মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আর মাত্র দুইদিন পর। পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন নিয়ে একটা বাড়তি আগ্রহ লক্ষ করা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে সারা বিশ্বের ভূ-রাজনীতি, অর্থনীতি, সামরিক ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিকাশসহ নানা বিষয়। যদিও বিষয়গুলি পারস্পরিকভাবে জড়িত থাকলেও তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে খুব বেশি পরিবর্তন হয় না। তারপরও তাদের দ্বি-দলীয় ব্যবস্থায় ডেমোক্র্যাটিক ও রিপাবলিক পার্টির ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে কিছু স্বতন্ত্র কৌশলগত নীতির পার্থক্য দেখতে পাই। ফলে সারা বিশ্বের রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের বিশ্লেষণ ও যুক্তি তর্ক চলতে থাকে। আগামী ৫ নভেম্বর ৬০তম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইলেকটোরাল কলেজের মোট ভোট সংখ্যা ৫৩৮টি। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে একজন প্রার্থীকে ২৭০টি ইলেকটোরাল কলেজের ভোট পেতে হয়।
কমলা হ্যারিস জয় পেতে পারেন যেসব কারণে?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিগত নির্বাচনগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বেশিরভাগ প্রসিডেন্ট পরপর দুটি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পান তাদের দলীয় রীতি অনুযায়ী। কিন্তু এবারের ক্ষেত্রে বাইডেনের শারীরিক অক্ষমতার কারণে নির্বাচন থেকে সরে গেছেন। ফলে কমলা হ্যারিস একটু সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছেন। কারণ বৈশ্বিক রাজনীতিতে ডেমোক্র্যাট দলের বা বাইডেনের অবশিষ্ট নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে এই বাড়তি সুযোগটি কমলার কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।
এবারের বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো ছিল অভিবাসন, গর্ভপাত, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ও ক্যাপিটাল হিলে হামলা। এবারের জাতীয় বিতর্কে কমলা হ্যারিস ট্রাম্পকে নাস্তানাবুদ করেছেন। এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্প সমর্থিত ফক্স নিউজসহ যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী মিডিয়াগুলো জাতীয় বিতর্কে কমলা হ্যারিসকে এগিয়ে রেখেছে।
বাইডেন প্রশাসন গণতান্ত্রিক সম্মেলনে বিশ্বের ১১০টি দেশকে আমন্ত্রণের মাধ্যমে নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসা ও বাকি দেশগুলোকে একটি কঠোর বার্তার মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে উৎসাহিত করেছিল। দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ধারা পুনরুদ্ধার বা মার্কিন স্বার্থ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পুরোপুরি সফলতা দেখিয়েছে পাকিস্তান, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ ও বাংলাদেশে।
ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যে বহুমুখী সংকট তৈরি হয়েছে বাইডেন প্রশাসন তা সফলভাবে মোকাবেলা করে। গত কয়েক দশকে আমেরিকা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে ব্যাপক অর্থনৈতিক ও ইমেজ সংকটে পড়লেও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর পর একদিকে বিশ্বে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র বিক্রি বৃদ্ধি পায় তেমনই আমেরিকার ইমেজ সংকট অনেকটা কেটে যায় এবং সেই সঙ্গে রাশিয়া বৈশ্বিকভাবে প্রতিবেশী ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণের কারণে দীর্ঘমেয়াদে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। তাই করোনা পরিস্থিতি ও ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্বের টালমাটাল পরিস্থিতিতে বাইডেন প্রশাসন বিশ্বের নেতৃত্বের আসনে ফিরে আসে। বৈশ্বিকভাবে চীনের প্রভাবকে সংকুচিত করার জন্য চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) পদক্ষেপের বিপরীতে জি সম্মেলনে যৌথভাবে ৬০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়, যেখানে আমেরিকা এককভাবে ২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রতিশ্রুতি দেয়। এ ছাড়া চীনকে মোকাবেলার জন্য কোয়াড ও ইন্দো প্যাসিফিক জোট গড়তে সক্ষম হয়।
