ধর্মীয় সংগঠন ‘ইসকন’কে নিয়ে এক ব্যবসায়ীর ফেসবুক পোস্ট শেয়ার করা নিয়ে নগরের হাজারি গলিতে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সংঘর্ষের ঘটনায় সন্দেহভাজন ৮০ জনকে আটক করা হয়েছে। বুধবার (৬ নভেম্বর) দুপুরে নগরের দামপাড়ায় সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড ক্যাম্পে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানিয়েছেন যৌথবাহিনীর পক্ষে টাস্কফোর্স-৪ এর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফেরদৌস আহমেদ।
সেনাবহিনীর মুখপাত্র বলেন, ‘বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ ও গোয়েন্দা তথ্য যাচাই-বাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত দুষ্কৃতিকারীদের শনাক্তকরণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আটক ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্ট থানায় জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতে হস্তান্তরের বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যৌথবাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং হাজারি গলিসহ নগরের অন্যান্য এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।’
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, ‘আইন তার নিজস্ব ধারায় চলবে। মাঠপর্যায়ে আমরা গোয়েন্দা তথ্য যাচাই বাছাই করছি। সে অনুযায়ী আমরা আইনি প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করবো। সরকার পতনের পর যেসকল শান্তিপূর্ণ সমাবেশ হয়েছে, সেসব সমাবেশে যেন শান্তি বিঘ্নিত না হয় আমরা সেজন্য সরকারের গাডলাইন অনুযায়ী কাজ করেছি।’
তিনি বলেন, ‘যেহেতু ওই এলাকায় সেনা ও পুলিশ সদস্যের ওপর এসিড নিক্ষেপ করা হয়েছে সেই প্রেক্ষিতে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে দোকানগুলো সিলগালা করা হয়েছে। আমরা সংশ্লিষ্টতা খুঁজে বেড়াচ্ছি। দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোকানগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম নিশ্চিত করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দুষ্কৃতকারীদের কোনো পলিটিক্যাল পরিচয় আসলে আসে না। তাদের জাতি, ধর্ম, বর্ণ নেই।’
সংবাদ সম্মেলনে নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (জনসংযোগ) কাজী মো. তারেক আজিজ ছাড়াও আরও উপস্থিত ছিলেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়নের (র্যাব) একজন করে প্রতিনিধি।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফেরদৌস আহমেদ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৫টায় মিয়া শপিং সেন্টারের ‘মোল্লা স্টোর’ নামের একটি দোকানের মালিক ওসমান আলী হিন্দুদের ধর্মীয় সংগঠন ইসকন’র বিরুদ্ধে ফেসবুকে একটি পোস্ট শেয়ার করেন। মূলত ওই পোস্টকে কেন্দ্র করে হাজারি গলিতে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। সন্ধ্যার দিকে আনুমানিক ৫০০ থেকে ৬০০ জন দুষ্কৃতিকারী হাজারি গলিতে ওসমান আলী ও তার ভাইকে হত্যা এবং দোকান জ্বালিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে জড়ো হয়। স্থানীয় কন্ট্রোল রুম থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং বিজিবি সদস্যদের ৬টি টহল দল সেখানে পৌঁছায়।’
বিশৃঙ্খলাকারীদের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় জানমাল রক্ষা এবং মব জাস্টিস রোধে যৌথবাহিনী ওসমান আলী ও তার ভাইকে উদ্ধার করার কথা জানিয়ে সেনা কর্মকর্তা ফেরদৌস বলেন, ‘উত্তেজিত জনতাকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধানের বিষয়টি আশ্বস্ত করা সত্তে ও একপর্যায়ে উগ্র বিশৃঙ্খলাকারীরা আরো আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। দুর্বৃত্তরা এসময় যৌথবাহিনীর ওপর অতর্কিতভাবে জুয়েলারির কাজে ব্যবহৃত এসিড হামলা চালায় এবং ভারী ইটপাটকেলসহ ভাঙা কাঁচের বোতল ছুঁড়তে শুরু করে। ফলে সেনাবাহিনীর পাঁচজনসহ ৭/৮জন পুলিশ সদস্য আহত হন। আহত সেনাসদস্যরা বর্তমানে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল, চট্টগ্রামে চিকিৎসাধীন।
এছাড়াও, ঘটনাস্থলে দুর্বৃত্তরা ইট ছুঁড়ে সেনাবাহিনীর একটি গাড়ির সামনের কাঁচ ভেঙে ফেলে। উদ্ধার অভিযানের পর দুর্বৃত্তদের শনাক্তকরণে যৌথবাহিনীর ১০টি টহল দল আনুমানিক ৯টার দিকে ওই এলাকায় গেলে লুকিয়ে থাকা দুষ্কৃতিকারীরা ফের যৌথবাহিনীর ওপর এসিড সদৃশ ছুঁড়তে শুরু করে। এ সময় যৌথবাহিনী ঘটনাস্থল থেকে ৮০ জন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করতে সক্ষম হয়।’
এ দিকে মঙ্গলবার রাতের ঘটনায় বুধবার বেলা আড়াইটার দিকে এই প্রতিবেদন লেখার সময় হাজারি গলিতে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। এর আগে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত হাজারি গলিতে অবস্থান করে দেখা গেছে, সব দোকানপাট বন্ধ। স্বর্ণ এবং ওষুধসামগ্রী বিক্রির দোকান বেশিরভাগই সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে।
অলিগলিতে ঘোরাফেরা মানুষ। ওষুধের দোকান বন্ধ থাকায় অসংখ্য ক্রেতা ফিরে যান। হাজারি গলির প্রধান ফটক বন্ধ করে দিয়েছে সেখানকার ব্যবসায়ীরা। ফটকে দায়িত্বপালন করছেন পাঁচ-ছয়জন পুলিশ সদস্য। ব্যবসায়ীদের মাঝে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা বিরাজ করছে। নগরের কোতোয়ালি থানার ফটকে, লালদিঘি এলাকার মহল মার্কেটের সামনে এবং নিউমার্কেট এলাকায় পুলিশ ও সেনা সদস্যদের সতর্ক অবস্থান দেখা গেছে। কোতোয়ালি থানা ভবনে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি সাংবাদিকদেরও।
পুলিশ সুত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার রাতের দিকে হাজারি গলি এবং আশপাশের এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হলেও বুধবার সকাল নাগাদ তা শিথিল করা হয়। সিলগালা করা দোকান কবে খুলবে তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। কে সি দে সড়কের মুখেই রাখা হয়েছে পুলিশের একটি প্রিজনভ্যান।