উৎপাদন-বিপণন চলছেই নিষেধাজ্ঞা ফাঁকা বুলি

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:১০ এএম

দুই দশকেরও বেশি আগে পলিথিন নিষিদ্ধ করে পরিবেশ সুরক্ষায় বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সেই আইন আজ অনেকটাই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। সর্বশেষ গত বছরের জানুয়ারিতে পলিথিন ও একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার বন্ধে ব্যবস্থা নিতে এক বছর সময় বেঁধে দিয়েছিল উচ্চ আদালত। তবুও রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল প্রায় সবখানেই অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ পলিথিন।

নিয়মিত অভিযান না থাকায় অবৈধ কারখানাগুলোও উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। প্রকাশ্যে কোনো বাধা না থাকায় এবং বিনামূল্যে বা অল্প দামে ব্যাগ পাওয়ায় বিকল্প ব্যবহারেও মানুষের আগ্রহ কম। ফলে আইন থাকার পরও পলিথিন উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী মূল্যের বিকল্প শপিংব্যাগ না থাকায় পরিবেশ বিধ্বংসী পলিথিন ও প্লাস্টিকসামগ্রীর আগ্রাসন থেকে মুক্তি মিলছে না।

এক সময় বাজারে গেলে কাপড়, চট কিংবা পাটের ব্যাগ ছিল মানুষের নিত্যসঙ্গী। জানা যায়, আশির দশকের পর ধীরে ধীরে সেই জায়গা দখল করে নেয় পলিথিন। কম খরচে উৎপাদন, সহজে বহনযোগ্য এবং বিনামূল্যে সরবরাহের কারণে এটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবে এই সাময়িক সুবিধাই এখন দেশের পরিবেশ, কৃষি, নদী এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ ২০০২ সালে আইনের মাধ্যমে পলিথিন ব্যাগের উৎপাদন, পরিবহন, মজুদ ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছিল। শুরুতে প্রশাসনের কঠোর অভিযানে বাজারে এর ব্যবহার অনেকটাই কমে আসে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই অভিযান শিথিল হয়ে পড়ে। বর্তমানে অধিকাংশ বাজার, মুদি দোকান, সুপারশপ, হাসপাতাল এবং ওষুধের দোকানে প্রকাশ্যেই পলিথিন ব্যবহার হচ্ছে।

বাধা না থাকায় পলিথিনের ব্যবহার দিনদিন প্রসারিত ও রূপান্তরিত হয়েছে। এখন পলিথিনের বিকল্প হিসেবে বাজারে এসেছে টিস্যু ব্যাগ। পরিবেশবাদীদের মতে, এটিও মূলত প্লাস্টিক। প্লাস্টিকের মূল উপাদান পলিপ্রোপাইলিন অপচনশীল পদার্থের তৈরি পলিথিন ব্যাগ বা যেকোনো পণ্য বা মোড়ক পরিবেশের জন্য সমান ক্ষতিকর। তথ্যমতে, পলিথিন তৈরি কাঁচামাল পলি-ইথাইলিন ও পলিপ্রোপাইলিন ১২০ থেকে ১৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় গলনাঙ্কে কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং কার্বন-মনোক্সাইড গ্যাস ছড়িয়ে অক্সিজেনের মাত্রা কমিয়ে বাতাসকে মারাত্মকভাবে দূষিত করে। পলিথিন ব্যাগের মতো পলিথিনজাতীয় কাঁচামাল দিয়ে তৈরি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অপচনশীল প্যাকেট ও মোড়ক যত্রতত্র নিক্ষিপ্ত হচ্ছে, যা মাটি, পানি, বাতাসকে দূষিত করাসহ পরিবেশের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

পলিথিনের উৎপাদন, বিপনন ও ব্যবহার কেন বন্ধ করা যাচ্ছে না জানতে চাইলে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (মেট্রো-১) মো. আব্দুল জব্বার ম-ল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে বন্ধ হচ্ছে কিনা সেটি তদারকি করা অধিদপ্তরের কাজ নয়। আমাদের কাজ অভিযান পরিচালনা করা, জরিমানা করা। আমাদের কাছে অভিযোগ দেওয়া হলে অভিযোগকারীর তথ্য অনুযায়ী অভিযান পরিচালনা করি। মনিটরিং যারা করেন তাদের তথ্যের ভিত্তিতেও আমরা অভিযান পরিচালনা করি।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানী পুরান ঢাকার ইসলামবাগ এলাকায় এ ধরনের পলিথিন কারখানা আছে ভূরিভূরি। গুনে শেষ করাও কঠিন। আশপাশে আরও বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয়রা জানে কোথায় কোথায় বানানো হয় ব্যাগগুলো। কখনো কখনো পরিবেশ অধিদপ্তর বা বিভিন্ন বাহিনীর ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালালেও কদিন যেতে না যেতেই চালু হয় আবার কারখানা।

