কঠিন সময়টা আর মনে করতে চাই না

হাঁটুর চোটের কারণে পেসার এবাদত হোসেন চৌধুরী দেড় বছর ধরে জাতীয় দলের বাইরে। মোট ৫টি অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। কঠিন সময় পাড়ি দিয়ে এক বছরেরও বেশি সময় পর তিনি আজ সিলেটের হয়ে জাতীয় লিগের ম্যাচ দিয়ে মাঠে ফিরতে চলেছেন। খেলবেন খুলনার বিপক্ষে। তার আগে

নিজের কঠিন সময় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের রাফিদ চৌধুরীর সঙ্গে...

হাঁটুর কী অবস্থা?

এবাদত: হাঁটুতে এসিএল ইনজুরি হয়েছিল। সেটা রিকনস্ট্রাকশন করা হয়েছে। এছাড়া এমসিএল এবং পিসিএলের রিপেয়ার করা হয়েছে। সবমিলিয়ে মোট ৫টি সার্জারি করানো হয়েছিল। তিন মাস হাঁটাচলা একদমই করতে পারিনি। ক্র্যাচে ভর না দিলে দাঁড়ানোরই সুযোগ ছিল না। তারপর একটু একটু করে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছি, এখন পুরোপুরি খেলার জন্য উপযোগী। আগামীকাল (আজ) প্রথম ম্যাচ খেলতে নামব ইনশাআল্লাহ।

চোটের আগে আপনি দারুণ ফর্মে ছিলেন ওয়ানডে বিশ্বকাপে আপনার জায়গাও নিশ্চিত ছিল। কিন্তু চোটের কারণে সেটা খেলতে পারেননি। এমনকি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও খেলতে পারেননি। টিভিতে যখন সতীর্থদের খেলতে দেখেছেন, ঐ সময়টা কেমন লেগেছে?

এবাদত: আসলে খুবই কঠিন সময় ছিল। ঐ সময়টা আমাকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তবে ভালো লাগার সময়ও ছিল। যখন দলের কেউ ভালো ইনিংস খেলেছে, অথবা বাংলাদেশ ম্যাচ জিতেছে। সেই সময়টা ছিল আনন্দের। তবুও মনের কোণে একটা আক্ষেপ তো ছিলই। যে কারণে সময়টা ছিল আমার জন্য বেশ কঠিন। যা অনেক কষ্টে কাটিয়ে উঠতে হয়েছে। যা আসলে আর মনে করতে চাই না।

বাংলাদেশ দল একটা সময় ছিল স্পিন নির্ভর। সেখান থেকে একটা বিপ্লব হয়েছে পেস ইউনিটে। সদস্য সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। এর নেপথ্যে কে?

এবাদত: তাড়নাটা আমাদের পেসারদেরই। তবে অবদান দিতে হবে কয়েকটা মানুষকে। তাদের মধ্যে মুমিনুল (হক) ভাই, ওটিস গিবসন, অ্যালান ডোনাল্ডকে দিতেই হবে। মূলত মুমিনুল ভাই উদ্যোগ নিয়েছিলেন। টেস্ট স্কোয়াডে পেসারদের আধিক্য, একাদশেও পেসারদের প্রাধান্য দেওয়া শুরু হয়েছে তার সময় থেকেই। এক্ষেত্রে তামিম ভাইকেও (তামিম ইকবাল) অবদান দিতে হয়। তিনিও আমাদের বেশ উৎসাহ জুগিয়েছেন। তাদের প্রেরণায় আমি আর তাসকিন চেয়েছি পেসারদের আলাদা একটা ইউনিট হিসেবে দাঁড় করাতে, উৎসাহও পেয়েছি। সময় লেগেছে। গিবসন শুরু করলেও পুরোপুরি আমরা দাঁড়িয়েছি ডোনাল্ডের সময়ে। যে গ্রুপটা এখনো কার্যকর।

মানসিকতায় বদলটা এলো কীভাবে?

