গজনফর ঘূর্ণিতে লেজেগোবরে বাংলাদেশ

২ উইকেটে ১২০ রান থেকে ১৪৩ রানে অলআউট। শেষ ২৩ রানে ৮ উইকেটের পতন। শারজায় এভাবেই অবিশ্বাস্যভাবে হেরে গেছে বাংলাদেশ। আগে ব্যাট করা আফগানিস্তানকে ২৩৫ রানে অলআউট করার পর বাংলাদেশ ৩৪.৩ ওভারে ১৪৩ রানেই অলআউট হয়ে হেরে গেছে ৯২ রানে। অফ স্পিনার গজনফর ২৬ রানে নিয়েছেন ৬ উইকেট।

২০ ওভারেই ৭১ রানে ৫ উইকেট পড়ে গেলে একটা দলের দলীয় সংগ্রহ কত হতে পারে ওয়ানডে ম্যাচে? এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে নানান রকম পূর্বাভাস চলে আসে। ৭১ রান তুলতেই দলের অর্ধেক ব্যাটসম্যান ড্রেসিংরুমে ফিরে আসলে স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া যায় যে, পরের পাঁচজন মিলে হয়তো এর চেয়ে কম রানই করবেন। হয়তো দলীয় সংগ্রহটা টেনেটুনে দেড়শ হবে। কিন্তু প্রতিপক্ষ যদি বাংলাদেশ হয়, তাহলে জেনে রাখুন নিশ্চিতভাবেই লেজের কোনো একটা জুটিকে বড় রান করতে দেবেন বোলাররা। খুব সম্ভবত তাদের মাথায় গেঁথে গেছে প্রথম ৫-৬টা উইকেট নিলেই খেলাটা শেষ, বাকিদের রান যোগ হয় না। চেন্নাই টেস্টে রবীন্দ্র জাদেজা-রবিচন্দ্রন অশ্বিন, ঢাকা টেস্টে কাইল ভেরায়েন-উইয়ান মুল্ডার, চট্টগ্রামে মুল্ডার-মুত্থুস্বামী... এমন অজস্র উদাহরণের দেখা মিলবে স্কোরকার্ড ঘাঁটলে। কাল শারজাতেও তাই হলো। ষষ্ঠ উইকেটে মোহাম্মদ নবি এবং হাশমতউল্লাহ শাহিদি মিলে গড়লেন ১০৪ রানের জুটি। এ দুজনকে আউট করার পর স্পিনার নানগেলিয়া খারোটি, ২৮ বলে অপরাজিত ২৭ রানের ইনিংস খেলতে দিয়েছে বাংলাদেশ। রান আউটের সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে, মাহমুদউল্লাহ ক্যাচও ফেলেছেন নবির; সব মিলিয়ে একটা ম্যাচে প্রতিপক্ষকে চাপমুক্ত করতে যা যা করার ঠিক তাই করেছেন বাংলাদেশের ফিল্ডাররাও। ফল ৭১ রানে ৫ উইকেট হারাবার পর বাকি ৫ উইকেটে আফগানরা তুলেছে আরও ১৬৪ রান, ৪৯.৪ ওভারে আফগানদের স্কোর ২৩৫।