ইসলামবাগ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে অধিকাংশ বাড়িতেই রয়েছে কোনো না কোনো প্লাস্টিক কারখানা। এর একটি বড় অংশে তৈরি হয় পলিথিন। সেই সঙ্গে আছে অজস্র গুদাম। সংশ্লিষ্ট মহল্লার বাসিন্দারা জানান, সেখানকার প্রতি দশটি বাড়ির মধ্যে সাতটিতেই কারখানা। এর মধ্যে বেশিরভাগ কারখানাতেই পলিথিন ও প্লাস্টিকপণ্য তৈরি হয়। এগুলোতে প্রায়ই আগুন লাগে। তবে স্থানীয়দের আপত্তি থাকলেও কারখানা সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে মালিকপক্ষের সঙ্গে কখনোই পেরে উঠছে না তারা।

রাজধানীর মাঝে এ যেন পলিথিনের শহর, পলিথিনের দেশ। শহর-বন্দর-গ্রামে, হাটে-বাজারে, টিনের ঘর থেকে দালানে, হাতে হাতে শুধু পলিথিন আর পলিথিন। পরিবেশ, জনজীবন, জলাধার, ভূমি, নদী, সমুদ্র, প্রকৃতির জন্য হুমকিস্বরূপ এই পলিথিন নিষিদ্ধ হলেও এর উৎপাদন, বিপণন এবং বিক্রি অনেকটা ওপেন সিক্রেট। প্রশাসনের নাকের ডগায় পলিথিন এবং নিম্নমানের প্লাস্টিকপণ্য দেদার বিক্রি, ব্যবহার এবং ফেলে দেওয়া হলেও কারোই যেন কিছু করার নেই।

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (বর্জ্য ও রাসায়নিক পদার্থ ব্যবস্থাপনা) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ এককভাবে পরিবেশ অধিদপ্তরের কাজ নয়। পরিবেশ অধিদপ্তর অভিযান করবে আর নাগরিকরা পলিথিন ব্যবহার করতেই থাকবে। এ ধারণা ঠিক নয়। সব অংশীজনকে পলিথিন ও প্লাস্টিক ব্যবহারে সতর্ক হতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তর ইতিমধ্যে বেশকিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে যা সফল বাস্তবায়নে পলিথিন ও প্লাস্টিক ব্যবহার কমে আসবে। যারা পলিথিন ও প্লাস্টিক উৎপাদন করে তাদের বিকল্প পণ্য উৎপাদনে নিয়োজিত করার জন্য কাজ করছে পরিবেশ অধিদপ্তর। পরিবেশ অধিদপ্তর ডিজিটাল ক্যাম্পেনের ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানান তিনি

রাজধানীর লালবাগ, কামালবাগ, কামরাঙ্গীরচর ও চান্দিরঘাট পুরো এলাকায় প্রশাসনের নাকের ডগায় অননুমোদিত প্লাস্টিক উৎপাদন ও বিপণন হচ্ছে। ওই এলাকায় প্রকাশ্যে ৯ শতাধিক অবৈধ পলিথিন উৎপাদন কারখানা রয়েছে বলে পরিবেশ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানায়।

প্লাস্টিক ও পলিথিন পণ্য উৎপাদনকারী এসব কারখানা মূলত জেগে ওঠে সন্ধ্যা থেকে। কামালবাগে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, মহোৎসবে সেখানে ফেলে দেওয়া পলিথিন গলিয়ে এবং প্রক্রিয়াজাত করে নতুন পলিথিন ও নিম্নমানের প্লাস্টিকপণ্য তৈরি করা হচ্ছে। ছোট-বড় কাঁচা দেওয়ালের ঘরগুলোতে একাধারে এ কাজ করছেন নারী ও পুরুষ শ্রমিকরা।

