এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনের গাজায় অবিরাম হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। গত বছর ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের যুদ্ধে অভিযান শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছে ৪৩ হাজার ৬০৩ ফিলিস্তিনি। যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। আহত হয়েছে লক্ষাধিক মানুষ। পৃথিবীর সবচেয়ে অবহেলিত ছিটমহলটিতে যুদ্ধ বন্ধে বিভিন্ন সময় নানা পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করেছে বেশ কয়েকটি দেশ। তবে নানামুখী প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ইসরায়েল কিংবা হামাস কোনো পক্ষই যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছাতে পারেনি। দীর্ঘদিন ধরে গাজায় যুদ্ধ বন্ধে মিসর ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারীর দ্বায়িত্ব পালন করছিল কাতার। তবে সেসব প্রচেষ্টা কাজে না লাগায় হামাস-ইসরায়েলের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে কাতার। সেই সঙ্গে কাতারের দোহায় অবস্থিত হামাসের রাজনৈতিক কার্যালয়ের আর কোনো প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছে দেশটি।
গত শনিবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল আনসারি জানান, কাতার মধ্যস্থতার জায়গা থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কাতার, যুক্তরাষ্ট্র ও মিসর গাজায় যুদ্ধবিরতি এবং হামাসের হাতে থাকা ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তির জন্য বিভিন্ন আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল। এখন পর্যন্ত সেসব আলোচনার কোনো সুফল আসেনি। অক্টোবরের মাঝামাঝি অনুষ্ঠিত সর্বশেষ আলোচনাও কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়। কারণ স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল হামাস। তবে যুদ্ধ বন্ধে উভয়পক্ষ আন্তরিকভাবে আগ্রহী হলেই কেবল কাতার মধ্যস্থতা করতে আসবে বলেও জানান আনসারি। আরও ১০ দিন আগে নিজেদের এই সিদ্ধান্ত হামাস, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন তিনি।
প্রভাবশালী এ উপসাগরীয় দেশটি মনে করছে, দোহায় হামাসের রাজনৈতিক কার্যালয়ের আর কোনো প্রয়োজন নেই। ইতিমধ্যে ইসরায়েলি হামলায় শীর্ষ নেতাদের অনেককে হারিয়ে টালমাটাল থাকা দলটির জন্য এটি একটি বড় আঘাত হিসেবে দেখা দিতে পারে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি হামাস। সংগঠনটির এক শীর্ষ নেতা আলজাজিরাকে জানিয়েছেন, তারা কাতারের সরে দাঁড়ানোর বিষয়ে অবগত রয়েছে হামাস। তবে এখনো কাতার কর্তৃপক্ষ তাদের দেশত্যাগ করতে বলেনি। মধ্যস্থতায় সংশ্লিষ্ট এক ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা বলেছেন, এখন পর্যন্ত এটি কেবল গণমাধ্যমে প্রচারিত তথ্য। কাতার আনুষ্ঠানিকভাবে হামাসকে এই সিদ্ধান্ত জানানোর আগ পর্যন্ত এ বিষয়ে মন্তব্য করবে না ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীটি। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও যুদ্ধ বিশ্লেষকরা বলছেন, দুপক্ষের মধ্য সহসাই যে এই সংঘাত বন্ধ হচ্ছে না সেটি নিশ্চিত। তাদের শঙ্কা, কাতার সরে দাঁড়ানোয় যুদ্ধ বিরতির আলোচনা থমকে যেতে পারে। এর আগে, শুক্রবার যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি মুক্তি চুক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর কাতারে হামাসের উপস্থিতি অগ্রহণযোগ্য বলে জানিয়েছিল ওয়াশিংটন। দুই সপ্তাহ আগে বাইডেন প্রশাসন কাতারে অবস্থান করা হামাস নেতাদের বিতাড়িত করার আহ্বান জানিয়েছিল। এ বিষয়ে ইসরায়েলও এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। ২০১২ সাল থেকে হামাসের রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয় দিয়ে আসছে। দোহায় কতজন হামাস কর্মকর্তা অবস্থান করছেন তা স্পষ্ট নয়। তবে এর মধ্যে হামাসের সাবেক প্রধান খালেদ মেশালসহ ইয়াহিয়া সিনাওয়ারের ডেপুটি খলিল আল-হায়ার মতো জ্যেষ্ঠ নেতারা রয়েছেন। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি ইরানকে সর্বোচ্চ চাপে রাখার নীতি থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছে তেহরান। শনিবার ইরানের কৌশলগত বিষয়াদিসংক্রান্ত ভাইস প্রেসিডেন্ট জাভাদ জারিফ বলেন, ট্রাম্পকে দেখাতে হবে তিনি অতীতের ভুল নীতি আর অনুসরণ করবেন না। তিনি বলেন ট্রাম্পের এই নীতির জেরেই তেহরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার পথে হেঁটেছিল, যা সাড়ে ৩ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশে পৌঁছেছিল। ফের তেমনটা হলে ইরানও নিজেদের রক্ষায় যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব করবে না। একসময় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন জারিফ। ২০১৫ সালে তেহরান, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তিগুলোর মধ্যে পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরে সহায়তা করেছিলেন তিনি। তবে ২০১৮ সালে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তি থেকে সরিয়ে নেয়।