ট্রাম্প কি আসলেই ফ্যাসিস্ট?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে ততই জমে উঠছে ভোটের মাঠ। একে অপরের দিকে সমালোচনার তীর ছুঁড়ছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা হ্যারিস ও রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প। সম্প্রতি ট্রাম্পকে ফ্যাসিস্ট বলে অভিহিত করেন কমলা। 

‘ফ্যাসিজম’ বা ‘ফ্যাসিবাদ’ ধারণাটির উৎপত্তি হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে ইতালিতে। এরপর এই মতবাদ ছড়িয়ে পড়ে জার্মানি এবং ইউরোপের আরো নানা দেশে। জার্মানিতে হিটলারের নেতৃত্বে ‘নাৎসিজম’ বা ‘নাৎসিবাদ’ – এর উত্থান হয়। এটি ছিল ‘ফ্যাসিজম’ এর একটি রূপ। ‘ফ্যাসিবাদ’ উত্থানের মধ্য দিয়ে ইউরোপে হিটলার ও মুসোলিনির মতো বিতর্কিত নেতার উদ্ভব হয়। ইউরোপের প্রথম ফ্যাসিস্ট নেতা ছিলেন ইটালির বেনিতো মুসোলিনি।

ফ্যাসিস্টরা চায় রাষ্ট্র ক্ষমতায় একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ন্ত্রণ। যেমন হিটলার ক্ষমতা নেবার পর শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতাই নিয়ন্ত্রণ করতে চাননি, এর পাশাপাশি তিনি রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও কর্তৃত্ব স্থাপন করেছিলেন। এসব প্রতিষ্ঠান একসময় স্বাধীন হিসেবে বিবেচিত হতো। যেমন – চার্চ, আদালত, বিশ্ববিদ্যালয়, সামাজিক ক্লাব, খেলাধুলার প্রতিষ্ঠান – সবকিছুতেই নিজের কর্তৃত্ব স্থাপন করেছিলেন হিটলার।

ফ্যাসিস্ট দলগুলোর আরেকটি বৈশিষ্ট্য জনসমাবেশ করে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করা করা। এর মাধ্যমে তারা দেখাতে চাই যে জনগণ তাদের পাশে আছে। সেজন্য তারা প্রায়শই বড় আকারের জনসমাবেশ, প্যারেড আয়োজন করে।

ফ্যাসিস্ট দলগুলো সবসময় এক ব্যক্তির সর্বময় কর্তৃত্ব ও শাসনে বিশ্বাস করে। তারা মনে করে যে রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং রাষ্ট্রের প্রধান একই ব্যক্তি থাকবেন, যার হাতে সর্বময় ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব থাকবে। ফ্যাসিস্টরা সবসময় তাদের সমালোচনার জবাব দিতেন শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে। দেশে যে কোন ধরণের সমস্যার জন্য ফ্যাসিস্টরা অন্যের ওপর দোষ চাপাতে পছন্দ করেন। এজন্য তারা কাউকে না কাউকে বলির পাঠা বানান। 

সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক চিফ অব স্টাফ জন কেলি নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে  ট্রাম্পকে ‘ফ্যাসিস্ট’-এর সঙ্গে তুলনা করেন। নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের সময দীর্ঘদিন ধরে চিফ অফ আর্মি স্টাফের পদে থাকা জন কেলি বলেছেন, ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট থাকার সময় হিটলারের খোলাখুলি প্রশংসা করতেন। তিনি বলতেন, হিটলার অনেক ভালো কাজও করেছেন। হিটলারের যেমন সেনানায়ক ছিল, তেমনই সেনানায়ক দরকার বলে তিনি মনে করতেন।

কেলিকে উদ্ধৃত করে ডেমোক্রেটিক পার্টির কমলা হ্যারিস ট্রাম্পকে 'মানসিক ভারসাম্যহীন ও অস্থির' বলে অভিহিত করেছেন। কমলা হ্যারিস জন কেলিকে উদ্ধৃত করে আরও বলেন, সাবেক এই প্রেসিডেন্টের আচরণ ফ্যাসিস্টের সাধারণ সংজ্ঞার সঙ্গে খাপ খায়। তিনি আরও বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের হিটলারপ্রীতি আছে। কারণ ট্রাম্প 'একচেটিয়া ক্ষমতা' চেয়েছিলেন।

কিন্তু ইতিহাসবিখ্যাত রাজনৈতিক ভাষ্যকাররা ট্রাম্পের ফ্যাসিবাদের বিষয়টি নিয়ে এতটা নিশ্চিত নন। দ্য গার্ডিয়ানের কলাম লেখক সিডনি ব্লুমেনথাল ট্রাম্পকে "হিটলারিয়ান" এবং তার সমাবেশকে "নাজিস্ক" বলে অভিহিত করেছেন, কিন্তু তাকে ফ্যাসিবাদী বলা থেকে বিরত থাকেন।

