ইউপি থেকে সংসদ সবখানেই পরিবারতন্ত্র!

মৌলভীবাজার-৪ (কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল) আসনের ৭ বারের সংসদ সদস্য (এমপি) সদ্য সাবেক কৃষিমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা উপাধ্যক্ষ ড. আব্দুস শহীদ। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। দীর্ঘ এ সময়ে জেলা ও উপজেলার রাজনীতিতে শহীদ পরিবারের ছিল একক আধিপত্য। আর এই একক আধিপত্য ধরে রাখতে নিজের ৩ ভাই ও বড় মেয়েকে দলীয় পদ দেওয়ার পাশাপাশি বানিয়েছেন জনপ্রতিনিধিও।

প্রভাব খাটিয়ে নিজের ছোট ভাইকে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং আরেক ভাইকে বানান ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান। এছাড়াও অন্য এক ভাইকে বীর মুক্তিযোদ্ধার সনদের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি বসান উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতির পদে। আর বড় মেয়ে উম্মে ফারজানা ডায়নাকে শ্রীমঙ্গল উপজেলা আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক পদ দেওয়ার পাশাপাশি আগামীতে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী করতে সব রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচিতে রাখতেন নিজের সঙ্গে। সবমিলিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সংসদ, অর্থ্যাৎ গোটা জেলাজুড়েই সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুস শহীদ পরিবারের ছিল একক আধিপত্য।

তবে এখানেই শেষ নয়, পরিবারতন্ত্রের পাশাপাশি সম্পদ ও নামেরও কাঙাল ছিলেন আব্দুস শহীদ। স্ত্রী-সন্তানদের নামে বাড়ি, ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে আটটি অ্যাপার্টমেন্ট, মার্কেট ও বাগানবাড়িসহ কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে তৈরি করেছেন চা-বাগান। সেখানে সরকারি খরচে বিদ্যুতের লাইন টেনে সেচের জন্য বসিয়েছেন এক ডজনের বেশি গভীর নলকূপ। হাইল-হাওর ও বাইক্কা বিলের পাশে প্রায় ২৭ বিঘা জমিতে করেছেন মৎস্য খামার। এছাড়া ৮ একর পাহাড়ি জমিতে গড়ে তুলেছেন বাগানবাড়ি। আব্দুস শহীদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে স্বজনরাও হয়েছেন কোটি কোটি টাকার মালিক।

এছাড়া আব্দুস শহীদ ছিলেন নামেরও কাঙাল। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারি অর্থায়নে একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হলেও, সেগুলোর নামকরণ করেছেন নিজের নামে। এছাড়া নিজের নামেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণ করেছেন।

১৯৪৮ সালের ১ জানুয়ারি কমলগঞ্জের রহিমপুর ইউনিয়নের সিদ্বেশ্বরপুর গ্রামের আব্দুল বারী ও সাজেদা খানম দম্পতির ঘরে জন্ম আব্দুস শহীদের। ৮ ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে তৃতীয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্মাতক সম্পন্ন করে ১৯৭৩ সালে কমলগঞ্জ গণমহাবিদ্যালয়ে যোগদান করে শুরু করেন শিক্ষকতা। ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে প্রথমবার এমপি হন। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত জাতীয় সংসদে হুইপ, ২০০৬ সাল পর্যন্ত সংসদে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ও সর্বশেষ প্যানেল স্পিকার এবং ২০২৪ সালে ৭ মাসের কৃষিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এক মেয়াদে ছিলেন মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি।

আব্দুস শহীদ ছোট ইমতিয়াজ আহমদ বুলবুলকে কমলগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ইফতেখার আহমদ বদরুলকে রহিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং মোসাদ্দেক আহমদ মানিককে ‘বানান’ বীর মুক্তিযোদ্ধা ও কমলগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। বড় মেয়ে উম্মে ফারজানা ডায়না শ্রীমঙ্গল উপজেলা আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক। লক্ষ্য ছিল আগামীতে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার। আর এজন্য প্রায় সব রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাবা আব্দুস শহীদের সঙ্গেই থাকতেন।

আব্দুস শহীদ জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বে থাকাকালে জেলাজুড়ে দলীয় অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং ঘিরে কোন্দল ছিল চরমে। প্রয়াত সমাজকল্যাণমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মহসীন আলীর সঙ্গে তার দলীয় দ্বন্দ্ব ছিল প্রকাশ্যে। সে সময় দলের একটি বড় অংশকে কোণঠাসা করে রাখেন তিনি। সবমিলিয়ে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও দলীয় কোন্দল সৃষ্টির কারিগর হিসেবে জেলাজুড়ে পরিচিতি রয়েছে তার। মামলা-হামলার মাধ্যমে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের দমন-নিপীড়নে সক্রিয় ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

দীর্ঘ মেয়াদে এমপি ও মন্ত্রী থাকার পরও আব্দুস শহীদের নিজ নির্বাচনী এলাকা কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল উপজেলায় দৃশ্যমান কোনো উন্নয়নকাজ নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। তার ও তার পরিবারের সদস্যদের ইশারা ছাড়া বাস্তবায়িত হতো না সরকারি কোনো প্রকল্প।

আব্দুস শহীদ ছিলেন নামের কাঙাল। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারি অর্থায়নে একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হলেও সেগুলো নিজের নামে নামকরণ করেছেন। কমলগঞ্জ সরকারি গণমহাবিদ্যালয়, সুজা মেমোরিয়াল কলেজ শমশেরনগর, পতনঊষার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কমলগঞ্জ মডেল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, মুন্সিবাজার কালিপ্রসাদ উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভবনের নামকরণ করা হয়েছে উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদের নামে। এছাড়া নিজের নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও নামকরণ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে কমলগঞ্জের রূপসপুর এলাকায় উপাধক্ষ্য আব্দুস শহীদ স্কুল অ্যান্ড কলেজ। শ্রীমঙ্গলেও একই নামে আকেটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণ করেছেন ।   

অভিযোগ রয়েছে- জলমহাল, সরকারি-বেসরকারি নানা প্রকল্প, বৈধ-অবৈধ বালু মহাল এবং লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের সেগুন গাছ অবৈধভাবে বিক্রিসহ বৈধ-অবৈধ ছোট-বড় সব কাজের আয়ের একটি অংশ ভাগ হিসেবে যেতো আব্দুস শহীদ ও তার ভাইদের কাছে। এর ব্যত্যয় হলেই করা হতো নানা হয়রানি। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের পাশে ‘সাবারী টি প্ল্যান্টেশন’ নামে চা-বাগান গড়ে তুলে উদ্যানের ৭-৮ একর পাহাড়ি জমি দখলে নেন। সরকারি খরচে ওই বাগানে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে স্থাপন করেন এক ডজনের বেশি গভীর নলকূপ। কাঁঠালকান্দিতে ১০-১৫ একর পাহাড়ি এলাকায় গড়ে তোলেন বাগান বাড়ি ‘সাবারী ফার্মহাউজ’। সেখানে সরকারি খরচে গভীর নলকূপ স্থাপন ও সৌর প্ল্যান্ট নির্মাণ করেন। শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওরে বাইক্কা বিলের পাশে ১৫-২০ একর জমির মৎস্য খামার গড়ে তোলেন তিনি।

এছাড়াও কমলগঞ্জের মাঝেরছড়ায় কয়েকশ’ বিঘা টিলায় লেবু বাগান, রাজধানীর উত্তরা ১০নং সেক্টরে বাসা, ঢাকা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের জগদীশপুরে পেট্রোল পাম্প, ঢাকার ফার্মগেইট এলাকায় ঘরসহ জমি ও দোকান, শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের দিলবরনগরে প্রায় ১০ একর জমিতে লেবু বাগান, শ্রীমঙ্গল শহরের কলেজ রোডে পাঁচতলা ভবন এবং মৌলভীবাজার সড়কে হাউজিং এস্টেটে বাসার জায়গা রয়েছে আব্দুস শহীদের।  কমলগঞ্জ উপজেলা সদরে প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন বাসা নির্মাণ করে অবৈধ গ্যাস সংযোগ এবং গ্রামের বাড়িতে সরকারি খরচে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে সোলার লাইট স্থাপন ও পুকুর খননেরর অভিযোগ রয়েছে সাবেক এই জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে। ২০১২ সালে জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি তার চাহিদানুযায়ী বিধি লঙ্ঘন করে গ্রামের বাড়িতে প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে গ্যাস লাইন স্থাপন করে দেয়। এছাড়া তার নামে-বেনামে কানাডা, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যে বেশ কয়েকটি বাড়ি রয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

গত ২৯ অক্টোবর একাধিক হত্যা মামলায় ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় আব্দুস শহীদকে। এ সময় তার বাসায় পাওয়া যায় কয়েক কোটি টাকা সমমূল্যের দেশি-বিদেশি মুদ্রা ও স্বর্ণালংকার। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কমলগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুধু জেলা শহরেই নয়, আব্দুস শহীদ কমলগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগেও অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং-দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছেন। তিনি সাবেক কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও কমলগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক রফিকুর রহমান অনুসারীদের কোণঠাসা করে রেখেছিলেন। রফিকুর রহমানের বিপক্ষে গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে মন্ত্রীত্বের প্রভাব খাটিয়ে নিজের ছোট ভাই বুলবুলকে চেয়ারম্যান বানিয়েছেন। শহীদের ক্ষমতার দাপটে তার বিরুদ্ধে কোনো নেতাকর্মী কথা বলার সাহস পেত না।’

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের পাশে আব্দুস শহীদের বনভূমি দখলের বিষয়ে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের দুজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, অনেক বছর ধরে ক্ষমতাবান সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুস শহীদ অবৈধভাবে লাউয়াছড়া বনের জমি দখলে রেখেছেন। ২০১৮ সাল থেকে বন বিভাগ একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েও বনের জমি উদ্ধার করতে পারেনি। ২০১৮ সালে প্রশাসনের সহযোগিতায় পরিমাপ শুরুর পর বন বিভাগ এ প্রক্রিয়া থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সাবেক কৃষিমন্ত্রীর দখলে কী পরিমাণ জমি রয়েছে, তা ডিমারকেশনের (সীমানা চিহ্নিতকরণ) পর নিশ্চিত হতে পারব। তবে আমরা আমাদের লাউয়াছড়া স্টুডেন্ট ডরমিটরির পাশে প্রায় ৬ একর জমি সাবেক কৃষিমন্ত্রীর দখল থেকে উদ্ধার করেছি। সেখানে বন্যপ্রাণীর খাদ্যোপযোগী নানা জাতের গাছের চারা রোপণ করেছি।’

আব্দুস শহীদের চাহিদানুযায়ী তার গ্রামের বাড়িতে প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে গ্যাস লাইন স্থাপনের বিষয়ে জানতে চাইলে জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির শ্রীমঙ্গল আঞ্চলিক বিতরণ কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক গৌতম কুমার দেব বলেন, ‘চলতি বছরের জুলাইয়ে আমি এখানে দায়িত্ব নিয়েছি। তবে আমার জানামতে সাবেক কৃষিমন্ত্রীর বাড়িতে অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়নি। মন্ত্রীর বাড়িতে ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে গ্যাস লাইন স্থাপনের বিষয়টি জানা নেই।’

মৌলভীবাজার-৪ আসনে বিএনপি থেকে নির্বাচনে অংশ নেয়া দলটির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আলহাজ্ব মুজিবুর রহমান চৌধুরী (হাজী মুজিব) আব্দুস শহীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুস শহীদ ও তার দোসররা মিলে আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ৭৬টি মামলা করিয়েছে। অনেক মামলায় আমার কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গলের নেতাকর্মীদের আসামি করেছে। পুলিশ দিয়ে আমাকে ও আমার নেতাকর্মীদের নির্যাতন করিয়েছে। নির্বাচনী এলাকার জনগণের পাশে, নিজ বাড়িতে, সামাজিক ও রাজনৈতিক কোনো অনুষ্ঠানে, এমনকি ঈদেও আমাকে এলাকায় আসতে দেওয়া হয়নি। পুলিশের হয়রানি, গ্রেপ্তার আতঙ্ক, এসবের মধ্যে দিয়েও দলের কার্যক্রম চালাতে হয়েছে।’