দিনাজপুরের পার্বতীপুরের বড়পুকুরিয়া ৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লার চাহিদা কমে যাওয়ায় এবং উত্তোলিত কয়লা মজুদের জায়গা না থাকায় কয়লা খনির উৎপাদন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
অপরদিকে, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তিনটি ইউনিটের মধ্যে চালু থাকা দুইটি ইউনিটের একটি গত সোমবার দুপুরে বন্ধ হয়ে গেছে। এতে করে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লার চাহিদা আরও কমে যাবে। অন্যদিকে, মজুদ কয়লার ফেইসটিতে ক্ষতিকারক গ্যাস নিঃসরণসহ কয়লার স্বতঃস্ফূর্ত প্রজ্বলনের আশঙ্কা করছে খনি কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে প্রতিদিন কয়লা উত্তোলন হওয়ার কথা ৩৫০০ থেকে ৪০০০ মেট্রিক টন। কিন্তু গত ৩ আগস্ট খনির ১৪১৪ ফেইস থেকে কয়লা উত্তোলন শুরু হয় সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার মেক্ট্রিক টন হারে। গত অক্টোবর মাস পর্যন্ত এ ফেইস থেকে ৩ লাখ ৬৪ হাজার মেট্রিক টন কয়লা উত্তোলন করা হয়েছে। ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত আরও ১ লাখ ২০ হাজার টন কয়লা উত্তোলন হবে বলে আশা করছে কয়লা খনি কর্তৃপক্ষ।
এই উৎপাদিত কয়লার বর্তমানে একমাত্র গ্রাহক পার্বতীপুরের বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে। তিনটি ইউনিট চালাতে তাদের চাহিদা ৫ হাজার মেট্রিক টন কয়লা। কিন্তু তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্মলগ্ন থেকে তিনটি ইউনিট এক সঙ্গে চালাতে সক্ষম হয়নি। কিছুদিন থেকে ১ ও ৩ নম্বর ইউনিট চালু ছিল। যার মধ্যে ১ নম্বর ইউনিটটি গতকাল সোমবার দুপুরে যান্ত্রিক ক্রটির কারণে বন্ধ হয়ে যায়। এক সঙ্গে ইউনিটগুলো চালাতে না পারায় ও যান্ত্রিক ক্রটির কারণে বিভিন্ন সময় কোনো না কোনো ইউনিট বন্ধ থাকায় কয়লার খরচও কমে গেছে। সে কারণে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র কম কয়লা নিচ্ছে।
কয়লা খনি ও তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তিনটি ইউনিট যথাযথভাবে পরিচালিত না হওয়ায় গত আগস্ট থেকে দৈনিক গড়ে ৫ হাজার মেট্রিক টনের স্থলে ২ হাজার ২ হাজার ৩০০ টন করে কয়লা গ্রহণ করছে। অর্থাৎ বিসিএমসিএল’র কোল ইয়ার্ডে উৎপাদিত কয়লার মধ্যে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৭০০ টন করে কয়লা জমা হচ্ছে। এতে করে প্রতিদিনই বাড়ছে মজুদ।
কয়লা খনি কর্তৃপক্ষ জানায়, ভূগর্ভ থেকে উত্তোলিত কয়লা সংরক্ষণের জন্য বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (বিসিএমসিএল)-এর তিনটি কোল ইয়ার্ড রয়েছে। যার মধ্যে একটিতে সেডিমেন্ট কোল সংরক্ষণ করা হয়েছে। অপর দুইটি কোল ইয়ার্ডের ধারণক্ষমতা ২ লাখ টন। বর্তমানে সেখানে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টন কয়লা মজুদ রয়েছে। বিসিএমসিএল’র কোল ইয়ার্ড কয়লা দ্বারা পরিপূর্ণ হওয়ায় কয়লা সংরক্ষণের আর কোনো জায়গা নেই। চলমান ১৪১৪ ফেইস থেকে দৈনিক গড়ে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টন হারে কয়লা উত্তোলিত হচ্ছে। বিষয়টি খনি কর্তৃপক্ষ গত ১ অক্টোবর থেকে ২৩ অক্টোবরে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে অবহিত করা হয়। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে মৌখিকভাবেও একাধিকবার জানানো হয়েছে। কিন্তু এতে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ কোনো ভাল খবর দিতে পারেনি। কারণ তাদেরও কয়লা মজুদ করার এবং ওজন কম বেশি হওয়ার সুযোগ থাকায় তারা আগাম কয়লা নিতে পারছে না।
এ ব্যাপারে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘উত্তোলিত কয়লা বিসিএমসিএল’র কোল ইয়ার্ডে সংরক্ষণ করা সম্ভব না হলে কয়লা উত্তোলন বাধাগ্রস্ত হবে। চলমান ১৪১৪ ফেইসের স্বাভাবিক কয়লা উত্তোলন বাধাগ্রস্ত হলে বিসিএমসিএল এবং চীনা কনসোর্টিয়ামের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির প্রতিবন্ধকতাসহ বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি হবে। অপরদিকে, ফেইসটিতে ক্ষতিকারক গ্যাস নিঃসরণসহ কয়লার স্বতঃস্ফূর্ত প্রজ্বলনের আশঙ্কা রয়েছে। এতে করে কয়লা উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।’
বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রধান প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘পাশ্ববর্তী বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার মেট্রিক টন কয়লা উত্তোলন হচ্ছে। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে দুইটি ইউনিট চালাতে কয়লার প্রয়োজন পড়ছে দৈনিক ২ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন বাকি কয়লা খনির ইয়ার্ডে পড়ে থাকছে। আজ সোমাবার পর্যন্ত দুইটি ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছিল ২০০ মেগাওয়াট। কিন্তু আজ দুপুরে ১ নম্বর ইউনিটটি যান্ত্রিক ক্রুটির কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ হয়েছে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রয়োজন না থাকায় উৎপাদিত কয়লা গ্রহণ করতে পারছিনা। তবে আসছে শুস্ক মৌমুমে বেশি কয়লার প্রয়োজন হবে। তখন আমরা কয়লা গুলো নিতে পারব।’