দ্য নিউ রিপাবলিকের মাইকেল টোমাস্কি জানান, তিনি "ফ্যাসিস্ট" এবং কেবল "ফ্যাসিবাদী" এর মধ্যে পার্থক্য নিয়ে বিতর্ক করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। তিনি বলেন, আমি গত ছয় বছর আমেরিকায় ডানপন্থী, কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে গবেষণা করেছি। আমি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতে পারি যে এই ধরনের লেবেলগুলো কীভাবে ভুল হতে পারে। 

ডেমোক্রেটিক গ্রুপ থার্ড ওয়ে’র পলিটিক্যাল স্ট্র্যাটেজিস্ট ম্যাট বেনেটের মতে, কমলা হ্যারিস কেন জন কেলির বক্তব্যকে ধরে মন্তব্য করেছেন, সে বিষয়টি স্পষ্ট। তিনি এখন যা করছেন, তা কৌশলগত। তার এটা নিশ্চিত করা দরকার ছিল যে, জন কেলি যা বলেছেন, ভোটাররা যেন তা জানতে পারেন, এবং সে অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্টের এই সর্বশেষ মন্তব্যটিকে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা প্রচারণা কৌশলও বলা যেতে পারে, যাতে করে দ্বিধাদ্বন্দে থাকা রিপাবলিকানের সমর্থকরা ডেমোক্রেটিক প্রার্থীকে ভোট দেয়।

নির্বাচনকে নিয়ে করা বিভিন্ন জরিপে এটাই দেখা যাচ্ছে যে এবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বেশ হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে যাচ্ছে। দেশটির বড় বড় শহরগুলোর আশেপাশে ফিলাডেলফিয়া, ডেট্রয়েট, ফিনিক্সের মতো ছোট শহর আছে। সেসব শহরতলীতে শিক্ষিত কর্মজীবীদের বসবাস। তারা বরাবরই রিপাবলিকানের পক্ষে ভোট দিয়েছে। কিন্তু এবার জরিপগুলো থেকে সেসব স্থানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার ঘাটতি টের পাওয়া যায়।

বেনেট বলেন, অসন্তুষ্ট রিপাবলিকানদেরকে বিশেষ করে যারা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভোট দেবেন কী দেবেন না - তা নিয়ে সংশয়ে আছেন, কমলা হ্যারিস এই ব্ক্তব্যের মাধ্যমে তাদেরকে দলে টানতে চাইছেন।

নেব্রাস্কার ডেভিন ডেভেলাসকো নামে একজন, যিনি বরাবরই ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে কাজ করেছিলেন। কিন্তু এখন তিনি বলছেন যে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পদে অযোগ্য। যদিও তিনি মনে করেন, কিছু রিপাবলিকান আছে, যারা তার মতো কমলা হ্যারিসকে সমর্থন দেবেন। তবে, তিনি এও বলেন যে সাবেক প্রেসিডেন্ট সম্বন্ধে করা দাবিগুলো একঘেয়ে।

রিপাবলিকান স্ট্র্যাটেজিস্ট ডেনিস গ্রেস গিটশাম বলেন, ভোটাররা ২০১৬ সাল থেকে ট্রাম্প সম্পর্কে একই ধরনের বক্তব্য শুনে আসছেন। তাই, মোড় ঘোরাতে হলে নতুন কোনও বিতর্ক লাগবে।

তবে ট্রাম্প যদি নির্বাচিত হন তবে, তিনি "ডিপ স্টেট (ডিপ স্টেট হলো এক প্রকারের সরকার যা ক্ষমতার সম্ভাব্য গোপন ও অননুমোদিত নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে গঠিত হয় যা একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্বের নিজস্ব এজেন্ডা এবং লক্ষ্য অর্জনের জন্য স্বাধীনভাবে কাজ করে) চূর্ণ করার" প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, ট্রাম্প নির্বাচিত হলে হাজার হাজার অরাজনৈতিক সিভিল সার্ভিস কর্মচারীকে সরানোর হুমকি দিয়েছেন যারা অতীতে তার বিরোধীতা করেছিল।

ট্রাম্প তার প্রায় পুরো রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে একটি নতুন কর্তৃত্ববাদী পথ অনুসরণ করছেন। কর্তৃত্ববাদী শাসনের ভিত্তি স্থাপনের জন্য তিনি তিনটি পদক্ষেপ নিচ্ছেন। এগুলো হলো- নির্বাচনী অখণ্ডতা ক্ষুণ্ন করা, আইন ও বিচার বিভাগকে দুর্বল করা এবং তার শত্রুদের আক্রমণ করা। ট্রাম্পের এসব উদ্যোগ অনেক ক্ষেত্রেই ফ্যাসিজমকে অনুসরণ করে।

সূত্র: বিবিসি ও এনডিটিভি।