যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য শেষ হওয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল নির্ধারণে অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ছিল অভিবাসন। ওই নির্বাচনে হেরে যাওয়া ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী কমালা হ্যারিস মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে অভিবাসীদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করার কথা বলেছিলেন। আর বিজয়ী রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানই ছিল অভিবাসনবিরোধী। তাকে বারবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলতে দেখা গেছে, নথিবিহীন অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো হবে। আর নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি বলেছেন, তার দেশ থেকে অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর কোনো বিকল্প তিনি দেখছেন না। ট্রাম্পকে এবার ভোটের বৈতরণী পার করানোর অন্যতম কুশীলব ইলন মাস্কও একজন কট্টর অভিবাসনবিরোধী মানুষ হিসেবে ইতিমধ্যে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর অবৈধ অভিবাসীদের ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে তা নিয়ে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যে অভিবাসীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র বৈচিত্র্যপূর্ণ আর গণতান্ত্রিক হয়ে উঠতে পেরেছে তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে বা তাদের তাড়িয়ে দিলে দেশটির সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি আর অর্থনীতিতে কেমন প্রভাব পড়তে পারে?
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ বিষয়ে একটি বিশ্লেষণী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ‘অভিবাসী ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি কেমন হবে?’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে কোন কোন খাতে প্রভাব পড়তে পারে তা নিয়ে বিষদ আলোচনা করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনের আলোকে অভিবাসীহীন যুক্তরাষ্ট্র কেমন হতে পারে তার সংক্ষেপিত আলোচনা
জনসংখ্যা : অভিবাসী না থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা অনেক কম হবে। ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিদেশি বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রে অনেক বেশি। সেই তথ্য বলছে, বিদেশে জন্মগ্রহণকারী ৪ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাস করেন, যা মোট মার্কিন জনসংখ্যার ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ। এই তালিকায় সবার প্রথমে রয়েছে মেক্সিকো থেকে আসা মানুষ। সেখানকার ১ কোটি ৬ লাখ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। অন্যদিকে, সেখানে ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা ২৮ লাখ এবং চীন থেকে আসা মানুষের সংখ্যা ২৫ লাখ। অবশ্য অভিবাসী কর্মচারীর সংখ্যা রেকর্ড পরিমাণ হলেও যুক্তরাষ্ট্রে জন্মহার কমে যাওয়ার ফলে সে দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়নি।যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৩০-এর দশকের পর সর্বনিম্ন হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে। জন্মের হার ১৯৩০-এর দশকে ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’-এর ফলে হ্রাস পেয়েছিল। এর অর্থ হলো অন্যান্য অনেক দেশের মতোই যুক্তরাষ্ট্রও প্রবীণদের সংখ্যা বৃদ্ধির সমস্যার সঙ্গে লড়ছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত খরচ। অন্যদিকে, কাজকর্ম করতে সক্ষম অল্প বয়সী মানুষ কমে যাচ্ছে। কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস বলছে, ২০৪০ সালে মৃত্যুর সংখ্যা জন্মকে ছাপিয়ে যাবে। তখন অভিবাসনের ফলে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। এ কারণে অনেক অর্থনীতিবিদ ও অভিবাসনপন্থি গোষ্ঠী দাবি জানিয়েছে, অর্থ ব্যবস্থার কথা মাথায় রেখে অভিবাসন দরকার, বিশেষত গ্রামাঞ্চলে অভিবাসনের অনুমতি দেওয়া হোক।