কমলা হ্যারিসের মা ভারতীয় বংশোদ্ভূত হওয়ার কারণে প্রবাসী ভারতীয়দের ভোটের একটি নীরব সমর্থন পেতে পারে। বেশিরভাগ অভিবাসীরা কমলাকে সমর্থন দেবে কারণ তারা জানে ট্রাম্প নির্বাচিত হলে অভিবাসীদের জন্য নানা ধরনের বিধি-নিষেধ দেওয়া হতে পারে। এ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশের মতো ভারতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালী হোক এটা ভারতীয় প্রবাসীরাও চান।
যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ের ক্ষেত্রে ইহুদিদের আর্থিক ও কৌশলগত সমর্থন অপরিহার্য তাই বাইডেন প্রশাসন ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল যুদ্ধে ইসরায়েলকে সরাসরি সমর্থন না করলেও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নি। তারই ধারাবাহিকতায় বাইডেন প্রশাসন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্টে ভাষণ দেওয়ার সুযোগ দেওয়া, ইসরায়েলকে অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ আর্থিক সাহায্য অব্যহত রাখা ও বৈশ্বিক কূটনৈতিক চাপ থেকে রক্ষা করাসহ নানাভাবে ইহুদিদের কাছে আস্থাশীলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। কমলা হ্যারিস ইহুদি সম্প্রদায়ের ভোট টানতে তার স্বামী ডাগ এমহফকে কাজে লাগাচ্ছেন। তাছাড়া বাইডেন ইসরায়েলের পক্ষে অবস্থান নিলেও আরব ও মুসলিম ভোটারদের সন্তুষ্ট করতে কমলা হ্যারিস গাজায় ইসরায়েলি হামলার নিন্দা করে ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার সমর্থন করেছেন। ইহুদিদের ব্যাপারে ডেমোক্র্যাটদের এই দ্বৈত নীতি থাকার পরও নতুন জরিপে দেখা যাচ্ছে ৭১ শতাংশ ইহুদি ভোটার কমলাকে ও ট্রাম্পকে মাত্র ২৬ শতাংশ সমর্থন দেবেন।
নারী ভোটারদের কমলাকে ৫৮ শতাংশ সমর্থন করেন অপরপক্ষে ট্রাম্পকে ৪০ শতাংশ সমর্থন করেন। কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের মধ্যে কমলাকে ৮১ শতাংশ ও অপরদিকে ট্রাম্পকে সমর্থন করেন ১৬ শতাংশ।
এই নির্বাচনে সাবেক প্রেসিডেন্ট ও দলের প্রভাবশালী সিনেটরদের ব্যাপক সমর্থনের ফলে রেকর্ডসংখ্যক নির্বাচনী ফান্ড জমা হচ্ছে। বাইডেন বার্ধক্যজনিত অক্ষমতার কারণে দল ও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে নিজেকে প্রসিডেন্ট প্রার্থী হতে প্রত্যহার করলেও ট্রাম্প নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াননি। এবারের নির্বাচনে জেতার জন্য দোদুল্যমান ৭টি সুইং স্টেটের মধ্যে পেনসিলভেনিয়া অঙ্গরাজ্যে ১৯টি ইলেকটোরাল কলেজের ভোট পাওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সর্বশেষ জরিপে কমলা হ্যারিস ট্রাম্পের চেয়ে এগিয়ে আছেন। গত নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের ক্ষমতা হারনোর অন্যতম কারণ ছিল অতি আত্মবিশ্বাস। এর ফলে তাদের সমর্থকদের ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ায় ট্রাম্প অতি সহজেই জিতে যান।
ডোনাল্ড ট্রাম্প যেসব কারণে জিততে পারেন?
ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হতে পারেন যদি যুক্তরাষ্ট্রের অতিকট্টর ডানপন্থী ও নারীবিদ্বেষী ভোটার উপস্থিতি বৃদ্ধি পায়, গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি বৃদ্ধি পায় এবং ডেমোক্রেটিক দলের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে ঘাটতি দেখা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্র পরিচালনায় নারী নেত্রীত্বের কথা বললেও এখন পর্যন্ত তাদের দেশে নারী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়নি। এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে ঘটনাবহুল হচ্ছে ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে গুলির ঘটনাকে কেন্দ্র করে ডানপন্থী ভোটারের সমর্থন বৃদ্ধির সম্ভবনা রয়েছে। ফলে এ সকল যুক্তির আলোকে ট্রাম্প প্রসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ট্রাম্পের হারার সম্ভবনা কতটুকু?
