বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলন-২০২৬

শি জিনপিং, ফকির মাহবুব আনাম, গুতেরেসের ভাষণে এআই ভবিষ্যতের তিন দিগন্ত

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৬, ১১:৩৮ পিএম

সাংহাইয়ের সম্মেলনে তিনজন বক্তা তিনটি ভিন্ন প্রশ্ন সামনে এনেছেন। চীন জানতে চায়, এআই উন্নয়নের বৈশ্বিক নিয়ম কে তৈরি করবে।

বাংলাদেশ জানতে চায়, উন্নয়নশীল দেশগুলো কীভাবে এর সুফল পাবে। আর জাতিসংঘের প্রশ্ন, প্রযুক্তিটি মানুষের সেবা করবে, নাকি বিদ্যমান বৈষম্যকে আরও শক্তিশালী করবে।

সাংহাইয়ের সম্মেলনকক্ষে আলোচনার বিষয় ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কিন্তু সেখানে যে কথোপকথনটি চলছিল, তা শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তির চেয়ে অনেক বড়। কে সবচেয়ে শক্তিশালী এআই মডেল তৈরি করবে, কার কাছে সবচেয়ে বেশি কম্পিউটিং ক্ষমতা থাকবে কিংবা কোন কোম্পানি পরবর্তী বৈপ্লবিক উদ্ভাবনটি বাজারে আনবে, প্রশ্নগুলো এখন আর সেখানেই সীমাবদ্ধ নেই। এআইকে কেন্দ্র করে নতুন প্রশ্ন উঠছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, বৈশ্বিক নেতৃত্ব, উন্নয়নের অধিকার, তথ্যের মালিকানা এবং ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রকৃতি নিয়ে।

১৭ থেকে ২০ জুলাই সাংহাইয়ে আয়োজিত বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলন ২০২৬ বা ডব্লিউএআইসি তাই নিছক প্রযুক্তি প্রদর্শনী ছিল না। সম্মেলনের উদ্বোধনী ও উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট টোকায়েভ, কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং বাংলাদেশের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামসহ বিভিন্ন দেশের নেতা ও প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

কিন্তু সম্মেলনের তাৎপর্য কেবল কারা উপস্থিত ছিলেন, তার মধ্যে ছিল না। বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তাঁরা এআইয়ের ভবিষ্যতকে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন।

শি জিনপিংয়ের বক্তব্যে উঠে এসেছে প্রযুক্তিগত আধিপত্য, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও নতুন বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণের প্রশ্ন। ফকির মাহবুব আনামের বক্তব্যে ছিল মানবকেন্দ্রিক জাতীয় নীতি, উন্নয়নশীল দেশের সক্ষমতা এবং ন্যায়সংগত প্রযুক্তি প্রবেশাধিকারের আকাঙ্ক্ষা। আর আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করেছেন, অতীতের বৈষম্য যেন ভবিষ্যতের প্রযুক্তিতে পুনর্নির্মিত না হয়।

এই তিনটি বক্তব্য এআইয়ের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তিনটি পরস্পরসংযুক্ত প্রশ্ন সামনে আনে: কে প্রযুক্তিটি নির্মাণ করবে, কে এর সুবিধা পাবে এবং কে এর ব্যবহারের নিয়ম নির্ধারণ করবে?

চীনের দৃষ্টিভঙ্গি, সহযোগিতার ভাষায় নতুন বৈশ্বিক নেতৃত্ব:

শি জিনপিং তাঁর উদ্বোধনী ভাষণে বলেন, এআইয়ের উন্নয়ন কোনো একটি দেশের একক পরিবেশনা হওয়া উচিত নয়; এটি হতে হবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সম্মিলিত সিম্ফনি। এই বক্তব্যের তাৎপর্য কেবল কাব্যিক ভাষায় সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যে বর্তমান প্রযুক্তি-রাজনীতির একটি স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া রয়েছে।

উন্নত সেমিকন্ডাক্টর, এআই চিপ, ক্লাউড অবকাঠামো এবং শক্তিশালী মডেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা যখন আরও তীব্র হচ্ছে, তখন বেইজিং নিজেকে প্রযুক্তিগত অবরোধের বিরোধী এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত অংশীদার হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।

