ট্রেনিংয়ের ৪০ টাকা জোগার করতেই হিমশিম খেতেন সাফজয়ী কন্যা

টানা দ্বিতীয়বার সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশকে গৌরব এনে দিযেছে জাতীয় নারী ফুটবল দল। অথচ, দলের প্রায় সবাইকে এ পর্যায়ে আসতে চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে। তেমনি একজন ঋতুপর্ণা চাকমা। শৈশবে বাবাকে হারানো ঋতুপর্ণা দেশ রূপান্তরকে জানালেন তার পরিবারের অসম্ভব লড়াইয়ের গল্প।

ঋতুপর্ণা বলেন, 'আমি রাঙ্গামাটির প্রত্যন্ত গ্রাম মঘাছড়ির এক আদিবাসী পরিবারের সন্তান। আমার বাবা ছিলেন কৃষিজীবী। কখনো দিনমজুরি করেও সংসার চালাতেন। ২০১১ সালে দেশব্যাপী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো নিয়ে ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরু হয়। যেই আসরে আমাদের মঘাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় অংশ নেয় এবং জাতীয় পর্যায়ে সেরা হয়।'

'পরের বছর আমার বাবা বরজ বাঁশি চাকমা আমাকে ট্রায়ালে অংশ নিতে বলেন। তখন আমার ফুটবল সম্পর্কে সেভাবে কোনো ধারণাই ছিল না। ট্রায়ালের প্রথম দিনেই আমার পায়ের নখ উপড়ে গিয়েছিল। আমি খুব কান্না করেছিলাম। আমার জ্যাঠা বীরসেন চাকমা ছিলেন সেই স্কুলের শিক্ষক। তিনি আমাকে বুঝিয়ে আবার ট্রেনিংয়ে পাঠান। এভাবেই আমার ফুটবলে হাতেখড়ি।'সাফ শিরোপা হাতে ঋতুপর্ণা।

এই বীরসেন চাকমাই চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞায় ভাতিজিকে ফুটবলার বানানোর মিশনে নামেন। ঋতুর ভাষায়, 'আমার ছোটবেলার কোচ ছিলেন শান্তিমনি চাকমা এবং সুইহ্লামং মারমা। আমি স্কুলের হয়ে দুবার জাতীয় টুর্নামেন্টে অংশ নিই। তবে ২০১৫ সালে আমার বাবা হঠাৎ মারা গেলে আমার মা পাঁচ সন্তান নিয়ে ভীষণ বিপদে পড়ে যান। কারণ বাবাই ছিলেন আমাদের একমাত্র অবলম্বন।'

'ততদিনে আমার প্রাথমিকে পড়া শেষ হয়ে গেছে। বাড়ি থেকে স্কুলে নিয়মিত ট্রেনিং করতে ৪০ টাকা খরচ হতো। সেই টাকা জোগাতেই হিমশিম খেতে হতো। এক্ষেত্রে আমার জ্যাঠা বীরসেন চাকমা বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। তার উৎসাহেই আমি এই পর্যন্ত আসতে পেরেছি। তিনি স্কুলের পাশে আমার এক কাকার বাসায় থাকার বন্দোবস্ত করে দেন। স্কুলের খরচ, হাত খরচ, খেলার সরঞ্জামাদিও জ্যাঠাই কিনে দেন। তাছাড়া আমার শৈশবের কোচ শান্তিমনি চাকমা আমাকে নিজের মেয়ের মতো স্নেহ করতেন।'

ঋতুপর্ণা বলেন, 'এই দুজনের আগ্রহে পরের বছর বিকেএসপির ট্রায়ালে অংশ নিই এবং সুযোগ পেয়ে যাই। তবে ভর্তির জন্য তখনই ৪০-৫০ হাজার প্রয়োজন ছিল। এত টাকা জোগাড় করার সামর্থ্য আমার পরিবারের ছিল না। জ্যাঠা কীভাবে যেন সব ব্যবস্থা করেন এবং বিকেএসপিতে ভর্তি করিয়ে দেন। এক বছর বিকেএসপিতে থাকার পর ২০১৭ সালে অনূর্ধ্ব-১৫ জাতীয় দলে সুযোগ পাই।'

এই সুযোগটাই যেন ঋতুপর্ণার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়, 'এর পর থেকেই এখন পর্যন্ত বাফুফে ভবনের ডরমেটরি আমার ঠিকানা। এখানে আসার পর ছোটন স্যারের অধীনে ধীরে ধীরে নিজের উন্নতি করেছি। সেই সঙ্গে বয়সভিত্তিক বিভিন্ন দলে নিয়মিত সুযোগ পাই। ২০১৯ সালে সিনিয়র জাতীয় দলেও সুযোগ হয়। তবে তখন সিনিয়র আপুদের কারণে নিয়মিত হতে পারিনি একাদশে। এখন সুযোগ পেয়ে চেষ্টা করছি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে।'