আমেরিকার রাজনৈতিক শিষ্টাচারের জন্য হুমকিস্বরূপ, সিভিল সোসাইটি ও মিডিয়ার তীব্র বিরাজমান হাওয়া, ট্রাম্পের কট্টর বর্ণবাদী নীতির অবস্থান, অগণতান্ত্রিক আচরণ, করোনা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু, অর্থনৈতিক রক্ষণশীলতার কারণে পণ্যের দাম বৃদ্ধি, বৈশ্বিক রাজনীতিতে আমেরিকার প্রভাবকে ইচ্ছাকৃত দুর্বল করা, চীনের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে অস্বাভাবিক উত্থান, ক্যাপিটাল হিলে ট্রাম্প সমর্থকদের হামলা, ট্রাম্প ক্ষমতায় গেলে আমদানি পণ্যের ওপর অস্বাভাবিক শুল্ক ও বিধি-নিষেধ আরোপ করলে রাজস্ব আয় যেমন কমতে পারে, তেমনি মূল্যস্ফীতি ১-৩ শতাংশ বাড়তে পারে এবং শারীরিক বার্ধক্যজনিত সমস্যা নানাবিধ কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আবারও প্রত্যাখ্যান করার সম্ভবনা রয়েছে।
নির্বাচনে জয়ের জন্য সুইং স্টেটের ভূমিকা
এবারের নির্বাচনে দুই প্রেসিডেন্টের ভাগ্য নির্ধারণী সাতটি সুইং স্টেট হলো- জর্জিয়া, মিশিগান, অ্যারিজোনা, উইসকনসিন, পেনসিলভেনিয়া, নেভাডা ও নর্থ ক্যারোলাইনা। নির্বাচনে কমলাকে জিততে হলে পেনসিলভেনিয়া, মিশিগান ও উইসকনসিন হাত ছাড়া করা চলবে না। এই তিন এলাকা ডেমোক্র্যাটদের এলাকা হিসেবে পরিচিত।
অন্যদিকে ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউজে যেতে হলে নর্থ ক্যারোলাইনা, জর্জিয়ার সঙ্গে পেনসিলভেনিয়ায় জিততে হবে। এর আগে ২০১৬ সালে হিলারি ক্লিনটনের বিরুদ্ধে পেনসিলভেনিয়ায় স্বল্প ব্যবধানে জিতেছিলেন ট্রাম্প। তবে ২০২০ সালে তিনি বাইডেনের কাছে হেরে যান। ইতিমধ্যে পেনসিলভেনিয়ায় জিততে কমলা হ্যারিস ও ট্রাম্প সেখানে ঘনঘন সমাবেশ করেছেন।
সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে- যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কমলা হ্যারিসের জয়ের সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকলেও নির্বাচনে সুইং বা ব্যাটেলগ্রাউন্ড স্টেটগুলোর ভোটের পাল্লা শেষ অবধি কার পক্ষে যায় এবং গ্রামীণ ও শহুরে নারী ভোটারদের উপস্থিতি কেমন হয় সেটা দেখার বিষয়। এ ছাড়া অতি রক্ষণশীল ও নারীবিদ্বেষী ভোটারদের উপস্থিতি বৃদ্ধি পেলে ট্রাম্প নাটকীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেন। সর্বোপরি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার পর যতগুলি নির্বাচন হয়েছে সকল নির্বাচনে কিছু নাটকীয় ঘটনা ঘটলেও আমেরিকার জনগণ দেশের জাতীয় স্বার্থের প্রতি অগ্রাধিকার দিয়ে তাদের প্রার্থী নির্বাচন করে থাকেন। তাই সারা পৃথিবীর জনগণের কৌতূহল এখন মার্কিন মুলুকের প্রসিডেন্ট নির্বাচনের দিকে।
লেখক: মো. আল মামুন, শিক্ষক ও কলামিস্ট