২০০৩ সালে প্রথম সাফ শিরোপা ঘরে তুলেছিল বাংলাদেশের ছেলেরা। শিরোপা ধরে রাখার সুযোগ এসেছিল ২০০৫ সালে। করাচিতে অসাধারণ ফুটবলে তারা পৌঁছে গিয়েছিল ফাইনালে। তবে ফাইনালে ভারতের কাছে হেরে হারাতে হয় শ্রেষ্ঠত্ব। সেই যে শিরোপা হাতছাড়া হলো আর তার দেখা মেলেনি দুই দশকেও। আর এখানেই ছেলেদের পেছনে ফেললেন বাংলাদেশের মেয়েরা। ২০২২ সালে নারী সাফের শিরোপা ঘরে তুলেছিল সাবিনা খাতুনের দল। সেবার শিরোপা নিয়ে নিন্দুকদের অনেকেই এটাকে ফ্লুক দাবি করেছিলেন। ‘তালেগোলে জিতে গেছে’, ‘আর জিততে পারবে না’ এ রকম কথাও বলতে শোনা গেছে আশপাশের দেশগুলোর অনেককে। নারী ফুটবল নিয়ে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের অদূরদর্শিতায় সেই কথাগুলোই অনেকে সত্য বলে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন। তবে সাবিনাদের ভাবনাটা ছিল ভিন্ন। প্রস্তুতিতে ঘাটতি ছিল। দলের ভেতরে ছিল নানা বিতর্ক। ব্রিটিশ কোচ পিটার জেমস বাটলারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন দলের ফুটবলাররা। তবে সব বিতর্ক এক পাশে রেখে মেয়েরা পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে খেলেছে অন্য ব্র্যান্ডের ফুটবল। যা তাদের ফের বসিয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার সেরার আসনে। এটা কেবল একটা শিরোপাই নয়, এর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হলো, দক্ষিণ এশিয়ার সত্যিকারের সেরা বাংলাদেশ।
২০২২ সালে প্রথম বিজয়টা সব সময়ই স্পেশাল। তবে এবারের সাফল্যকে কোনোভাবেই তার চেয়ে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়ে মুকুট ধরে রাখতে হয়েছে সাবিনাদের। দু’বছর আগে শিরোপা জিতে আসার পর এই মেয়েদের বীরোচিত সংবর্ধনা দিয়েছিল জাতি। বিমানবন্দর থেকে তাদের ফুটবল ভবনে আনা হয়েছিল ছাদখোলা বাসে চড়িয়ে। লাখো মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল তাদের অভিবাদন জানাতে। এরপর থেকে শুরু হয় সংবর্ধনার মিছিল। তবে মধুচন্দ্রিমার রেশটা কাটতে সময় লাগেনি। এই মেয়েদের আরও বড় স্বপ্নের জন্য তৈরি করতে যে পরিকল্পনা নিতে হতো, তা নেয়নি বাফুফে। সাফ জিতে আসার পর টানা ৯ মাস তারা একটিও আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে পারেনি। সুযোগ ছিল অলিম্পিক বাছাইয়ে খেলার। অর্থ সংকটের অজুহাতে তাদের বাছাইপর্ব খেলতে পাঠায়নি বাফুফে। এর জন্য সরকারকেও দায়ী করে সমালোচনা উগড়ে দিয়েছিলেন তৎকালীন বাফুফে বস কাজী সালাউদ্দিন।
আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ হচ্ছে না। ঘরোয়া ফুটবল হয়ে পড়ে অনিয়মিত। হতাশায় অনেক মেয়ে খেলা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। যা দেখে এই মেয়েদের কোচ গোলাম রব্বানী ছোটনও ক্ষোভে, বঞ্চনায় ছাড়েন দায়িত্ব। এর পর থেকেই কোচ দিয়ে দলের ফুটবলাররা থেকেছেন অনিশ্চয়তায়। কিছুদিন সাইফুল বারী টিটুর অধীনে কখনো-বা অ্যাকাডেমির ভাড়াটে কোচ বাটলারের অধীনে চলেছে ট্রেনিং। এর মধ্যে বেতন বাড়ানো নিয়েও তাদের নামতে হয়েছিল আন্দোলনে। বেতন বাড়ানো হয়েছে ঠিক, তবে সেটা তারা পান না নিয়মিত। তার ওপর বাটলার এসে সিনিয়র বেশ ক’জনকে ছেঁটে ফেলার জোর চেষ্টা করেন। দলের ভেতরের ঐক্যে ফাটল ধরান। তাতে শুরু হয় কোচের সঙ্গে মতানৈক্য। এর মধ্যে সাফকে সামনে রেখে একটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার সুযোগ পাননি সাবিনারা।
টুর্নামেন্ট শুরু হলে কোচ-খেলোয়াড় বিরোধটা প্রকট আকার ধারণ করে এবং এক পর্যায়ে কোচকে বাধ্য করা হয় সিনিয়রে আস্থা রাখতে। যেটা ছিল ফুটবলারদের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যর্থ হলেই তাদের দাঁড়াতে হবে কাঠগড়ায়। বাটলার তাদের কথা মেনে নিলেও নানা রকম কটূক্তি করে গেছেন নিয়মিত। সে সব বিতর্ক পেছনে ফেলে মেয়েরা মাঠে দেখিয়েছেন অবিশ্বাস্য আত্মবশ্বাসের পরিচয়। গ্রুপপর্বে প্রথমে ভারতকে হারায়। এরপর সেমিতে ভুটানকে উড়িয়ে দেয়। এরপর বুধবারের ফাইনালে হাজারো নেপালির সামনে নার্ভ ধরে রেখে আরেকবার ইতিহাস গড়ে। নিন্দুকেরা নিশ্চয়ই এখন আর ২০২২ সালের সাফল্যকে অঘটন বলবেন না। বরং ভারতের শ্রেষ্ঠত্ব খর্ব করে এখন বাংলাদেশই দক্ষিণ এশিয়ার সেরা।