বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলোরতৃতীয় তলায় এক মা ও তাঁর দুই শিশুকন্যার রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে ক্রমেই রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে। ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। অথচ ঘটনার পরপরই পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে ‘প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা’ বলে মন্তব্য করা হয়েছে। সেই মন্তব্যকেই এখন প্রশ্নবিদ্ধ দাবি করছেন নিহত ইতি রানীর স্বজনরা। তাদের দাবি, এটি আত্মহত্যা নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
বুধবার বিকেলে বরগুনা শহরের থানাপাড়া এলাকায় জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর তৃতীয় তলার দুটি কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয় ইতি রানী (৩৪), তাঁর বড় মেয়ে আরাধ্য বিশ্বাস (১১) এবং ছোট মেয়ে অনুরাধা বিশ্বাসের (৩) মরদেহ। একই ভবনের পাশাপাশি দুটি কক্ষে তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাটি শুরু থেকেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার পর বুধবার সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে বরগুনার পুলিশ সুপার কুদরত-ই-খুদা বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ ও কক্ষের পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রাথমিকভাবে এটিকে আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হচ্ছে। তার এই মন্তব্যের পরই প্রশ্ন উঠেছে-ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, আলামত বিশ্লেষণ কিংবা ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল হাতে পাওয়ার আগেই কীভাবে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হলো?
ইতি রানীর জা(দেবরের স্ত্রী) মনি রানী বলেন, ‘তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই পুলিশ আত্মহত্যার কথা বলছে। এতে আমাদের মনে সন্দেহ আরও বেড়েছে। আমরা মনে করি এটি নিশ্চিতভাবে হত্যা।’
স্বজনদের অন্যতম বড় প্রশ্ন সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে। ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ২ মিনিট ১৯ সেকেন্ডর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে যেখানে শুধু মাত্র ইতি রানী ও তার সন্তানদের নিয়ে রুমে প্রবেশের ভিডিও রয়েছে এর আগে পিছে আর কোন ভিডিও নেই।
নিহতের ভাই মিত্র সরকার জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাত্র পাঁচ-ছয় মিনিটের একটি ফুটেজ দেখা গেছে। সেখানে ইতি রানীকে ডাকবাংলোয় পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে দেখা যায়। কিন্তু এরপর কী ঘটেছে, কারা সেখানে প্রবেশ করেছে, কারা বের হয়েছে সেসব দৃশ্য প্রকাশ করা হয়নি।
তার প্রশ্ন, ‘আমার বোন সকাল ১১টার দিকে ডাকবাংলোয় গিয়েছিল। বিকেলে লাশ পাওয়া গেছে। এই দীর্ঘ সময়ের ফুটেজ কোথায়? কেন খন্ডিত ভিডিও দেখানো হচ্ছে?’
ইতি রানীর ভাই মিত্র সরকার বলেন, ডাকবাংলোতে কাজ নেওয়ার পর থেকে আমার বোনের মেয়েরা কখনো ওখানে যায়নি। বুধবার আমার বোনের সেখানে কাজে যাওয়ার কথা ছিলনা। তারপরেও কেন গিয়েছিল সেটা রহস্যজনক।
পুলিশ জানিয়েছে, খাকদোন-৪ নম্বর কক্ষে ইতি রানী ও তাঁর ছোট মেয়ে অনুরাধার মরদেহ পাওয়া যায়। অন্যদিকে খাকদোন-৩ নম্বর কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয় বড় মেয়ে আরাধ্যের মরদেহ। একই পরিবারের তিনজন সদস্য কেন দুটি পৃথক কক্ষে ছিলেন? মৃত্যুর আগে তাদের অবস্থান কী ছিল? ঘটনার সময় কক্ষগুলোর দরজা কখন এবং কীভাবে বন্ধ হলো? এসব প্রশ্নেরও উত্তর এখনও অজানা।
বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, তৃতীয় তলার কক্ষগুলোর বারান্দায় কোনো গ্রিল নেই। ডাকবাংলোর তত্ত্বাবধায়ক নুরুল ইসলামও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বৃহস্পতিবার দুপুরে এই প্রতিবেদককে বলেন, বারান্দায় গ্রিল না থাকায় এখানে আসা অতিথিরা অরক্ষিত থাকেন। তবে বারান্দার থাই গ্লাসের লকগুলো নষ্ট কি-না এ প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এটা আমার দেখার দায়িত্ব না।’
বৃহস্পতিবার বিকালে শেষ হয়েছে ইতি রানী ও তার দুই সন্তানের ময়না তদন্ত। ময়নাতদন্ত শেষে বৃহস্পতিবার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলে লাশ নিয়ে স্বজন ও এলাকাবাসী বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। এসময় তারা ইতি রানী ও তার সন্তানদের মৃতদেহ নিয়ে শহরের বিভিন্ন সড়কে বিক্ষোভ করে বিচার ও সুষ্ঠ তদন্তের দাবি করেন।
ইতি রানীর স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, আমার স্ত্রী আর দুই মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে। এর পেছনে বড় ধরনের ষড়যন্ত্র রয়েছে। আমি সুষ্ঠু তদন্ত চাই। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন এবং সম্পূর্ণ সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করার দাবিও করেন তিনি।
বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. আবুল ফাত্তাহ জানিয়েছেন, ময়নাতদন্তে তাৎক্ষণিকভাবে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, মরদেহের বিভিন্ন নমূনা উন্নত রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। বিষক্রিয়া, শ্বাসরোধ, বা অন্য কোনো কারণে মৃত্যু হয়েছে কি না, তা পরীক্ষার ফল পাওয়ার পর জানা যাবে।
বরগুনার পুলিশ সুপার কুদরত-ই-খুদা বলেন, এ ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিহতদের পরিবার থেকে এখন পর্যন্ত কেউ থানায় অভিযোগ দায়ের করেনি। তারা অভিযোগ দিলে পুলিশ অবশ্যই মামলা গ্রহণ করবে।
