বিলুপ্তির পথে হাতে লেখা রঙ তুলির শিল্প

প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে সারাদেশে। জীবনের গতি এখন হাতের মুঠোই। হাতের ইশারায় প্রযুক্তির কাজ ঘরে বসে করা যাচ্ছে। দেশের অফিস-আদালত, শিল্প-কারখানা, কৃষি পর্যন্ত প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে পড়ছে। জীবনে গতি দ্রুত সময়ে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তি মানুষের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করছে। প্রতিটি সেক্টরে প্রযুক্তির ব্যবহার অনেকটাই নিশ্চিত কাজ করছে। হাতের মুঠোই মোবাইল ফোনে ঘরে বসে বিশ্বের সব ধরনের খবরা-খবর পাওয়া যাচ্ছে। ঘরে বসে ডলার, লাখ টাকা আয় করছে তরুনরা। প্রযুক্তি কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করছে বটে তবে কিছু কর্মসংস্থান ধ্বংসও করছে।

শহর-গ্রামে চোখে খুঁজলে দেখা যেত কতই না রঙ বে-রঙের চিত্র, দৃশ্য, হাতে আঁকা ছবি, কার্টুন, মজার মজার চিত্র। হাতে লেখা রং তুলিতে চিত্র-চারু শিল্পীদের আঁকা-বাঁকা কারুকাজ, হাতের লেখা কাপড়ের ব্যানার, পেস্টুন, ছবি, তোড়ন, দেয়ালে দেয়ালে ছবি, গাছের ডালে পোস্টার, ব্যানার, ছবি আকাঁ চিত্র। তবে এখন আর দেখা মিলছে না সেসব হাতের আকাঁ রঙ তুলির চিত্র, ব্যানার, পেস্টুন, আঁকা-বাঁকা ছবি। প্রযুক্তিতে হারিয়ে গেছে হাতে লেখা চিত্র-চারু শিল্পীরা। দেশের হাজারো চারু শিল্পীরা প্রযুক্তি নির্ভর কর্মসংস্থান হারিয়ে জীবন-জীবিকা সংসারের অভাব অনটনে অন্য পেশায় বদল হচ্ছে। রঙ তুলির শিল্পীদের নতুন প্রযুক্তি নির্ভর কর্মসংস্থানের বিকল্প ব্যবস্থা করা উচিত। 

লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে মো.মাকসুদ জানান, তার বয়স যখন ১২-১৩ তখন হাতে তুলে নেওয়া রঙ তুলি ছিল কর্মসংস্থানের বড় সাফল্য। দোকানের নাম ছিল 'মাকসুদ আর্ট'। প্রতিদিনের আয়ে সংসারে বাবা-মা, পরিবার-পরিজনের দৈনন্দিন খরচ যোগার হত আনন্দ করে। রাজনীতির ব্যানার, পেস্টুন, প্রে কার্ড, বিলবোর্ড সবই হাতে রঙ তুলি দিয়ে আঁকতে হতো। মানুষের লাইন পড়ে যেত কাজ শেষ করতে পারতাম না। তখন পুঁজি ছিল রঙ, তুলি, সুতা, কাপড় আর নিজের বুদ্ধি। কম টাকায় বেশি পরিশ্রমে বেশি আয় হতো। এখন প্রযুক্তির যুগ চালু হয়েছে। প্রযুক্তিতে চলতে পারছি না। যুগের তালে পুঁজি বেশি খাটাতে হয়। প্রযুক্তির ব্যবহারে লাখ টাকার মেশিন কিনতে হয়। হাতে লেখা ব্যানার, পেস্টুন, প্রে-কার্ড রঙ তুলিতে আঁকতে সময় লাগে। মানুষ প্রযুক্তির যুগে দেরি করতে চায় না। তারা দ্রুত সময়ে কাজ সারতে চায়। 

তিনি আরও জানান, গত দশ বছর বেকার জীবনের ঘানি টানছি। আর্টের কাজ ছাড়া অন্য কাজ জানা নেই। জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় শেষ। এখন অন্য কাজে মনোযোগী হওয়ার উপায় নেই। সংসার-পরিবার চালাতে হয়। প্রযুক্তি নির্ভর ব্যবসা করতে পুঁজি প্রচুর দরকার। এত পুঁজি নেই। তাই কোনোমতে জীবন চলছে। মাঝে-মধ্যে কিছু নদীর নৌকায় টাঙানো প্লাগ তৈরি করি। 