পুরো কামালবাগ এবং কামরাঙ্গীরচরজুড়েই এ রকম কারখানা। কাজ চালিয়ে গেলেও শ্রমিকদের তটস্থ থাকতে দেখা যায়। সেখানকার পলিথিন প্রস্তুত কারখানার কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও তারা রাজি হয়নি।

দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কামরাঙ্গীরচরের মুুদি মালামাল ব্যবসায়ী সুমন দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুরো কামালবাগ ও কামরাঙ্গীরচরসহ আশপাশের অনেক জায়গায় পলিথিন এবং নিম্নমানের প্লাস্টিকের পণ্য প্রস্তুত হয় প্রতিদিনই। সারা দেশের পলিথিন মূলত এখানেই উৎপাদন হয়। তিনি বলেন, পলিথিন উৎপাদন নিষিদ্ধ বলে অনেক জায়গায় খুব ছোট-ছোট ঘরে দরজা লাগিয়ে চলতে থাকে পলিথিনের উৎপাদন।

কামালবাগ থেকে চুড়িহাট্টা এবং বেগমবাজারে এসে সরেজমিন দেখা যায়, এখানে প্রশাসনের লোকের সামনেই বিক্রি হচ্ছে পলিথিন এবং নিম্নমানের প্লাস্টিকপণ্য। এক দোকানিকে বাজারে ব্যবহার হওয়া পলিথিনের দাম জিজ্ঞেস করতেই বলেন, পলিথিনের কেজি ১৫০ টাকা। ১ কেজিতে ১২০ টা বড় পলিথিন হয়। বিভিন্ন সাইজের আছে। এ সময় একই স্থানে টহল পুলিশের অবস্থানও দেখা যায়।

পরিবেশবিদদের মতে, শুধু আইন করলেই হবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, স্থানীয় প্রশাসন, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বাজারে নিজস্ব ব্যাগ বহনের অভ্যাস ফিরিয়ে আনা, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিরুৎসাহিত করা এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যাগ ব্যবহারে মানুষকে উৎসাহিত করতে হবে।

দুই দশক আগে বাংলাদেশ পলিথিন নিষিদ্ধ করে বিশ্বে উদাহরণ সৃষ্টি করেছিল। এখন প্রয়োজন সেই উদ্যোগকে আবার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা। অবৈধ কারখানার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান, কঠোর আইনপ্রয়োগ, সাশ্রয়ী পরিবেশবান্ধব বিকল্পের প্রসার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া পলিথিনের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। পরিবেশ রক্ষা শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়, প্রতিটি নাগরিকেরও দায়িত্ব। কারণ আজকের সচেতন সিদ্ধান্তই আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ নিশ্চিত করতে পারে।

জানতে চাইলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ুপরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শামিমা বেগম বলেন, এই মন্ত্রণালয়ের সব কাজ মানুষকে নিয়ে করতে হয়। আমাদের কাজ সচেতনতা বৃদ্ধি করা। আমরা তাই করার চেষ্টা করছি। আমরা মানুষকে পরিবেশদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব বোঝানোর চেষ্টা করেছি। তারা না শুনলে আমরা কী করতে পারি। মানুষের কাজগুলো তো আর আমরা গিয়ে করে দিতে পারি না। দেশের মানুষ যদি তাদের ভালো না বুঝতে চায় তাদের কীভাবে তা বোঝানো যাবে। তিনি আরও বলেন, মানুষ সচেতন হলে পরিবেশদূষণের কোনো সুযোগই থাকবে না। এর বাইরে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

নিষিদ্ধ পলিথিন উৎপাদন ও বিপণনের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিককালে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো অভিযান পরিচালনা না করলেও বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) -১১। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমান্ডার মো. নাইম উল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, নারায়ণগঞ্জে নিষিদ্ধ অবৈধ পলিথিন উৎপাদনের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত অভিযান চলমান রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসন সব অভিযানে র‌্যাব সহায়তা করে থাকে। কিছুদিন আগে ৪টি কারখানায় অভিযান চালানো হয়। অভিযানে মোট ৭ টন পলিথিন এবং ৭৮ বস্তা পিপি দানা জব্দ করা হয়। কারখানার বিদ্যুৎসংযোগও বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। (শেষ)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত