বলটা বাঁক খেয়ে গোল হয়ে যাবে ভাবিনি

রাঙ্গামাটির দুর্গম গ্রাম মঘছড়ির অতি দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা পাহাড়িকন্যা ঋতুপর্ণা চাকমা এখন দক্ষিণ এশিয়ার সেরার আসনে। সদ্যসমাপ্ত সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে এই স্বীকৃতি অর্জন করে নিজেই বিস্ময়ে আত্মহারা ২১ বছরের এই উইঙ্গার। খেলার পাশাপাশি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থীর স্বপ্ন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার। কারও করুণায় নয়, ফুটবলের ফুল ফুটিয়ে, সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েই তিনি সাফল্যের চূড়া ছুঁতে চান। দীর্ঘ আড্ডায় জানা-অজানা অনেক কথাই বলেছেন দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দ -এর সঙ্গে আপনাকে অনেক অনেক অভিনন্দন দেশকে এত বড় অর্জন এনে দেওয়ার জন্য, আমাদেরকে আনন্দিত করার জন্য।

ঋতুপর্ণা চাকমা : আমি একা কিছুই এনে দিতে পারিনি। আমরা সবাই মিলেই দেশকে দ্বিতীয়বারের মতো সাফ চ্যাম্পিয়ন করিয়েছি। তাছাড়া দেশবাসীর আশীর্বাদ না থাকলে আমরা হয়তো সাফল্য পেতাম না।

এ বছরই আপনাকে সিনিয়র জাতীয় দলের শুরুর একাদশে নিয়মিত দেখা যাচ্ছে। আগে তো বেশিরভাগ ম্যাচেই বদলি হিসেবে খেলতেন। নিজের এই উন্নতির রহস্যটা কী?

ঋতু : আমি যেই পজিশনে খেলি (উইঙ্গার) সেখানে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়। কারণ আমাদের যেমন আক্রমণ রচনা করতে ওপরে উঠতে হয়, আবার বল হারালে বা প্রতিপক্ষ আক্রমণে গেলে ডিফেন্ডিংও করতে হয়। গেল কয়েক বছরে নিজেকে জাতীয় দলে প্রতিষ্ঠিত করতে কঠোর পরিশ্রম করেছি। তবে এটা মাত্র শুরু। আমাকে অনেক দূর যেতে হবে। তার জন্য শেখার যেমন কোনো শেষ নেইÑ আবার পরিশ্রমেরও বিকল্প নেই। আর কৃষ্ণাদির (কৃষ্ণারানী সরকার) চোটের একটা ভূমিকা আছে একাদশে নিয়মিত হওয়ার পেছনে।

এ মুহূর্তে দেশসেরা লেফট উইঙ্গার আপনি। সাফে অসামান্য পারফরম্যান্সের পর তো আপনি আলোচনার তুঙ্গে

ঋতু : যখন একাদশে অনিয়মিত ছিলাম, বদলি হয়ে নামতাম, তখন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম একবার সুযোগ পেলে সেটা কাজে লাগানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। সাফের আগের চারটি ম্যাচে চেষ্টা করেছি। তাই সাফেও শুরু থেকে খেলার সুযোগ পেয়েছি।

তাই বলে কি ভেবেছিলেন সাফের সেরা খেলোয়াড় হবেন?

ঋতু : আসলে আমি সেরা হওয়ার কথা কল্পনাও করিনি। উইঙ্গার হিসেবে আমার দায়িত্ব ছিল আক্রমণে ওঠা, সুযোগ পেলে পোস্টে শট নেওয়া এবং সতীর্থদের জন্য ক্রস ফেলা। সেই দায়িত্বটাই পূরণ করতে করতে কী করে যেন সেরা হয়ে গেলাম। আসলে ফাইনালের গোলটাই আমাকে অনেকটা এগিয়ে দিয়েছে হয়তো।

সেই গোলের প্রসঙ্গে আসি। খুব দুরূহ কোণ থেকে কী অসাধারণ গোলটাই করলেন!

ঋতু : আগেই বলেছি আমার দায়িত্ব ছিল সুযোগ পেলে শট নেওয়া অথবা ক্রস করা। গোলের কয়েক মিনিট আগে একটা ভালো ক্রস ফেলেছিলাম। তবে শামসুন্নাহার জুনিয়র সেটা কানেক্ট করতে পারেনি। আমি তখনই ভেবেছিলাম, সুযোগ পেলে এ রকম আরেকটি ক্রস ফেলব। তবে শামসুন্নাহার সিনিয়রের থ্রোয়িংটা যখন পেয়ে আলতো করে আয়ত্তে নিলাম তখন মনে হলো দেখি না পোস্টে রাখা যায় কি না। তাই ডিফেন্ডারদের সুযোগ না দিয়ে একটু পাওয়ার শট নিলাম। বলটা একটু বাঁক খেয়ে যে দূরের পোস্ট দিয়ে গোল হয়ে যাবে, তা কিন্তু ভাবিনি।

গোলের পর তো পুরো দশরথ স্টেডিয়ামকে নিস্তব্ধ করে দিয়েছিলেন। গোলের উদযাপনের পেছনের গল্পটা কী?