অর্থব্যবস্থায় প্রভাব : বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তারিক হাসান জানিয়েছেন, অভিবাসীদের অনুপস্থিতির বড় প্রভাব পড়বে মার্কিন অর্থনীতিতে। তার ভাষ্য, যদি অভিবাসীদের পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়, তাহলে ধরে নিন মাথাপিছু জিডিপি ৫ থেকে ১০ শতাংশ কমে যাবে। অর্থাৎ কিছু মানুষ কমে যাওয়ার (অভিবাসীদের অনুপস্থিতি) যে প্রভাব, তার প্রতিফলন ঘটবে জিডিপিতে। তার গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তারিক হাসান বলেছেন, অভিবাসন উদ্ভাবনী শক্তিতে ইন্ধন জোগায়, উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এবং এটা কিন্তু শুধু কোনো একটা বিশেষ সেক্টরেই সীমাবদ্ধ নয়। অভিবাসীরা তুলনামূলকভাবে কম বয়সী এবং তাদের কাজ করার সম্ভাবনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সিভিল সেক্টরে কর্মরত ৩ কোটি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ১৯ শতাংশই অভিবাসী। সরকারি সংস্থা ‘ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিসটিক্স’-এর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমশক্তিতে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে অভিবাসীদের হার আমেরিকায় জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তিদের চেয়ে বেশি। কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের অনুমান অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে আসা ১৬ বছর বা তার বেশি বয়সী অভিবাসীদের প্রায় ৯১ শতাংশের বয়স ৫৫ বছরের কম হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রে বয়স্কদের মোট জনসংখ্যার ৬২ শতাংশ। অর্থব্যবস্থা ভূমিকা পালন কওে, এমন সেক্টর যেমন, কৃষি সম্পূর্ণরুপে অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল। শ্রম মন্ত্রণালয়ের জাতীয় কৃষি শ্রমিক জরিপ অনুযায়ী, ৭০ শতাংশ শ্রমিক অভিবাসী। যদিও তাদের মধ্যে অনেক শ্রমিকের কাছে এখনো পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট নথিপত্র নেই। আমেরিকান ইমিগ্র্যান্ট কাউন্সিলের (এআইসি) গবেষণা নির্দেশকের দায়িত্বে রয়েছেন নান ব্যু। তিনি অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন একটি সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন। তার মতে, অভিবাসীদের সরিয়ে দেওয়ার অর্থ হলো কৃষিকাজ করা, ফল ও শাকসবজি তোলা আর উৎসবের মৌসুমে ক্রমবর্ধমান বাজারের চাহিদা মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমিক পাবেন না ক্ষেতের মালিকরা। অন্যদিকে, যারা অভিবাসনের সমালোচনা করেন, তাদের একটা যুক্তি হলো, বিদেশ থেকে আসা বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কম মজুরিতে কাজ করতে প্রস্তুত এবং এর ফলে মার্কিন নাগরিকরাও কম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন আর ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া ২০১৪ সালে অর্থনীতিতে অভিবাসনের প্রভাব নিয়ে ২৭টি গবেষণার পর্যালোচনা করেছে। এই পর্যবেক্ষণ বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী নাগরিকদের বেতনের ওপর অভিবাসনের গড় প্রভাব প্রায় শূন্যের সমান। সাম্প্রতিক সময়ে ইস্টার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটির পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে একটি গবেষণা করা হয়েছে। সেই গবেষণা বলছে, অভিবাসীর সংখ্যা বাড়লে তা মজুরি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যদিও পরিসংখ্যানের দিক থেকে তা একেবারে ক্ষুদ্র।
করের ওপর প্রভাব : এআইসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২২ সালে অভিবাসী পরিবারগুলো মোট করের এক-ষষ্ঠাংশ (৫৮ হাজার কোটি ডলার) কর জমা দিয়েছে। এআইসির তরফে নান ব্যু জানিয়েছেন, শুধু বৈধ অভিবাসীরাই যে কর দিয়ে থাকেন, এমনটা নয়। পিউ রিসার্চ সেন্টার থিংক ট্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নথিভুক্ত নন এমন অভিবাসীর সংখ্যা মোট অভিবাসী জনসংখ্যার প্রায় ২৩ শতাংশ। প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ অভিবাসীর মধ্যে ৪০ লাখই মেক্সিকো থেকে আসা। ইনস্টিটিউট অন ট্যাক্সেশন অ্যান্ড ইকোনমিক পলিসির এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ২০২২ সালে নথিভুক্ত নন এমন অভিবাসীরা ফেডারেল, রাজ্য ও স্থানীয় কর বাবদ প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলার দিয়েছেন। থিংক ট্যাংক ‘ইকোনমিক পলিসি ইনস্টিটিউট’-এর ‘ইমিগ্রেশন ল অ্যান্ড পলিসি রিসার্চ’ বিভাগের নির্দেশক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ড্যানিয়েল কোস্টা। তার মতে, অর্থনৈতিক দিক থেকে অভিবাসনের প্রভাব জাতীয় স্তরে ইতিবাচক হতে পারে। তবে কিছু রাজ্যে এটি নেতিবাচকও হতে পারে, বিশেষত স্বল্পসময়ের নিরিখে বিচার করলে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় তিনি এবং তার টিমের সদস্যরা স্বল্প বেতন পান কিন্তু যোগ্য অভিবাসীদের ‘স্বল্প মেয়াদে আর্থিক ভারসাম্য নেতিবাচক প্রভাবের দিকে ঝুঁকে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে’ বলে উল্লেখ করেছেন। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক জিওভান্নি পেরি বলছেন, নির্মাণকাজ সংগঠিত না হলে সেবা ও আবাসনের ওপরও চাপ বাড়বে। এটা ঠিক যে, অভিবাসীদের বাদ দিয়ে দেওয়ার বিষয়টা বেশ সহজ।
অভিবাসীদের ব্যবসায় সাফল্য : অভিবাসী বা তাদের সন্তানদের একটা বড় অংশ ব্যবসা ক্ষেত্রে সুনাম অর্জন করেছে। রাজস্বের দিক থেকে ৫০০টি বৃহত্তম মার্কিন কোম্পানির বার্ষিক তালিকার প্রায় ৪৫ শতাংশ সংস্থাই অভিবাসী বা তাদের সন্তানদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। একই সময়ে, ১০০ কোটি ডলার বা তার বেশি মূল্যের মার্কিন স্টার্টআপগুলোর ৫৫ শতাংশই প্রতিষ্ঠা করেছে অভিবাসীরা। বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে অভিবাসীরা, যাদের মধ্যে অনেকেই প্রাথমিকভাবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিল। অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল এডুকেটরসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে ১০ লাখের বেশি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ৪ হাজার কোটি ডলারের অবদান রেখেছে।
জনমত : গ্যালাপ জরিপে দেখা গেছে, মার্কিন অর্থনীতিতে অভিবাসীদের ভূমিকা থাকলেও ৫৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক চাচ্ছেন অভিবাসন হ্রাস পাক। অভিবাসনকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যও রয়েছে। অধ্যাপক পেরি বলেন, কিছু রাজনীতিবিদ ও সংবাদমাধ্যম অভিবাসনকে ‘সীমান্তে বিশৃঙ্খলার’ সঙ্গে তুলনা করে। অভিবাসনের প্রভাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের বদলে অবৈধ অনুপ্রবেশের বিভিন্ন ‘গল্পের’ দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। ফলে অর্থনীতিতে অভিবাসীদের প্রভাব এবং জনসংখ্যার হ্রাসের ক্ষেত্রে তারা কী ভূমিকা পালন করে সে বিষয়ে আলোচনা করার পরিবর্তে, মানুষ প্রায়ই দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্ত থেকে অভিবাসনকে বন্যা হিসেবে দেখে। মানুষ মনে করে, অভিবাসনের পরিমাণ অত্যধিক এবং এটি আদতে ক্ষতিকারক। বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের তারিক হাসান বলেন, গত দুই দশকে অভিবাসন অনেক বেশি হয়েছে। যদিও অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অভিবাসন ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, তবে এর এমন কিছু দিক থাকতে পারে, যা অন্যদের স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে বাধা দেয়।