দুই ক্রিকেটার এখনো দলের সঙ্গে যোগ দিতে না পারায় বাংলাদেশের জন্য একাদশ সাজানোটা ছিল কঠিন, জাকের আলি অনিক এবং জাকির হাসানকে বাইরে রেখে বাকি সবাই নেমেছেন মাঠে। উইকেটের পেছনে জায়গাটা নিয়েছেন মুশফিকুর রহিম। বাংলাদেশের বোলিংয়ের শুরুটা ভালোই হয়েছিল, দ্বিতীয় ওভারেই মুশফিকের হাতে ক্যাচ দেন রহমানউল্লাহ গুরবাজ। ওয়ানডাউনে ইমার্জিং এশিয়া কাপ মাতানো সাদেকুল্লাহ আতাল ৩০ বলে ২১ রানে ফেরেন মোস্তাফিজুর রহমানের বলে। এক বল পর আজমতউল্লাহ ওমরজাইকেও আউট করেন ফিজ, তার আগে রহমত শাহও ২ রান করে মোস্তাফিজের শিকার। ৩০ থেকে ৩৫, এই ৫ রানের ভেতর ৩ উইকেট হারিয়ে ধুঁকতে থাকা আফগানদের জন্য মৃতসঞ্জীবনী সুধার ভূমিকায় অধিনায়ক ও নবি। এ দুজনের ১০৪ রানের জুটিতেই ম্যাচে ফেরে আফগানরা। শাহিদি ৯২ বলে ৫২ রান করেন; অন্যদিকে ৭৯ বলে ৮৪ রান করা নবি জুগিয়েছেন সাহস।

মোস্তাফিজ ও তাসকিন, দুজনই নিয়েছেন ৪টি করে উইকেট। তাসকিনের ফাইফার হয়েও হয়নি, মাঠের আম্পায়ার আউট দেওয়ার পরও রিভিউতে বেঁচে গেছেন ফজলহক ফারুকি। অন্যদিকে মোস্তাফিজও পঞ্চম শিকারের আশায় শেষ ওভারে এসে ১১ রান দিয়ে বোলিং ফিগারটাক খারাপ করেছেন। ১ উইকেট নিয়েছেন শরিফুল ইসলাম।

উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান তানজিদ হাসান তামিম ইনিংসে চতুর্থ ওভারেই বোল্ড হয়েছিলেন গজনফরের বলে। এরপর সৌম্য সরকার কিছুটা রানে ফেরার আভাস দিলেন, ৪৫ বলে ৩৩ রানের ইনিংসের সমাপ্তিটা ফজলহক ফারুকির বলে পুল করতে গিয়ে বাউন্ডারি লাইনে রশিদ খানের ক্যাচে। এরপর বিস্ময়ের জন্ম দিয়ে চারে ব্যাট করতে এলেন মেহেদী হাসান মিরাজ, মুশফিকুর রহিমের আগে! নাজমুল হোসেন শান্তও রানে ফেরার ঝলক দেখালেন, মিরাজের সঙ্গে তার জুটিটা বেশ ভরসাও জোগাচ্ছিল। ৫৫ রানের জুটি ভাঙে নবির বলে সুইপ খেলতে গিয়ে রশিদের হাতে ক্যাচ দিয়ে। সেই থেকে ধসের শুরু। দলীয় ১২০ রানে শান্ত আউট হলেন, তারপর একে একে মিরাজ, মাহমুদউল্লাহ, মুশফিক ও রিশাদ আউট। গজনফর একই ওভারে আউট করেন মুশফিক, রিশাদ ও তাসকিনকে। হাত ঘোরালেই যেন মুড়ি-মুড়কির মতোই উইকেট মিলছিল তার, অথচ এ ম্যাচের আগে পাঁচ ওয়ানডে খেলে তার মোট শিকারই ছিল ৪ উইকেট!

৩৪.৩ ওভারে ১৪৩ রানে অলআউট বাংলাদেশ, এমন এক ম্যাচে যেখানে ওভারপ্রতি গড়ে সাড়ে চার করে রান করলেই অনায়াসে জেতা সম্ভব। শুরুর ব্যাটসম্যানদেরও অপবাদ দেওয়ার উপায় নেই, খারাপ করেননি বোলাররাও। মিডল অর্ডারে অভিজ্ঞ মুশফিক-মাহমুদউল্লাহরা ধস সামাল দিতে তো পারলেনই না, নিজেরা দলের হার নিশ্চিত করতেই যেন বিদায় নিয়েছেন আগেভাগে। অথচ অভিজ্ঞতা প্রায় নেই এমন ক্রিকেটাররাই হারিয়ে দিল বাংলাদেশকে।