ঋতু : নেপালি দর্শকরা সারাক্ষণ তাদের দলকে সমর্থন জানায়। তাই ঠিক করেছিলাম, ফাইনালে গোল করে নেপালের দর্শকদের একেবারে চুপ করিয়ে দেব। ম্যাচের শেষ সময়ে যখন গোলটা করে ফেললাম, তখনই সেই ভাবনাটা মাথায় এলো, তাই গ্যালারির দিকে ঘুরে আঙুল দিয়ে ঠোট চেপে ধরলাম। সেই গোলে আসলেই কিন্তু গ্যালারি থমকে গিয়েছিল একেবারে।

পুরো আসরটাই ঘটনাবহুল। শুরুটা ভালো হয়নি। এরপর অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়ানোটা কীভাবে সম্ভব হলো?

ঋতু : আমাদের দলের সাফল্যের পেছনে সবাই একতাবদ্ধ থাকাটা দারুণ কাজ করেছে।। সুদৃঢ় বন্ধনেই আমরা নিজেদের উজাড় করে খেলতে পেরেছি। পাকিস্তানের বিপক্ষে কোনোমতে হার এড়ানোর পর অনেকেই অনেক সমালোচনা করেন। সমালোচনাগুলো আমাদের অনেক বেশি শক্তি জুগিয়েছে, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করেছে। দলের অভ্যন্তরে কিছু ঘটনাও আমাদের আরও বেশি একতাবদ্ধ করে তোলে। আমরা নিজেদের মধ্যে অনেক কথা বলি। এরপর যখন ভারতকে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হই, তখন বিশ্বাসটা জোরালো হয় যে, চেষ্টা করলে এবারও আমরা চ্যাম্পিয়ন হতে পারব। এরপর ভুটানকে হারিয়ে ফাইনালে আসা। আর স্বপ্নের মতো ফাইনালটা জিতে নেওয়া। তবে এর পেছনে আমাদের আছে অনেক পরিশ্রম, অনেক আত্মত্যাগের গল্প।

আপনার গল্পটাই না হয় শুনি। ফুটবলে শুরুর গল্প, এরপর দেখতে দেখতে নারী ফুটবলের বড় বিজ্ঞাপন হয়ে ওঠা

ঋতু : আমি রাঙ্গামাটির প্রত্যন্ত গ্রাম মঘাছড়ির এক আদিবাসী পরিবারের সন্তান। আমার বাবা ছিলেন কৃষিজীবী। কখনো দিনমজুরি করেও সংসার চালাতেন। ২০১১ সালে দেশব্যাপী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো নিয়ে ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরু হয়। যেই আসরে আমাদের মঘাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় অংশ নেয় এবং জাতীয় পর্যায়ে সেরা হয়। পরের বছর আমার বাবা বরজ বাঁশি চাকমা আমাকে ট্রায়ালে অংশ নিতে বলেন। তখন আমার ফুটবল সম্পর্কে সেভাবে কোনো ধারণাই ছিল না। ট্রায়ালের প্রথম দিনেই আমার পায়ের নখ উপড়ে গিয়েছিল। আমি খুব কান্না করেছিলাম। আমার জ্যাঠা বীরসেন চাকমা ছিলেন সেই স্কুলের শিক্ষক। তিনি আমাকে বুঝিয়ে আবার ট্রেনিংয়ে পাঠান। এভাবেই আমার ফুটবলে হাতেখড়ি।

এরপর কী হলো?

ঋতু : আমার ছোটবেলার কোচ ছিলেন শান্তিমনি চাকমা এবং সুইহ্লামং মারমা। আমি স্কুলের হয়ে দুবার জাতীয় টুর্নামেন্টে অংশ নিই। তবে ২০১৫ সালে আমার বাবা হঠাৎ মারা গেলে আমার মা পাঁচ সন্তান নিয়ে ভীষণ বিপদে পড়ে যান। কারণ বাবাই ছিলেন আমাদের একমাত্র অবলম্বন। ততদিনে আমার প্রাথমিকে পড়া শেষ হয়ে গেছে। বাড়ি থেকে স্কুলে নিয়মিত ট্রেনিং করতে ৪০ টাকা খরচ হতো। সেই টাকা জোগাতেই হিমশিম খেতে হতো। এক্ষেত্রে আমার জ্যাঠা বীরসেন চাকমা বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। তার উৎসাহেই আমি এই পর্যন্ত আসতে পেরেছি। তিনি স্কুলের পাশে আমার এক কাকার বাসায় থাকার বন্দোবস্ত করে দেন। স্কুলের খরচ, হাত খরচ, খেলার সরঞ্জামাদিও জ্যাঠাই কিনে দেন। তাছাড়া আমার শৈশবের কোচ শান্তিমনি চাকমা আমাকে নিজের মেয়ের মতো স্নেহ করতেন। এই দুজনের আগ্রহে পরের বছর বিকেএসপির ট্রায়ালে অংশ নিই এবং সুযোগ পেয়ে যাই। তবে ভর্তির জন্য তখনই ৪০-৫০ হাজার প্রয়োজন ছিল। এত টাকা জোগাড় করার সামর্থ্য আমার পরিবারের ছিল না। জ্যাঠা কীভাবে যেন সব ব্যবস্থা করেন এবং বিকেএসপিতে ভর্তি করিয়ে দেন। এক বছর বিকেএসপিতে থাকার পর ২০১৭ সালে অনূর্ধ্ব-১৫ জাতীয় দলে সুযোগ পাই। এর পর থেকেই এখন পর্যন্ত বাফুফে ভবনের ডরমেটরি আমার ঠিকানা। এখানে আসার পর ছোটন স্যারের অধীনে ধীরে ধীরে নিজের উন্নতি করেছি। সেই সঙ্গে বয়সভিত্তিক বিভিন্ন দলে নিয়মিত সুযোগ পাই। ২০১৯ সালে সিনিয়র জাতীয় দলেও সুযোগ হয়। তবে তখন সিনিয়র আপুদের কারণে নিয়মিত হতে পারিনি একাদশে। এখন সুযোগ পেয়ে চেষ্টা করছি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে।

আপনি তো ২০২২ সাফজয়ী দলের সদস্য ছিলেন। সেবার জয়ের পর তো অনেক অর্থ পুরস্কার পেয়েছিলেন। এবারও নিশ্চয় পাবেন?

ঋতু : দেখুন, আমার বিশেষ কিছু চাওয়ার নেই। দেশের জন্য খেলতে শুরু করেছি। যতদিন পারব খেলে যাব। পাশাপাশি পড়ালেখাটাও পুরোপুরি শেষ করতে চাই। কারণ আমাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। আমার পরিবারের জন্য কিছু করতে হবে। যদিও গত সাফ জয়ের পর বিগত সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বাড়ি বানিয়ে দেওয়ার। জমিও দেখানো হয়েছিল। তবে বাড়ি আর সরকার বানিয়ে দেয়নি। তবে বাড়ি বানিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। তাই এবার বিশেষ কিছুই চাওয়ার নেই। শুধু আশীর্বাদ করবেন যেন দেশের জন্য আরও বড় কিছু এনে দিতে পারি এবং বিদেশি কোনো বড় লিগে খেলার ব্যক্তিগত স্বপ্ন পূরণ করতে পারি। আমি কিন্তু এই সাফ চলাবস্থায় ভারতের একটি ক্লাব ও ইউরোপের একটি ক্লাব থেকে প্রস্তাব পেয়েছি (হাসি)।

এটা তো বড় সুসংবাদ। ইউরোপের কোন দেশ থেকে প্রস্তাব এসেছে?

ঋতু : এটা এখনই বলা বারণ আছে। সব কিছু ঠিক হলে আনুষ্ঠানিকভাবেই জানাব। তবে ভারতের যে ক্লাবে গত বছর সাবিনা আপু খেলেছেন, সেখান থেকেও প্রস্তাব এসেছে।

খুব অল্প বয়সে বাবাকে হারিয়েছেন। ২০২২ সালে একটা দুর্ঘটনায় একমাত্র ভাইটিকেও হারিয়েছেন। তাদের কথা নিশ্চয় ভোলার নয়?

ঋতু : ২০২২ সাফের আগের তিন মাস আগে আমার পিঠাপিঠি ভাইটা বাড়ির পানি তোলার মোটর মেরামত করতে গিয়ে কারেন্ট শকে মারা যায়। এরপর শোক কাটিয়ে সাফে অংশ নিই, খেলা চালিয়ে যাই। দুটি সাফের শিরোপা জয়ের পর বাবা আর ভাইয়ের কথাই শুধু মনে পড়েছে। আজ তারা বেঁচে থাকলে কতই না খুশি হতো। আমিও গর্বভরে বাবাকে বলতে পারতাম, দেখো তোমার মেয়ে দক্ষিণ এশিয়ার সেরা খেলোয়াড় হয়েছে।