শি জাতীয় নিরাপত্তার ধারণাকে অতিরিক্ত বিস্তৃত করা এবং একটি দেশের নিরাপত্তাকে অন্য দেশের নিরাপত্তার ঊর্ধ্বে রাখার প্রবণতার বিরোধিতা করেন। তিনি গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা, এআই ও ডিজিটাল বিভাজন কমানো এবং জাতিসংঘের অধীনে নীতি, মান ও শাসনব্যবস্থার সমন্বয়ের আহ্বান জানান।

একই সম্মেলনকে ঘিরে ২৯টি দেশ সাংহাইভিত্তিক বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহযোগিতা সংস্থা বা ওয়াইকো প্রতিষ্ঠার চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। চীন এটিকে উন্মুক্ত, উন্নয়নমুখী এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এআই সহযোগিতার কাঠামো হিসেবে উপস্থাপন করছে।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য রয়েছে। চীন যখন প্রযুক্তিগত একচেটিয়াত্বের বিরোধিতা করছে, তখন একই সঙ্গে এআইয়ের বৈশ্বিক নিয়ম, প্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তিগত মান নির্ধারণে নিজের প্রভাব বাড়াতেও চাইছে। অর্থাৎ সহযোগিতার ভাষা ক্ষমতার প্রতিযোগিতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়। ওয়াইকো যেমন গ্লোবাল সাউথের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে, তেমনি এটি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রভাবাধীন কাঠামোর বিপরীতে চীনকেন্দ্রিক একটি বিকল্প প্রতিষ্ঠান হিসেবেও আবির্ভূত হতে পারে।

তাই শি জিনপিংয়ের বক্তব্যকে শুধু উন্মুক্ত সহযোগিতার ঘোষণা হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি এমন এক ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রস্তাব, যেখানে চীন প্রযুক্তি নির্মাতা হওয়ার পাশাপাশি নিয়ম প্রণয়নকারীও হতে চায়।

প্রকৃত পরীক্ষা হবে, এই সহযোগিতা কতটা স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও জবাবদিহিমূলক হয়। ছোট দেশগুলো সেখানে সমানভাবে নীতি নির্ধারণ করতে পারবে, নাকি কেবল প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের গ্রহীতা হয়ে থাকবে, সে প্রশ্ন এখনো খোলা।

বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি. প্রযুক্তি নয়, মানুষের কল্যাণকে কেন্দ্রে রাখার অঙ্গীকার : বাংলাদেশের বক্তব্য ছিল ভিন্ন অবস্থান থেকে। দেশটি এআইয়ের বৈশ্বিক নেতৃত্ব দাবি করছে না। বরং জানতে চাইছে, দ্রুত পরিবর্তনশীল এই প্রযুক্তিকে কীভাবে জাতীয় উন্নয়ন, সরকারি সেবা এবং নাগরিক কল্যাণে ব্যবহার করা যায়।

১৮ জুলাই ‘হাই-লেভেল মিটিং অন গ্লোবাল এআই গভর্ন্যান্স’-এ বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দিতে গিয়ে ফকির মাহবুব আনাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ মানবাধিকার, নৈতিকতা, নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নভিত্তিক একটি মানবকেন্দ্রিক জাতীয় এআই নীতি প্রণয়ন করছে।

তিনি জানান, এর সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা ও সাইবার নিরাপত্তা জোরদার, সরকারি খাতে দায়িত্বশীল এআই ব্যবহারের নির্দেশিকা, তথ্য ব্যবস্থাপনার মান উন্নয়ন, এআইভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিকেন্দ্রীভূত এআই সেন্টার অব এক্সিলেন্স প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ যুক্ত থাকবে।

বৈশ্বিক এআই শাসনের জন্য মন্ত্রী চারটি অগ্রাধিকার তুলে ধরেছেন: নিরাপত্তা, সমতা, পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজনের সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, তথ্যের সার্বভৌমত্ব এবং ন্যায়সংগত প্রযুক্তি প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বানও জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, এআইয়ের ভবিষ্যৎ শুধু প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের প্রতিফলন হলে চলবে না; সেখানে মানবিক মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তিও থাকতে হবে।

