জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ‘নতুন’ এক দেশের যাত্রা শুরু। এরপর নানা কাণ্ডেই আলোচনা-সমালোচনায় মুখরিত সংস্কৃতি অঙ্গন। এক অস্থিরতা পেরিয়ে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও যেন স্থবির হয়ে আছে বিনোদন অঙ্গন। নির্বিঘেœ, নিশ্চিন্তে যেন কিছুই করা যাচ্ছে না, নির্ভার পাচ্ছেন না শিল্পী-নির্মাতারা।
শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় একদল ব্যক্তির বিক্ষোভে মুখে গত শনিবার সন্ধ্যায় দেশ নাটক দলের আয়োজনে ‘নিত্যপুরাণ’ নাটকের প্রদর্শনী মাঝপথে বন্ধ করে দেন প্রতিষ্ঠানটির ডিজি সৈয়দ জামিল আহমেদ। এরপর তা নিয়ে নানারকম আলোচনা চলছে। নাটক বন্ধ করা ঠিক হয়েছে কি হয়নি এমন সংলাপে কেউ কেউ পক্ষে-বিপক্ষে নানারকম মন্তব্য ছুড়ছেন। নাটক বন্ধের কারণে আবার কেউ সৈয়দ জামিল আহমেদের পদত্যাগও চাইছেন!
একই দিনে আরেক কাণ্ড ঘটে চট্টগ্রামে। এদিন বিকেলে শহরটিতে একটি শো-রুম উদ্বোধন করতে যাওয়ার কথা থাকলেও তৌহিদি জনতার বাধার মুখে সেখান থেকে সরে আসতে হয় জনপ্রিয় অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরীকে। এরপর তার ওপর হামলা হয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়াতে থাকে। এমতাবস্থায় বেশ আতঙ্কেই রয়েছেন সংস্কৃতিকর্মীরা। নিজ কর্মক্ষেত্রে এমন বাধা এবং অপ্রত্যাশিত ঘটনাগুলো সামনেও যে ঘটবে না তার কোনো নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তারা।
বিষয়গুলো নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দিনভর চলছে আলোচনা-সমালোচনা। এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে অভিনেত্রী বন্যা মির্জা লেখেন, যারা নাটক বন্ধের দায় জামিল আহমেদকে দিচ্ছেন তারা গিয়ে বিপ্লব করেন। দর্শকের দায় নাট্যকর্মীদের নিতে হয়। এমন বোকা মার্কা কথা খুব বিরক্তিকর। আর লোক ১০ জন হোক আর ৫০ জন হোক তারা জানেই না তারা সেখানে কেন গিয়েছে। তারা কেবল জানে এভাবে চিৎকার করতে হয়, যা তাদের শেখানো হয়েছে। যারা মজা দেখছেন, তারা জানবেন যে তাদের আমরা চিনি। এসবই আমাদের জীবনের শ্লেষ।
সংস্কৃতি অঙ্গনে ঘটা এই ঘটনাগুলোকে ব্যক্তিগতভাবে অসুখকর বলে মনে করছেন গুণী নাট্যব্যক্তিত্ব তারিক আনাম খান। দেশ নাটক প্রদশর্নী বন্ধ করে দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত দিন যেটা ঘটেছে সেটা অনাকাক্সিক্ষত। নাটক প্রদর্শন নিয়ে কোনো আপত্তি ছিল না। কারণ দীর্ঘ দিন ধরে ঢাকা শহরের বাইরেও প্রদর্শিত হয়েছে। নাটকের সঙ্গে কিছু সক্রিয় সদস্য এবং নেতৃত্বও আছেন যারা ফেসবুকে সরকারবিরোধী আন্দোলনবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। আমার কাছে মনে হয়, তিনি ব্যক্তিগত মতামত দিয়েছেন। কোনো দলকে নিয়ে কিছু বলেননি। যাকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। যদি নাট্যদলকে তার বিষয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলে চলে যেত এবং নাট্যদল যদি ব্যবস্থা না নিত, তাহলে একটা কথা ছিল। কিন্তু নাটক প্রদর্শনী বন্ধ হওয়া আমার কাছে ভালো মনে হয়নি। শিল্পকলার মহাপরিচালক চেষ্টা করেছিলেন। সর্বশেষ কোনো রকম ঝুঁকি না নিয়ে সবার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। নাটকের প্রদর্শনী বন্ধ হয়ে যাওয়া সংবাদটা একজন নাট্যকর্মী বা অভিনেতা হিসেবে আমার জন্য সুখকর নয়। নিশ্চয়ই আমার কাছে ভালো লাগবে না! চাপের মুখে নাটক প্রদর্শন বন্ধ করে দেওয়া কষ্টের বিষয়। দেশে আইন আছে, যদি সে অন্যায় করে তাহলে তাকে আইনের হাতে তুলে দেওয়া ভালো ছিল। আমাদের মধ্যে যে বিপদে থাকেন আমরা তো সব সময় তার পাশে দাঁড়াই। তো আমরা কেন চাইব নাটক বন্ধ হয়ে যাক! আমরা একটা কথা বলি ‘শো মাস্ট গো অন’। অভিনয় করতে করতে অসুস্থ হয়ে গেলে আমরা বলি, এ অবস্থাতে শো-টা শেষ করতে হবে।
এদিকে শিল্পীর কাজে বাধা দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে এই অভিনেতা বলেন, মেহজাবীনের অনেক ফ্যান-ফলোয়ার আছেন। তাকে অনেকে পছন্দ করেন। আমাদের দেশে শোরুম উদ্বোধন এইগুলো হরহামেশাই হয়। খেলোয়াড়, শিল্পী, অভিনেতা, অভিনেত্রীদের দিয়ে উদ্বোধন অনুষ্ঠান হয়। আমি জানি না কেন এমনটা হয়েছে। মেহজাবীন যদিও নায়িকা, মিডিয়ার লোক, তাই বলে এমনটা হয়েছে, তাহলেও আমার জন্য কষ্টদায়ক। সেটা মেনে নেওয়া মুশকিল। সাধারণত শোরুম উদ্বোধন হলে কী হয়? মিলাদ হয়, দোয়া অনুষ্ঠান হয়। কেউ একজন উদ্বোধনে গেলে মানুষ দেখতে আসে। প্রতিষ্ঠানের একটা বিজ্ঞাপন হয়ে যায়। এইটা তো ক্যাম্পেইন। এগুলো তো সব জায়গায় হচ্ছে। এটা অনাকাক্সিক্ষত এবং মোটেও ভালো কাজ বলে মনে করি না। এমন কর্মকাণ্ডে আমাদের সবারই সচেতন হওয়া উচিত। আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত। সবার শুভবুদ্ধির উদায় হোক।
সংস্কৃতিকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্ক, আপনারা সিনিয়ররা কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আতঙ্ক তো বটেই। কিছুদিন আগে গার্মেন্টস শ্রমিকরা কচুক্ষেতে সেনাবাহিনী, পুলিশের গাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। কোনো কিছুই তো আকাক্সিক্ষত নয়। দেশ চলবে আইনে। এই যে গণ-আন্দোলনটা হয়েছে, ছাত্রদের আমরা বিশ্বাস করি। দেশ, আইন তার মতো চলবে। এক ক্ষমতা ক্ষেত্র নয়। এই অস্থিরতা অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতি করছে। আমি প্রত্যাশা করি এগুলো আইন বা প্রশাসনের লোক দেখবেন। এগুলো নিয়ে তাদের ভাবা উচিত। আমার মনে হয় সবাই এগুলো দেখছেন। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পত্র-পত্রিকায় আসছে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। যে অন্যায় করে তার শাস্তি হোক। হুমকি-ধমকি দিয়ে থামিয়ে দেওয়া এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। না হলে সবারই বিপদ। এই ধরনের ঘটনা দেখতেও চাই না, শুনতেও চাই না।