্রতীচীর রাষ্ট্রচিন্তার মানুষের নিকট, এই বিপ্লব দুটির তাৎপর্য অপরিসীম, কারণ সপ্তদশ শতকের কয়েকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র-নীতির ভাবধারার (ইংরেজি) ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত এদের মাধ্যমেই পাওয়া যায়।” (পাশ্চাত্য রাষ্ট্রচিন্তার ধারা, প্লেটো থেকে মার্ক্স-অমল কুমার মুখোপাধ্যায়-পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ-জুলাই ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দ)। 

“পশ্চিম ধনতন্ত্র যে স্বীয় অভ্যন্তরে প্রবল দ্বন্দ্বের জন্ম দিয়েছে, এ তথ্য বেশি দিন গোপন রাখতে পারেনি। এ কথা সত্য, প্রতীচ্যের অনেক বুর্জোয়া মনীষী তাদের অতি সমৃদ্ধ বৌদ্ধিক ঐশ্বর্যকে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিকশিত করার কাজে লাগিয়েছেন। কিন্তু তথ্য যেহেতু সবসময় তত্ত্বের চেয়ে শক্তিশালী সে জন্য ধনতন্ত্রের প্রবক্তা বা সমর্থকবৃন্দ, তার সমালোচকদের চিরকাল কোণঠাসা করে রাখতে পারেননি। তাই জেএস মিল বা টি-এইচ গ্রিন যখন, ধনতান্ত্রিক সমাজকে সুরভিত করার প্রয়াসে রত, তার আগেই পশ্চিমে-বিশেষত, ইংল্যান্ডে এবং ফ্রান্সে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির এক বৌদ্ধিক আন্দোলন শুরু হয়েছে। কেউ কেউ ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভয়াবহ দিকগুলো পরিস্ফুট করে দেখার পথ বেছে নিলেন। যন্ত্রণাকাতর শ্রমিক শ্রেণির প্রতি তাদের নথিবদ্ধ করার পদ্ধতি নির্বাচন করলেন কেউ কেউ। কিন্তু ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাবার সাহস অথবা ওই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি তাত্ত্বিক যুক্তি যাতে বুর্জোয়া ব্যবস্থা, শুভ, যুক্তিসিদ্ধ এবং চিরস্থায়ী বুর্জোয়া চিন্তককুল সৃষ্ট এই ‘মিথ’ বিস্ফোরণে ভেঙে পড়তে পারে  কারও জানা ছিল না। শেষ পর্যন্ত, কার্ল মার্ক্স (১৮১৮-১৮৮৩) এই চ্যালেঞ্জ জানালেন। ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার সমালোচনা করেও, এর মৌল বিষয়কে গ্রহণ করার যে চলতি ঐতিহ্য ছিল মার্ক্স সেই ধারা ভঙ্গ করলেন। ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা সম্পর্কে তার কোনো প্রকার মোহ ছিল না। এটা এমন এক ধরনের সমাজব্যবস্থা, যার মৃত্যু হবে, এবং তার ধ্বংসাবশেষের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার আবির্ভাব অনিবার্য, এই কথা বলে তিনি ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে বর্জন করলেন। এভাবে মার্ক্সের চিন্তাভাবনার মধ্যে পশ্চিমের ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা অপ্রত্যাশিতভাবে, এই প্রথম তার ভীষণ প্রতিদ্বন্দ্বীর সম্মুখীন হলো” (দুর্গের পতন ১০, কার্ল মার্ক্স-অমল কুমার মুখোপাধ্যায়-পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ-জুলাই ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দ)।

আমাদের দেশেও ভাঙন শুরু হয়েছে। জেগে উঠেছে জনতা।  যে ভাঙন, অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এ দেশ একটি অবস্থানে গিয়ে পৌঁছাবে। সার্ত্র বলেন, ‘এক একটা সময় আসে যখন কলমকে জোর করে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়, তখন লেখককে অস্ত্র তুলে নিতে হয়। তখন যে পথেই আপনি এসে পৌঁছান না কেন? যে মতামতই আপনি ধারণ করে থাকুন না কেন, সাহিত্য আপনাকে লড়াইয়ের মাঝখানে এনে ফেলবে। লেখা বলতে একভাবে স্বাধীনতা চাওয়া। একবার শুরু করলেই, চান বা না চান, আপনি জড়িয়ে পড়েছেন।’ 