এবাদত: ওয়ানডেতে অনেক আগে থেকেই পেসারদের একটা গ্রুপ দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। তবে টেস্টে এটার যাত্রা শুরু হয়েছিল মূলত ২০২১ সালে শেষের দিকে এবং ২০২২  সালের শুরুর দিকে। আমাদের প্রথম পদক্ষেপ ছিল যে পেস ইউনিট হিসেবে আমাদের উন্নতি প্রয়োজন। আমরা শুধু অনুশীলনের সময় নেটে বল করব, আর ম্যাচের দিন বেঞ্চে গিয়ে বসে থাকব! আর ম্যাচ খেলা দেখব, এভাবে আর কতদিন! সুতরাং কাউকে না কাউকে তো এগিয়ে আসতেই হবে। কারণ আমরা সবার মতোই পরিশ্রম করি, ক্ষেত্রবিশেষে একটু বেশিই করি। যেহেতু আমরা পরিশ্রম করছি, তাহলে কেন ম্যাচ খেলব না? কোথায় ঘাটতি আছে সেটা আমরা খুঁজে বের করেছি।

তারপর...

এবাদত: যেমন ধরুন তিন ফরম্যাটেই খেলতে হলে ফিটনেসের উন্নতির প্রয়োজন, সেটা আমরা করেছি। টেস্ট ম্যাচ খেলতে হলে অ্যাকুরেট হতে হবে, সেটা হয়েছি। টি-টোয়েন্টি খেলতে হলে ডেথ ওভারে ভেরিয়েশন প্রয়োজন, সেটা করেছি। আমরা নতুন বলে উন্নতি করেছি। যদি পরিসংখ্যান ঘাঁটেন তাহলে দেখবেন ২০২২-২৩ সালে আমরা অনেক বেশি উইকেট নিয়েছি। বিশ্বের কয়েকটি দেশের মধ্যে আমরা অন্যতম সেরা ছিলাম নতুন বলে উইকেট নেওয়ার ক্ষেত্রে। এসব আমাদের দীর্ঘ পরিশ্রমের ফসল। যখন ওয়ানডেতেও ভালো করা শুরু করলাম, তখন তামিম ভাইও আমাদের সমর্থন দেওয়া শুরু করলেন। একাদশ গঠনের সময় তিনিও পেসারদের প্রাধান্য দেওয়া শুরু করলেন। এই পেস গ্রুপটার ওপর আস্থা রাখা শুরু করলেন তিনি। আমরা এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলাম যে, ঘুরেফিরে আমাদের সবাইকে খেলানো হবে। কারণ টিম ম্যানেজমেন্টের আস্থার জায়গাটা আমরা অর্জন করতে পেরেছিলাম।

আপনার না থাকাটা কি পেস ইউনিটে কোনো প্রভাব ফেলেছে?

এবাদত: সবসময় তো আসলে একভাবে যাবে না। মাঝেমধ্যে কলাপ্স করবে। এই যে আমি খুব ভালো একটা ছন্দে ছিলাম। কিন্তু এক চোটে সেটায় বাধা পড়েছে। আমার চোটের কারণে চাপ বেশি যাচ্ছে তাসকিনের ওপর। তাকে অনেক বেশি ম্যাচ খেলতে হচ্ছে। আমি থাকলে দুজনে ভাগ হয়ে খেলতে পারতাম। ওয়ার্কলোড হতো না। আবার এই সময়ে নতুন যারা আসছে, তাদের পরিচর্যা করতে হবে। আমরা যারা আছি তারাও সেটা করছি, যাকে ফিটনেস নিয়ে পরামর্শ দেওয়া দরকার সেটা দিচ্ছি। যার একটু মোটিভেশনের দরকার দেওয়া হচ্ছে সেটা। আমি হয়তো দূরে আছি বলে সবসময় সেটা দেওয়া হয়ে ওঠে না। তবে যারা আছে তারা কাজটা করে যাচ্ছে। দলীয়ভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে উন্নতি করেছি বলে খুব অল্প সময়েই সবার আস্থা অর্জন করতে পেরেছি। ইনশাআল্লাহ ধৈর্য ধরলে আরও ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে আশা করি।

আবার একটু চোটের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। পুনর্বাসন প্রক্রিয়া কতটা কঠিন?

এবাদত: আসলে অস্ত্রোপচারের পর পুনর্বাসনের প্রক্রিয়াটা অনেক ধীরগতির। আমি জিমে ফিরেছি, অনুশীলন করছি। এই যে দীর্ঘসময় পর ধকল নিচ্ছি, সেটার পর প্লায়োমেট্রিক ড্রিলস বা স্পিড ট্রেইনিং করতে হবে। কারণ অনেকদিন পর শরীরের ওপর চাপ নেওয়াতে একটু সেøা আছে। সেটা আবার জায়গায় ফিরবে ম্যাচ খেলতে খেলতেই। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত যে সময়টা সেটা আসলে একইভাবে যায়নি। মাঝেমধ্যে হতাশ লাগত, খুব খারাপ লাগত। কারণ একই কাজ দিনে দুই তিনবার করা। আসলে পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে যে একবার গেছে সে শুধু বুঝতে পারে কতটা কঠিন সময় এবং কতটুকু মানসিক শক্তির প্রয়োজন এখানে। আলহামদুলিল্লাহ সেই কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি। তবে কষ্টের সময়টা মনে হলে মাঝেমধ্যে মনে কষ্টও লাগে। এখন আসলে এত কিছু বলতেও চাই না। কারণ কাল (আজ) ম্যাচ। দোয়া করবেন আমার জন্য।

দুঃসময়ে কাকে বেশি পাশে পেয়েছেন?

এবাদত: আসলে আমি সবার কাছ থেকেই সমর্থন পেয়েছি। বিসিবির সাবেক সভাপতি, ক্রিকেট অপারেশন্সের চেয়ারম্যান, ম্যানেজার শাহরিয়ার নাফিস ভাই, আমাদের দলের ম্যানেজার নাফিস ইকবাল ভাই, কোচিং স্টাফ ক্রিকেটার সবারই। যখন অ্যাকাডেমিতে ছিলাম, সবাই আমার খবর নিয়েছেন, সুবিধা-অসুবিধা দেখভাল করেছেন। আমি বলব বিসিবির নজরের মধ্যেই ছিলাম এই সময়টা।

দেড় বছর পর কোনো প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলতে নামছেন। আত্মবিশ্বাস কি আগের মতোই? নাকি চোট কোনো প্রভাব ফেলেছে?

এবাদত: আত্মবিশ্বাস আমার সবসময়ের মতোই আছে। এটা নিয়ে আমি চিন্তিত নই। আমার সবসময় ফোকাস থাকে নিজের খেলার দিকে। আমি পারফরম্যান্স করার চেষ্টা করি। এবারও সেদিকে নজর থাকবে। তবে দীর্ঘদিন পর খেলতে নামলে শুরুতে একটু লাইন-লেংথ ঠিক রাখতে সমস্যা হয়। তবে সেটাও দ্রুতই ঠিক হয়ে যাবে আশা করছি।

আবার জাতীয় দলে ফিরতে চান?

এবাদত: অবশ্যই চাই। সেটাই তো প্রত্যেক ক্রিকেটারের কাক্সিক্ষত লক্ষ্য থাকে। তবে জাতীয় দলের স্কোয়াডে ফেরানোর দায়িত্ব নির্বাচকদের। আর তাদের নজরে পড়তে হবে আমাকে পারফরম্যান্স দিয়ে। বাকি যেহেতু কিছুই আমার হাতে নেই, তাই আমি আমার কাজটাই করতে চাই।

জাতীয় লিগে এবার সিলেটকে নিয়ে কী প্রত্যাশা?

এবাদত: পয়েন্ট তালিকায় আমরা এখন শীর্ষে। ইনশাআল্লাহ আমরাই চ্যাম্পিয়ন হব।

বাংলাদেশের খেলা দেখেছেন?

এবাদত: হ্যাঁ দেখেছি। প্রথম ম্যাচটা আমরা দুর্ভাগ্যবশত হেরে গেছি। আশা করি পরের ম্যাচে ভুলগুলো শুধরে আমরা ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যাচ জিতব।