সরকারের কাছে ফ্ল্যাটের আর্জি সাবিনাদের

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আমন্ত্রণে শনিবার সকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় গিয়েছিলেন টানা দ্বিতীয়বারের মতো নারী সাফজয়ী বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়রা। প্রধান উপদেষ্টার কাছে নিজেদের বেশ কিছু দাবি-দাওয়াও তুলেছেন তারা। যার মধ্যে প্রত্যেক ফুটবলারের জন্য ঢাকায় একটি করে ফ্ল্যাট চেয়েছেন সাবিনারা। এর বাইরেও নিজ নিজ গ্রামের বাড়ির পথঘাট, বসতভিটে সংস্কারের কথাও বলেছেন মেয়েরা। প্রধান উপদেষ্টাও বলেছেন সরকার সাধ্যমতো তাদের দাবি-দাওয়া পূরণের চেষ্টা করবে।

৩০ অক্টোবর নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর দশরথ রঙ্গশালায় নারী সাফের ফাইনালে স্বাগতিকদের ২-১ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো দক্ষিণ এশিয়ার সেরা হয় বাংলাদেশ। অসামান্য এই বিজয়ের পরপরই প্রধান উপদেষ্টা মেয়েদের সঙ্গে দেখার করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। পরের দিন দল দেশে ফেরার পর যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ফুটবল ভবনে গিয়ে মেয়েদের ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানান। পাশাপাশি তার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দলকে এক কোটি টাকা পুরস্কার দেন। সেদিন সন্ধ্যায় তিনি মেয়েদের প্রধান উপদেষ্টার আমন্ত্রণ জানিয়ে আসেন। গতকাল শনিবার সকাল ১১টায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় দলের ২৩ ফুটবলার, ব্রিটিশ হেড কোচ পিটার জেমস বাটলার ও ম্যানেজার মাহমুদা অনন্যার। সে সময় ক্রীড়া উপদেষ্টাও উপস্থিত ছিলেন। প্রধান উপদেষ্টা বিজয়ী দলের সঙ্গে সকালের নাশতা সারেন এবং তাদের সংগ্রামের গল্প ও দাবি-দাওয়ার কথা শোনেন। সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুন বলেন, ‘আমাদের পরিবারের অনেকে ঢাকায় আসে, কিন্তু তাদের থাকার জায়গা থাকে না। তাই প্রধান উপদেষ্টাকে অনুরোধ করেছি আমাদের পরিবারের জন্য একটি আবাসন ব্যবস্থার।’

ঢাকায় মাথা গোঁজার ঠাঁই যেমন নেই, নারী দলের অনেক ফুটবলারেরই গ্রামের বাড়ির অবস্থা আরও নাজুক। এই দলে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের অনেক আদিবাসী ফুটবলার আছেন। বেশিরভাগ ফুটবলারই দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা। পাহাড়ি অনেক জায়গায় এখনো বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভীষণ খারাপ। প্রধান উপদেষ্টার কাছে নিজ নিজ এলাকার সমস্যাগুলোও তুলে ধরেছেন ফুটবলাররা। সাবিনা বলেন, ‘মারিয়া, কৃষ্ণা, মনিকা, মাসুরাসহ অনেকেই ব্যক্তিগত সমস্যার কথা বলেছে। যেমন মনিকার বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা খারাপ এবং সেই এলাকার বিদ্যুৎ সমস্যা। প্রধান উপদেষ্টা সবার কথাই মন দিয়ে শুনেছেন এবং আশ্বস্ত করেছেন আমাদের পাশে দাঁড়ানোর। তবে তিনি আমাদের সবার দাবি-দাওয়াগুলো আলাদা আলাদা করে লিখিত আকারে দিতে বলেছেন। সেগুলো পেলেই তিনি ব্যবস্থা নেবেন বলে জানিয়েছেন।’

ব্যক্তিগত চাওয়ার পাশাপাশি মেয়েরা ফুটবলের বেশ কিছু অবকাঠামোগত সমস্যা এবং নিজেদের বেতনের বিষয়টিও প্রধান উপদেষ্টার কাছে তুলে ধরেন। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম সংস্কারের কারণে দীর্ঘদিন ব্যবহারের অনুপযুক্ত। ফলে জাতীয় দলের ট্রেনিং বাধ্য হয়েই বসুন্ধরা কিংসের গ্রাউন্ডে করতে হয়। মতিঝিল থেকে প্রতিদিন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় গিয়ে ট্রেনিং করা কষ্টসাধ্য। এছাড়া বাফুফে ভবনের পাশের টার্ফ ও কমলাপুর স্টেডিয়ামের টার্ফের বেহাল দশার কথাও তুলে ধরা হয় সরকারপ্রধানের কাছে। প্রধান উপদেষ্টা আশ^স্ত করেছেন, ত্বরিত সমাধানযোগ্য সমস্যাগুলো নিয়ে দ্রুত কাজ শুরু করবে তার সরকার।

যমুনায় খেলোয়াড়দের সঙ্গের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে সংবাদকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। মেয়েদের বেতন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা কাটাতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেন তিনি। আর ভবিষ্যতে যেন বেতন বকেয়া না হয় সে ব্যাপারে দৃষ্টি রাখার তাগিদ দেন ক্রীড়াঙ্গনের অভিভাবক, ‘তাদের দুই মাসের বেতন বকেয়া আছে। বাফুফেতে এতদিন কাজী সালাউদ্দিন সাহেবের কমিটি ছিল, এখন নতুন কমিটি এসেছে, তাদের ওয়ার্কআউট করব। যাতে করে ভবিষ্যতেও কখনো বেতন বকেয়া না হয়।’ বাফুফের বিশাল ঋণের বোঝার কথা শুনে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন আসিফ। এ নিয়ে নতুন কমিটিকে অডিট করতে বলেছেন তিনি যাতে কোনো অপরাধী পার পেয়ে না যায়, ‘বাফুফের বিশাল অঙ্কের ঋণ রয়েছে, সেটা কেন হলো? আর্থিক অনিয়মের বিষয় সামনে এসেছে। সেগুলো নিয়ে নতুন কমিটিকে অডিট করার জন্য বলেছি। যদি কোনো অনিয়ম পাওয়া যায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

খেলোয়াড়দের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি, ‘তারাই (খেলোয়াড়) অগ্রাধিকারে থাকবে। এতদিন পর্যন্ত অগ্রাধিকারে থাকত কমিটির সদস্যরা। সেটা আর হবে না। এটা আমার সময়, আমি নিশ্চিত করব।’ প্রধান উপদেষ্টার কাছে ফ্ল্যাট চাওয়ার বিষয়ে আসিফ বলেন, ‘ওনাদের লিখিত দাবির মধ্যে বিষয়টি থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা আমাদের সক্ষমতার মধ্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।’