বাংলাদেশের ইতিহাসে দীর্ঘতম স্বৈরাচারী শাসনে অন্যতম লুটপাটের ক্ষেত্র ছিল ব্যাংক খাত। সরকারি প্রভাব খাটিয়ে যথেচ্ছ ব্যাংকিং লাইসেন্স নেওয়া, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি হস্তক্ষেপে চর দখলের মতো ব্যাংক দখল করা, শত শত কোটি টাকা ঋণ নিয়ে রাজনৈতিক প্রভাবে সেগুলো শোধ না করাসহ এই খাতে বেশুমার দুর্নীতি হয়েছে। ধসে পড়েছে অর্থ খাত। এসব অর্থ বিদেশে পাচার করে দেশের যেমন ক্ষতি করা হয়েছে, তেমনি দেদার টাকা ছাপিয়ে মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রাস্ফীতি আকাশ ছুঁয়েছে। এর চড়া মূল্য দিতে হয়েছে দেশের মানুষকে। এসব অপকর্মের পেছনে ছিলেন ব্যাংক খাতের প্রভাবশালীরা। আগস্ট মাসের ৫ তারিখে গণ-আন্দোলনের মুখে পতন হয় আওয়ামী শাসনের। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছে তিন মাস হলো। নানা সংস্কারের মধ্যে অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে জানা গেছে, পটপরিবর্তনের পরও কোনো দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা খুঁজে পাচ্ছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অভিযোগ থাকলেও উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার এখতিয়ার নেই বলে জানা গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ আছে অনেক দিন ধরে। এমনকি ডেপুটি গভর্নরের (ডিজি) মতো উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এস আলমের মতো গ্রুপকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ আছে। তবু তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র হুসনে আরা শিখা জানিয়েছেন, ডেপুটি গভর্নর (ডিজি) নুরুন নাহার এবং ড. হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার নেই বর্তমান গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক (ইডি) পর্যন্ত সব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, ঋণ জালিয়াতি, অবৈধ সুবিধা গ্রহণ এবং অন্যান্য অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারেন গভর্নর। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্য ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
তিনি এও জানিয়েছেন, তিনটি টাস্কফোর্স সংস্কারের কাজ করছে। একটি টাস্কফোর্স ব্যাংকিং সংস্কারে কাজ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়াতে দ্বিতীয় টাস্কফোর্স কাজ করছে। তৃতীয়টা পাচার করা টাকা ফেরত আনার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এখানে বিভিন্ন দেশের আইনজীবী ও কনসালট্যান্ট নিয়োগের কাজ চলছে।
অন্যদিকে, ব্যাংকে তারল্যসংকট গ্রাহকদের অনিশ্চয়তায় ফেলেছে। বেশ কিছু ব্যাংকের গ্রাহক তাদের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলতে পারছেন না। এস আলমের মালিকানাধীন এবং ইসলামী ব্যাংকগুলোয় এই সংকট তীব্র। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র প্রয়োজন ছাড়া ব্যাংক থেকে টাকা না তুলতে গ্রাহকদের আহ্বান জানিয়েছেন। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘গ্রাহকের আমানতের টাকা নিয়ে আতঙ্কের কিছুই নেই, সবাই তার আমানতের টাকা ফেরত পাবেন। কিছুটা সময় লাগবে ব্যাংকগুলো ঘুরে দাঁড়াতে। আমরা সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে গত দেড় মাসে ৫ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকার সাপোর্ট দিয়েছি। যদি আরও বেশি সাপোর্টের প্রয়োজন হয়, তাহলে সে বিষয়েও বিবেচনা করা হতে পারে।’
যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলছেন যে আতঙ্কের কিছু নেই, কিন্তু গ্রাহকপর্যায়ে খুব বেশি স্বস্তি মিলছে না। গ্রাহকপর্যায়ে টাকা তোলা নিয়ে অহেতুক সতর্কবাণী বরং ভীতি আরও বাড়াতে পারে। এর চেয়েও বেশি জরুরি ব্যাংক খাতে বিগত আমলের দুর্নীতিবাজদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা। উপযুক্ত জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার না হলে ব্যাংক খাতের মতো জরুরি এবং স্পর্শকাতর খাতে আস্থা ও গতি ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।