মো. কামাল জানান, হাজির হাট বাজারে দোকান ছিল। প্রচুর আর্টের কাস্টোমার ছিল। আর্টের কাজ করতে করতে রাত পোহাত, তারপরও কাজ শেষ হতো না। এখন কাজ নেই। দোকান ভাড়া অনেক মাস বাকি ছিল, দোকান ছেড়ে দিয়েছি। অন্য কাজে মনোযোগী হচ্ছি। কেউ খোঁজ করলে এসে কাজ করে দেই। রঙ তুলির কাজ শিখতে অনেক বছর সময় লেগেছে। প্রযুক্তি জীবনের মোড়ে অন্ধকার নামিয়ে দিয়েছে। দেশ প্রযুক্তি নির্ভর হচ্ছে। তবে আমরা যারা রঙ তুলির পেশায় ছিলাম সবাই শেষ হয়ে গেছি। রঙ তুলির কাজ এখন হাতে নয়, মেশিনে হচ্ছে। 

আনন্দ আর্টের মালিক আনন্দ চন্দ্র দাস জানান, প্রযুক্তির যুগে হাতে লেখা রঙ তুলির কাজ কেউ করাতে চায় না। সবার কাজের প্রতি দৌঁড়াদৌঁড়ি। জীবনের গতি ঠিক রাখতে রঙ তুলির আর্টের সাথে ফুলের দোকান, ঘড়ির দোকান দিয়েছি। হাতে লেখা কাজ নেই। কিছু কাজ হয়, সেগুলো নদীর বিভিন্ন রঙের দৃশ্য চিত্র। জীবনের তাগিদে কাজ না ছেড়ে দরে রেখেছি, কিছু কাজ আসলে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে করে দেই। অনেক রঙ তুলির শিল্পী কাজ ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় জড়িয়ে গেছে। রঙ তুলির কাজ একেবারেই নেই। প্রযুক্তির যুগে আমরা হারিয়ে গেছি। রঙ তুলি বিলুপ্তির পথে।

সপ্তর্ষি এ্যাডের মালিক নুর নবী জানান, রঙ তুলির রঙ ছেড়ে এখন প্রযুক্তির দিকে হাটঁছি। রঙ তুলি দিয়ে কাজ হয় না। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় রঙ তুলি শিল্পীরা বিলুপ্ত, হারিয়ে যাচ্ছে। কিছু শিল্পী জীবনের তাগিদে দার-দেনা করে মোটা অংকে মেশিন কিনে ডিজিটাল কাজ করছে। তবে গ্রামে মেশিন কিনে ব্যবসা পোষায় না। লোকসান গুনতে হয়। প্রায় ৩০ লাখ টাকা খরচ করে মেশিন কিনেছি, কিন্তু পর্যাপ্ত কাজ নেই। কোনোমতে ব্যবসা ঠিকে রেখেছি। রঙ তুলির খরচ ছিল কম, আয় ছিল বেশি। অনেক রঙ তুলি শিল্পী কাজ ছেড়ে অন্য পেশায় বদল হচ্ছে। রঙ তুলির শিল্পী নেই বললেই চলে।

জানা যায়, উপজেলার হাজির হাটের সপ্তর্ষি এ্যাড, আনন্দ আর্ট, মাকসুদ আর্ট, কামাল আর্ট, মাতাব্বর  হাটের ডালিম আর্ট, করইতোলা বাজারে ডিজিটাল সাইন, তোরাবগন্জে আয়ান ডিজিটাল সাইন, জমিদার হাট আশ্রমে এসডি হিরা সাইন, রামগতিতে রাজিব ডিজিটাল সাইন ছিল। এখন অনেকেই ব্যবসা বা দোকান ছেড়ে বিদেশ এবং অন্য পেশায় জড়িয়ে পড়েছে। যারা রয়েছে, তারা প্রযুক্তিতে ডিজিটাল মেশিন ব্যবহার করে কোনমতে ঠিকে রয়েছে। এছাড়াও আর্টের পাশাপাশি অন্য পেশায় ঝুঁকে পড়ছে। 

উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মুহাম্মদ আজমল হোসাইন জানান, যুব উন্নয়ন বেকার যুব সমাজ নিয়ে কাজ করছে। যারা বেকার, কাজ নেই, তারা যোগাযোগ করলে প্রশিক্ষণে দিয়ে তাদের কর্মসংস্থানের জন্য ঋন দেয়া হয়। প্রযুক্তির কারণে রঙ তুলির ব্যক্তিরা কর্মসংস্থান হারিয়েছে, তাদের কর্মসংস্থানে ফিরে যেত সকল সহযোগিতা দেওয়া হবে।