বাংলাদেশের এই অবস্থান বৈশ্বিক এআই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু পরিবর্তনের চেষ্টা করে। বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রশ্ন যেখানে “কে নেতৃত্ব দেবে”, বাংলাদেশের প্রশ্ন সেখানে ‘কে বাদ পড়বে না’।

দেশটির কাছে এআই যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের সঙ্গে সরাসরি প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার হাতিয়ার নয়। এটি কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সরকারি সেবা, শিল্প উৎপাদন এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও কার্যকর করার সম্ভাব্য মাধ্যম। কিন্তু ঘোষিত উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা এক বিষয় নয়।

একটি মানবকেন্দ্রিক নীতি লেখার চেয়ে তা কার্যকর করা অনেক কঠিন। তার জন্য প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল অবকাঠামো, সাশ্রয়ী কম্পিউটিং সুবিধা, মানসম্পন্ন তথ্যভান্ডার, বাংলা ও স্থানীয় ভাষার প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, স্বাধীন নজরদারি এবং নাগরিকের কার্যকর প্রতিকার পাওয়ার অধিকার।

‘এআই সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা আকর্ষণীয়। কিন্তু সেগুলো যদি শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক প্রদর্শনী প্রকল্প হয়, স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে যদি সুযোগ না পৌঁছায়, তাহলে বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্য অর্জিত হবে না।

একইভাবে, সরকারি খাতে এআই ব্যবহারের নির্দেশিকা থাকলেই যথেষ্ট নয়। কোনো অ্যালগরিদম নাগরিককে সেবা, ঋণ, চাকরি, ভাতা বা নিরাপত্তাসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে প্রভাবিত করলে তাকে জানতে হবে সিদ্ধান্তটি কীভাবে নেওয়া হয়েছে। ভুল হলে আপিল করার এবং মানবীয় পর্যালোচনা চাওয়ার অধিকারও থাকতে হবে।

বাংলাদেশের বক্তব্য তাই গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। তবে তার বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করবে নীতির সঙ্গে আইন, বাজেট, প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন তদারকি ও পরিমাপযোগ্য ফলাফল যুক্ত হয় কি না, তার ওপর ।

জাতিসংঘের দৃষ্টিভঙ্গি, পুরোনো বৈষম্যের নতুন প্রযুক্তিগত সংস্করণ যেন তৈরি না হয়:

শি জিনপিং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কথা বলেছেন। বাংলাদেশ ন্যায়সংগত প্রবেশাধিকারের দাবি তুলেছে। আন্তোনিও গুতেরেস প্রশ্নটিকে আরও গভীরে নিয়ে গেছেন। এআই কি বৈশ্বিক বৈষম্য কমাবে, নাকি তাকে আরও স্থায়ী করবে?

গুতেরেস বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিকিৎসা গবেষণা ত্বরান্বিত করতে, শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে, খাদ্যব্যবস্থা উন্নত করতে, নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে এবং টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনে বড় ধরনের অগ্রগতি ঘটাতে পারে। কিন্তু তাঁর সতর্কবার্তাটি ছিল আরও তাৎপর্যপূর্ণ: অতীতের ঐতিহাসিক অবিচার ভবিষ্যতের প্রযুক্তিতে পুনরাবৃত্ত হলে এই সম্ভাবনা বাস্তব হবে না।

বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এখনো ইন্টারনেট সংযোগের বাইরে। বহু দেশ নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, ডিজিটাল অবকাঠামো, তথ্য, কম্পিউটিং সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার ঘাটতিতে রয়েছে। ফলে এআইয়ের সামর্থ্য যত দ্রুত বাড়ছে, তার সুফল পাওয়ার সক্ষমতা দেশগুলোর মধ্যে তত সমানভাবে বাড়ছে না।

গুতেরেসের বক্তব্যে একটি মৌলিক সত্য রয়েছে: প্রযুক্তি নিজে থেকে অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়। একটি শক্তিশালী এআই মডেল একদিকে চিকিৎসকদের সহায়তা করতে পারে, অন্যদিকে যে ভাষা, জনগোষ্ঠী বা রোগীর তথ্য তার প্রশিক্ষণ উপাত্তে অনুপস্থিত, তাদের জন্য ভুল সিদ্ধান্তও দিতে পারে। একটি অ্যালগরিদম কৃষককে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিতে পারে, কিন্তু স্মার্টফোন, সংযোগ বা ডিজিটাল সাক্ষরতা না থাকলে সেই সুবিধা তাঁর কাছে পৌঁছাবে না। এ কারণে শুধু এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানোই ন্যায়সংগত উন্নয়ন নিশ্চিত করে না। দেখতে হবে কে প্রযুক্তিটি নিয়ন্ত্রণ করছে, কার তথ্য দিয়ে তা তৈরি হয়েছে, কোন ভাষায় এটি কাজ করছে এবং ভুল সিদ্ধান্তের দায় কে নেবে।

জাতিসংঘের দৃষ্টিভঙ্গি এআই শাসনকে কেবল প্রযুক্তিগত মান বা নিরাপত্তা পরীক্ষার প্রশ্ন হিসেবে দেখে না। এটি মানবাধিকার, উন্নয়ন, শান্তি, পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।

তিনটি দৃষ্টিভঙ্গি, তিনটি অসম্পূর্ণ উত্তর, তিনটি বক্তব্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল আছে। তিন পক্ষই কোনো না কোনোভাবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কথা বলেছে। সবাই স্বীকার করেছে, এআইয়ের সুফল বিস্তৃত করতে হবে এবং এর ঝুঁকির জন্য শাসনব্যবস্থা প্রয়োজন। উন্নয়নশীল দেশগুলো যেন পিছিয়ে না পড়ে, সে উদ্বেগও তিনটি বক্তব্যে রয়েছে। কিন্তু তাঁদের অবস্থান ও স্বার্থ এক নয়।

চীনের দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রে রয়েছে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সার্বভৌমত্ব এবং বৈশ্বিক নিয়ম নির্ধারণে প্রভাব। বাংলাদেশের কেন্দ্রে রয়েছে উন্নয়ন, প্রযুক্তি প্রবেশাধিকার ও জাতীয় সক্ষমতা। জাতিসংঘের কেন্দ্রে রয়েছে মানবাধিকার, বৈষম্য এবং আন্তর্জাতিক জবাবদিহি।

সহজভাবে বললে, চীন বলছে এআই কীভাবে যৌথভাবে নির্মাণ করা উচিত। বাংলাদেশ বলছে মানুষের উন্নয়নে তা কীভাবে ব্যবহার করা উচিত। জাতিসংঘ বলছে মানবজাতির ক্ষতি ঠেকাতে প্রযুক্তিটি কীভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত। কিন্তু তিনটি অবস্থানই নিজ নিজ জায়গায় অসম্পূর্ণ।

চীনের সহযোগিতার প্রস্তাব বিশ্বাসযোগ্য হবে তখনই, যখন ছোট দেশ, নাগরিক সমাজ, গবেষক এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নিয়ম তৈরির প্রক্রিয়ায় বাস্তব ক্ষমতা পাবে।

বাংলাদেশের মানবকেন্দ্রিক নীতি অর্থবহ হবে তখনই, যখন নাগরিকেরা শুধু এআইভিত্তিক সেবার ব্যবহারকারী নয়, বরং নীতি প্রণয়ন, তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহির অংশীদার হবে। জাতিসংঘের নীতিগত আহ্বানও তখনই কার্যকর হবে, যখন তা স্বেচ্ছামূলক ঘোষণার বাইরে গিয়ে অর্থায়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্বাধীন মূল্যায়ন এবং কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কাঠামো তৈরি করতে পারবে।

বাংলাদেশের সামনে পাঁচটি বাস্তব প্রশ্ন, সাংহাইয়ে বাংলাদেশের বক্তব্য একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে। তবে দেশে ফিরে সেই বার্তাকে কয়েকটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে।

প্রথমত, জাতীয় এআই নীতি কি শুধু সরকার, প্রযুক্তি কোম্পানি ও বিশেষজ্ঞদের নথি হবে, নাকি নাগরিক সমাজ, শিক্ষক, সাংবাদিক, শ্রমিক, নারী, তরুণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীও তা প্রণয়নে অংশ নেবে?

দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার প্রতিষ্ঠানটি কতটা স্বাধীন হবে? রাষ্ট্রীয় সংস্থা ও বেসরকারি কোম্পানি উভয়ের তথ্য ব্যবহারের বিরুদ্ধে সেটি কি কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারবে?

তৃতীয়ত, এআইয়ের কারণে শ্রমবাজারে যে পরিবর্তন আসবে, তার জন্য কী ধরনের পুনঃপ্রশিক্ষণ, সামাজিক সুরক্ষা এবং শিক্ষা সংস্কার করা হবে?

চতুর্থত, বাংলা এবং দেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য, গবেষণা ও মডেল তৈরিতে কারা বিনিয়োগ করবে? ভাষাভিত্তিক অন্তর্ভুক্তি ছাড়া মানবকেন্দ্রিক এআইয়ের দাবি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

পঞ্চমত, কোনো এআই ব্যবস্থা ক্ষতিকর বা বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত দিলে নাগরিক কোথায় অভিযোগ করবে এবং কে দায় বহন করবে? এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া জাতীয় নীতির ভাষা আধুনিক হলেও শাসনব্যবস্থা পুরোনোই থেকে যেতে পারে।

ভবিষ্যতের প্রকৃত প্রতিযোগিতা: বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলন ২০২৬ দেখিয়েছে, এআইয়ের ভবিষ্যৎ শুধু পরীক্ষাগার বা প্রযুক্তি কোম্পানির কার্যালয়ে নির্ধারিত হবে না। সেটি নির্ধারিত হবে রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, বাজার এবং নাগরিকের মধ্যকার ক্ষমতার সম্পর্কের মধ্য দিয়ে।

প্রশ্নটি এখন আর শুধু কোন দেশ সবচেয়ে দ্রুত বা শক্তিশালী মডেল তৈরি করতে পারবে, তা নয়। প্রশ্ন হলো, সেই মডেল কার ভাষা বুঝবে, কার সমস্যার সমাধান করবে এবং কার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে।

শি জিনপিংয়ের সহযোগিতার আহ্বান, ফকির মাহবুব আনামের মানবকেন্দ্রিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি এবং আন্তোনিও গুতেরেসের ন্যায়বিচারের সতর্কবার্তা একত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য মনে করিয়ে দেয়: প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং সামাজিক অগ্রগতি একই জিনিস নয়।

শক্তিশালী এআই নির্মাণ করা এক ধরনের সাফল্য। কিন্তু সেই প্রযুক্তিকে বিশ্বাসযোগ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক, পরিবেশগতভাবে টেকসই এবং জবাবদিহিমূলক করা আরও কঠিন সাফল্য।

শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক এআই প্রতিযোগিতার বিজয়ী হয়তো সেই দেশ হবে না, যে সবার আগে সবচেয়ে বুদ্ধিমান যন্ত্র তৈরি করবে। প্রকৃত নেতৃত্বের মূল্যায়ন হবে কে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, যেখানে প্রযুক্তি ক্ষমতাবানদের কর্তৃত্ব আরও বাড়ানোর বদলে মানুষের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা এবং মর্যাদা শক্তিশালী করে।

সাংহাই থেকে পাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা তাই প্রযুক্তি সম্পর্কে নয়, বরং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে।
এআইয়ের ভবিষ্যৎ আগে থেকে নির্ধারিত নয়। সেটি তৈরি হবে আমরা কাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে বসাই, কাকে বাইরে রাখি এবং উদ্ভাবনের পাশাপাশি ন্যায়বিচারকে কতটা গুরুত্ব দিই, তার ভিত্তিতে।


লেখক: ডিজিটাল গণতন্ত্র, তথ্যের অখণ্ডতা ও গণমাধ্যম উন্নয়ন নীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ
দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়ক অ্যাম্বাসেডর।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত